November 21, 2018

বঙ্কিম ও আনন্দ মঠ উপন্যাস নিয়ে কিছু পর্যালোচনা । পর্ব দুই

220px-Bankimchandra_Chattapadhay

সূফি বরষণ
পর্ব দুই:
কলকাতা মার্কসবাদী লেখক সুপ্রকাশ রায় বলেন, বঙ্কিম বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, মুসলমান শাসনে হিন্দু ধর্ম বিনষ্ট হইয়াছিল, কিন্তু ইংরেজ শাসন তাহা পুনরুদ্ধার করিবে এবং তাহা জয়যুক্ত হইবে । যে সময় মুসলমানরা ইংরেজ বিরোধী সংগ্রামে ব্যস্ত সেই সময় এইভাবে তিনি হিন্দুদের মুসলমান বিদ্বেষে ইন্ধন যোগাইয়া ভারতে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করিয়াছেন। ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম তৃতীয় সংকলন কলকাতা ১৯৮০ ।

এম আর আখতার মুকুল তাঁর কোলকাতা কেন্দ্রীক বুদ্ধিজীবী বইয়ের ২৫০ পৃষ্ঠায় বঙ্কিম ও আনন্দ মঠ সম্পর্কে আরও বলেন, যখন…… চরম প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দু জাতীয়তাবাদের একনিষ্ঠ সেবক ঋষি বঙ্কিম চন্দ্রের আবির্ভাব হলো , তখন ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী ছাড়াও কোলকাতা কেন্দ্রীক বর্ণহিন্দু বুর্জোয়া শ্রেণি অচিরেই বঙ্কিমের কর্মকান্ডকেই বাংলার রেনেঁসার পূর্ণ বিকাশের যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করলো । অথচ প্রকৃত সত্য ও স্বরূপ উদঘাটনের লক্ষ্যে পুনরাবৃত্তি হওয়ার সত্ত্বেও সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে মহল বিশেষ কর্তৃক চিহ্নিত আনন্দ মঠ এর মূল্যায়ন এক্ষেত্রে অপরিহার্য মনে হয়। আনন্দ মঠ উপন্যাসে বঙ্কিম চন্দ্রের মন মানসিকতা ও বঙ্কিম দর্শনের প্রতিফলন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বঙ্কিমের বক্তব্য হচ্ছে :

ক. ইংরেজ বহির্বিষয়ক জ্ঞানে অতি সুপণ্ডিত , লোক শিক্ষায় বড় সুপটু। সুতরাং ইংরেজকে রাজা করিব । আনন্দ মঠ

খ. ইংরেজরা এক্ষণে বণিক _ অর্থ সংগ্রহেই মন দিয়াছে , রাজ্য শাসনভার লইতে বাধ্য হইবে ….. ইংরেজ রাজ্য অভিষিক্ত হইবে বলিয়াই সন্তানবিদ্রোহ উপস্থিত হইয়াছে । আনন্দ মঠ

গ. সত্যানন্দের চক্ষু হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইল। তিনি বলিলেন , শত্রুশোণিত সিক্ত করিয়া মাতাকে শথ্বশালিনী করিব। মহাপুরুষ শত্রু কে? শত্রু আর নাই। ইংরেজ মিত্র রাজা । আনন্দ মঠ

ঘ. কে কাহার হাত ধরিয়াছে ? জ্ঞান আসিয়া ভক্তিকে ধরিয়াছে , ধর্ম আসিয়া কর্মকে ধরিয়াছে । আনন্দ মঠ

ঙ. ইংরেজ বাংলাদেশকে অরাজকতার হস্ত হইতে উদ্ধার করিয়াছে । আনন্দ মঠ

চ. অতএব তোমরা দেশ উদ্ধার করিতে পারিবে না। আর ফল যাহা হইবে ভালোই হইবে । ইংরেজ না হইলে সনাতন ধর্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই। আনন্দ মঠ ।

তিনি কোলকাতা কেন্দ্রীক বুদ্ধিজীবী বইয়ের ৩১ পৃষ্ঠায় আরও বলেন, বাংলার ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা দেখা যায় যে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে শুরু করে পুরো উনবিংশ শতাব্দী ধরে কোলকাতা কেন্দ্রীক যে বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে , তাদের কর্ণধারেরা বাঙালী জাতীয়তাবাদের দাবিদার হিসেবে যত কথাই বলে থাকুক না কেন, তা আসলে বাঙালী হিন্দু জাতীয়তাবাদের কথাবার্তা । এজন্যই তো উপন্যাসিক বঙ্কিম চন্দ্রের আনন্দ মঠের মূল সুরই হচ্ছে যবন (মুসলিম ) বিরোধী । সে আমলে এদের রচিত বাংলা সাহিত্যের সর্বত্রই হিন্দুয়ানীর ঢক্কানিনাদ।

তিনি কোলকাতা কেন্দ্রীক বুদ্ধিজীবী বইয়ের ৫২ পৃষ্ঠায় আরও লিখেন, রোমাঞ্চধর্মী উপন্যাসিক বঙ্কিম চন্দ্র চট্রোপাধ্যায় ১৮৬৫ সালে দুর্গেশ নন্দিনী উপন্যাস দিয়ে শুরু করে ১৮৮১ সালে রাজসিংহ পর্যন্ত বেশ কিছু সংখ্যক উপন্যাস লেখা সমাপ্ত করেছেন এবং বাঙালীত্বের নামে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বন্দেমাতরম শ্লোগান উচ্চারণ করেছেন । তাঁর শক্তিশালী লেখনী তখন সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণি বিদ্বেষে ভরপুর।

একই বইয়ের ১৪৭ পৃষ্ঠায় এম আর আখতার মুকুল বলেন, তাঁর লেখনীর প্রতিটি বর্ণ রাজনীতির মাদকতায় ভরপুর। তিনিই সার্থক ভাবে কোলকাতা কেন্দ্রীক বর্ণ হিন্দু বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অহিফেন সেবনে সক্ষম হলেন । …… এজন্যই ১৮৮২ সালে প্রকাশিত আনন্দ মঠ উপন্যাসের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় বঙ্কিমের দাম্ভিক বক্তব্য হচ্ছে , সমাজ বিপ্লব সকল সময়েই আত্মপীড়ন মাত্র । বিদ্রোহীরা আত্মঘাতী।

আনন্দ মঠ প্রসঙ্গে এখানে আমাদের বাঙালি মুসলমানদের লন্ডনের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলা যাক, লন্ডনে আসার পর থেকে আমাদের প্রতিবেশী বন্ধু (?) রাষ্ট্র ভারতের অনেকের সাথে অনেক সময় আমার কথা হয়, দেখা হয়। আমি এদের মানসিকতা বুঝার চেষ্টা করি এরা বাংলাদেশকে কি চোখে দেখে, মুসলমানদেরকে কি চোখে দেখে। একটা জিনিস আমি খেয়াল করলাম এরা কেউ সরাসরি-কেউ ইশারা-ইঙ্গিতে বলার চেষ্টা করে যে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানরা হচ্ছে বহিরাগত। আর চিন্তার মূলেই হিন্দুদের মুসলিম বিদ্বেষী করে তুলেছে । আর বঙ্কিমের মতো সাহিত্যিকগণ তাদের লেখনীর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা (মুসলিম বিদ্বেষ ) আরও বেশি করে ছড়িয়ে দিয়েছে ।

আমি তাদেরকে বলি ভারতীয় উপমহাদেশে অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মঙ্গোলিয়ান, শন, হুক কত জাতি এসেছে কাউকে নিয়ে তোমাদের মাথা ব্যথা নাই, শুধু মুসলমানদের নিয়েই তোমাদের মাথাব্যথা? সবাই থাকতে পারবে শুধু মুসলমানদেরকে কেন চলে যেতে হবে? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যেই আর্য জাতি ভারতে এসে হিন্দু ধর্ম চালু করলো সেই আর্য জাতিই বহিরাগত। এরা কোনো ভালো উত্তর দিতে পারে না, আমতা আমতা করতে থাকে। আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার মূল কারণ হচ্ছে হিন্দুরা মুসলমানদেরকে বহিরাগত মনে করে, আর কেউ কাউকে বহিরাগত মনে করলে সে তাকে আপন করে নিতে পারবে না, অধিকার দিতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক।

যেদিন ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দুরা মুসলমানদেরকে বহিরাগত মনে করবে না সেদিন থেকেই সাম্প্রদায়িকতা (মুসলিম বিদ্বেষ ) চলে যাবে বলে আমি মনে করি। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগে পাকিস্তান নামে কোনো রাষ্ট্র ছিল না, মুক্তিযুদ্ধ-রাজাকার ইস্যু ছিল না, আল্লামা সফি হুজুর ছিল না কিন্তু পশ্চিম বঙ্গীয় বাংলা সাহিত্যের পাতায় পাতায় মুসলিম বিদ্ধেষ ছিল এবং কথা একটাই মুসলমানরা বহিরাগত। রবীন্দ্রনাথ-শরত-বঙ্কিম সবাই মুসলমানদেরকে বহিরাগত হিসেবেই দেখেছেন সারা জীবন তাদের রচনার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার শুরু করে দিয়ে গেছেন ।

মুসলমানদেরকে অশ্লীল অশ্রাব্য ভাষায় গালি প্রদান এবং মুসলমানদের প্রতি মিথ্যা কালীমা লেপনের নিকৃষ্ট নজির স্থাপন করেছে, বঙ্কিম, ঈশ্বরচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রঙ্গলাল, হেমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র, দামোদর মুখোপাধ্যায়, থেকে খোদ রবীন্দ্রসহ বেশিরভাগ বর্ণহিন্দু লেখক।

বাংলা সাহিত্যে এসব হিন্দু কবি-সাহিত্যিকদের ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা (মুসলিম বিদ্বেষ) ও চরম বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন মুসলমানরা। বঙ্কিম তার লেখা প্রায় সবকটি গালি ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করেছে। ‘মেচ্ছ’ হতে শুরু করে ‘যবন’ পর্যন্ত। এমনকি প্রাচীনকালে বৌদ্ধদেরকে দেয়া ‘নেড়ে’ গালিটাকেও সে উহ্য রাখেনি।

শুধু তাই নয়; তারা ম্লেচ্ছ, যবন, নেড়ে বলা ছাড়াও মুসলমানদেরকে পাষ-আত্মা, পাপিষ্ঠ, পাপাত্মা, দুরাত্মা, দূরাশয়, নরাধম, নরপিশাচ, পাতকী, বানর, এঁড়ে, দেড়ে, ধেড়ে, অজ্ঞান, অকৃতজ্ঞ, ইতর- এ জাতীয় কোনো গালিই দিতে বাদ দেয়নি।

আনন্দমঠ, প্রথম খণ্ড, সপ্তম পরিচ্ছেদ, ১১ | বঙ্কিম লিখন,” ১১৭৬ সালে বাঙ্গালা প্রদেশ ইংরেজের শাসনাধীন হয় নাই। ইংরেজ তখন বাঙ্গালার দেওয়ান। তাঁহারা খাজনার টাকা আদায় করিয়া লন, কিন্তু তখনও বাঙ্গালীর প্রাণ সম্পত্তি প্রভৃতি রক্ষণাবেক্ষণের কোন ভার লয়েন নাই। তখন টাকা লইবার ভার ইংরেজের, আর প্রাণ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের ভার পাপিষ্ঠ নরাধম বিশ্বাসহন্তা মনুষ্যকুলকলঙ্ক মীরজাফরের উপর। মীরজাফর আত্মরক্ষায় অক্ষম, বাঙ্গালা রক্ষা করিবে কি প্রকারে? মীরজাফর গুলি খায় ও ঘুমায়। ইংরেজ টাকা আদায় করে ও ডেসপাচ লেখে। বাঙ্গালি কাঁদে আর উৎসন্ন যায়।

অতএব বাঙ্গালার কর ইংরেজের প্রাপ্য। কিন্তু শাসনের ভার নবাবের উপর। যেখানে যেখানে ইংরেজরা আপনাদের প্রাপ্য কর আপনারা আদায় করিতেন, সেখানে তাঁহারা এক এক কালেক্টর নিযুক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু খাজনা আদায় হইয়া কলিকাতায় যায়।”

তন্মধ্যে যবন, ম্লেচ্ছ, ইসলাম মুসলিম বিদ্বেষী এবং বঙ্কিম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মুসলিম বিদ্বেষ ও হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তিকে চাঙ্গা করার জন্য অনেক গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, কবিতা রচনা করেছে। যবন, মেচ্ছ, ইসলাম মুসলিম বিদ্বেষী লেখা তার সমকালীন হিন্দুদেরকে চরম মুসলিম বিদ্বেষী হতে উৎসাহিত করেছিল।

আনন্দমঠ, চতুর্থ খণ্ড, অষ্টম পরিচ্ছেদ, ৯৩ | বঙ্কিম লিখন ইংরেজ আমাদের প্রভু তাদের হাতে রাজ্য ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া মঙ্গল!?,
” সত্যানন্দ বলিলেন, “হে মহাত্মন্! যদি ইংরেজকে রাজা করাই আপনাদের অভিপ্রায়, যদি এ সময়ে ইংরেজের রাজ্যই দেশের পক্ষে মঙ্গলকর, তবে আমাদিগকে এই নৃশংস যুদ্ধকার্যে কেন নিযুক্ত করিয়াছিলেন?”

মহাপুরুষ বলিলেন, “ইংরেজ এক্ষণে বণিক – অর্থসংগ্রহেই মন, রাজ্যশাসনের ভার লইতে চাহে না। এই সন্তানবিদ্রোহের কারণে, তাহারা রাজ্যশাসনের ভার লইতে বাধ্য হইবে ; কেন না, রাজ্যশাসন ব্যতীত অর্থসংগ্রহ হইবে না। ইংরেজ রাজ্যে অভিষিক্ত হইবে বলিয়াই সন্তানবিদ্রোহ উপস্থিত হইয়াছে। এক্ষণে আইস–

জ্ঞানলাভ করিয়া তুমি স্বয়ং সকল কথা বুঝিতে পারিবে |”

স। হে মহাত্মন্! আমি জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা রাখি না – জ্ঞানে আমার কাজ নাই – আমি যে ব্রতে ব্রতী হইয়াছি, ইহাই পালন করিব। আশীর্বাদ করুন, আমার মাতৃভক্তি অচলা হউক।

মহাপুরুষ। ব্রত সফল হইয়াছে – মার মঙ্গল সাধন করিয়াছ – ইংরেজরাজ্য স্থাপন করিয়াছ। যুদ্ধবিগ্রহ পরিত্যাগ কর, লোকে কৃষিকার্যে নিযুক্ত হউক, পৃথিবী শস্যশালিনী হউন, লোকের শ্রীবৃদ্ধি হউক।

সত্যানন্দের চক্ষু হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইল। তিনি বলিলেন, “শত্রুশোণিতে সিক্ত করিয়া মাতাকে শস্যশালিনী করিব |”

মহাপুরুষ। শত্রু কে? শত্রু আর নাই। ইংরেজ মিত্ররাজা। আর ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে শেষ জয়ী হয়, এমন শক্তিও কাহারও নাই।
স। না থাকে, এইখানে মাতৃপ্রতিমাসম্মুখে দেহত্যাগ করিব।
মহাপুরুষ। অজ্ঞানে? চল, জ্ঞানলাভ করিবে চল। হিমালয়শিখরে মাতৃমন্দির আছে, সেইখান হইতে মাতৃমূর্তি দেখাইব।

এই বলিয়া মহাপুরুষ সত্যানন্দের হাত ধরিলেন। কি অপূর্ব শোভা! সেই গম্ভীর বিষ্ণুমন্দিরে প্রকাণ্ড চতুর্ভুজ মূর্তির সম্মুখে, ক্ষীণালোকে সেই মহাপ্রতিভাপূর্ণ দুই পুরুষ মূর্তি শোভিত – একে অন্যের হাত ধরিয়াছেন। কে কাহাকে ধরিয়াছে? জ্ঞান আসিয়া ভক্তিকে ধরিয়াছে – ধর্ম আসিয়া কর্মকে ধরিয়াছে ; বিসর্জন আসিয়া প্রতিষ্ঠাকে ধরিয়াছে ; কল্যাণী আসিয়া শান্তিকে ধরিয়াছে। এই সত্যানন্দ শান্তি ; এই মহাপুরুষ কল্যাণী। সত্যানন্দ প্রতিষ্ঠা, মহাপুরুষ বিসর্জন। বিসর্জন আসিয়া প্রতিষ্ঠাকে লইয়া গেল।”

কলকাতার তথাকথিত শ্রেষ্ঠ বাংলা সাহিত্যিক, আর বাঙালী মুসলিম বিরোধী সাহিত্যিক যে একই কথা তা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। কলকাতার জনজীবনটিই আবর্তিত হচ্ছে হিন্দুয়ানিকে ঘিরে। উল্লেখ্য, হিন্দুয়ানিতে হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস আবশ্যিক নয়, আবশ্যিক নয় আস্তিক হওয়াও। বরং মুসলিম বিদ্বেষ থাকাই হল হিন্দূয়ানি পালনের প্রধান শর্ত।

কলকাতার হিন্দুয়ানির এবং কলকাতার মুসলিম বিরোধী সাহিত্যের আলোচনায় অবধারিতভাবেই উঠে আসবে বাঙালী মুসলিমের সাথে কলকাতার বাঙালীর দ্বিচারিতার প্রসঙ্গ। হিন্দুনারীহরণ ব্যাপারে সংবাদপত্রওয়ালারা প্রায়ই দেখি প্রশ্ন করেন, মুসলমান নেতারা নীরব কেন? তাঁহাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা যে পুনঃ পুনঃ এতবড় অপরাধ করিতেছে, তথাপি প্রতিবাদ করিতেছেন না কিসের জন্য? মুখ বুঝিয়া নিঃশব্দে থাকার অর্থ কি? কিন্তু আমার ত মনে হয় অর্থ অতিশয় প্রাঞ্জল। তাঁহারা শুধু অতি বিনয়বশতঃই মুখ ফুটিয়া বলিতে পারেন না, বাপু, আপত্তি করব কি, সময় এবং সুযোগ পেলে ও-কাজে আমরাও লেগে যেতে পারি” ।

কলকাতার সমাজের ক্ষেত্রে আমরা যদি দ্বিচারিতাকেই সৌজন্য হিসাবে গণ্য করি, তবে বলতে হয় বঙ্কিমচন্দ্রের সে সৌজন্যও ছিলো না। বঙ্কিম তার “আনন্দমঠ” উপন্যাসে ব্রিটিশদের সাথে হিন্দুদের “সন্তান দল” এর মানিয়ে চলার উপদেশ দিয়েছে এবং মুসলিমদের “নেড়ে” সম্বোধন করে লিখেছে।

” হিন্দুরা বলিতে বলিতে লাগিল, “আসুক, সন্ন্যাসীরা আসুক, মা দুর্গা করুন, হিন্দুর অদৃষ্টে সেই দিন হউক।” মুসলমানেরা বলিতে লাগিল, “আল্লা আকবর! এত‍না রোজের পর কোরাণসরিফ বেবাক কি ঝুঁটো হলো ; মোরা যে পাঁচু ওয়াক্ত নমাজ করি, তা এই তেলককাটা হেঁদুর দল ফতে করতে নারলাম। দুনিয়া সব ফাঁকি।” এইরূপে কেহ ক্রন্দন, কেহ হাস্য করিয়া সকলেই ঘোরতর আগ্রহের সহিত রাত্রি কাটাইতে লাগিল।”

আনন্দমঠ চতুর্থ খণ্ড প্রথম পরিচ্ছেদ বঙ্কিম লিখন, “সেই রজনীতে হরিধ্বনিতে সে প্রদেশভূমি পরিপূর্ণা হইল। সন্তানেরা দলে দলে যেখানে সেখানে উচ্চৈ:স্বরে কেহ “বন্দে মাতরম্” কেহ “জগদীশ হরে” বলিয়া গাইয়া বেড়াইতে লাগিল। কেহ শত্রুসেনার অস্ত্র, কেহ বস্ত্র অপহরণ করিতে লাগিল। কেহ মৃতদেহের মুখে পদাঘাত, কেহ অন্য প্রকার উপদ্রব করিতে লাগিল। কেহ গ্রামাভিমুখে, কেহ নগরাভিমুখে ধাবমান হইয়া, পথিক বা গৃহস্থকে ধরিয়া বলে, “বল বন্দে মাতরম্, নহিলে মারিয়া ফেলিব |” কেহ ময়রার দোকান লুঠিয়া খায়, কেহ গোয়ালার বাড়ী গিয়া হাঁড়ি পাড়িয়া দধিতে চুমুক মারে, কেহ বলে, “আমরা বজ্রগোপ আসিয়াছি, গোপিনী কই?” সেই এক রাত্রের মধ্যে গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে মহাকোলাহল পড়িয়া গেল। সকলে বলিল, “মুসলমান পরাভূত হইয়াছে, দেশ আবার হিন্দুর হইয়াছে।”

পশ্চিমবঙ্গের গবেষক ড. অরবিন্দ পোদ্দারের মতে, ” বঙ্কিমচন্দ্র জাতীয়তাবাদকে একটা ধর্মীয় আধ্যাত্মিক আলোকে মন্ডিত করে। ভারতবর্ষ নামক যে একটি ভৌগোলিক সত্তা, তাকে সে মাতৃরূপে উপলব্ধি করতে চেয়েছে, এই মাতৃভাবনা স্বর্গীয় দেবী ভাবনার সমতুল্য। ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতে সে দেশ জননীকে দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর সঙ্গে একাত্ম বলে বর্ণনা করেছে।… অন্য কথায়, হিন্দু রাজত্ব স্থাপন এবং তারই অনুপ্রেরণায় ভবিষ্যৎ ভারতকে নির্মাণ করার আদর্শ সে প্রচার করেছিল
ওপারের আনন্দমঠীয় রাজনীতি।

১৯৮৩ সালে আনন্দ মঠ উপন্যাস নিয়ে সেসময় কলকাতার রাজনীতিকদের মধ্যে যে বিতর্কের সূচনা হয় তা নিয়ে সংবাদপত্র গুলো বিভিন্ন মজাদার সংবাদ পরিবেশন করে। তা নিম্নে তুলে ধরা হলো,
আনন্দমঠ নিয়ে মজার বিতর্ক শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৮৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের নৈহাটিতে আনন্দমঠের শতবার্ষিকী পালন করা হয়। উল্লেখ্য, ১৮৮২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বঙ্কিমের আনন্দমঠ প্রকাশিত হয়। আনন্দমঠের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই এই বিতর্কের শুরু। এই বিতর্কের প্রধান ভূমিকায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সিপিএম সম্পাদক ও বামফ্রন্ট কমিটির চেয়ারম্যান সরোজ মুখার্জী, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব কুমার মুখার্জী, পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস (ই) সভাপতি আনন্দ গোপাল মুখার্জী, ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক অশোক ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আইনমন্ত্রী সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ প্রমুখ।

সরোজ বাবু আনন্দমঠকে সাম্প্রদায়িক বলে সমালোচনা করেছিলেন। একে বঙ্কিম জীবনের একটি ত্রুটি বলে উল্লেখ করেন। সরোজ বাবুর এই কথায় তেড়ে উঠেছেন প্রণব মুখার্জী (প্রণব এখন ভারতের রাষ্ট্রপতি)। তিনি বলেন, কম্যুনিস্টরা কবিগুরুকে বুর্জোয়া আখ্যা দিয়েছিল এবং নেতাজী সুভাষ বসুকেও দেশের শত্রু বলে চিহ্নিত করেছিলো। বিশেষ করে নেতাজী সম্পর্কে ওদের বিভ্রান্তি কাটাতে কম্যুনিস্টদের কুড়ি বছরের বেশি সময় লেগেছে। হয়ত আনন্দমঠকে বুঝতেও তাদের আরও কুড়ি বছর সময় লাগবে। এরপর প্রণব বাবু বলেছিলেন, আনন্দ মঠের বন্দে মাতরম মন্ত্রই ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা।

প্রণব বাবুর এই উক্তির ত্বরিৎ জবাব দেন সরোজ বাবু। তিনি প্রশ্ন তুলেন, ‘প্রণব মুখার্জী কে? সে আনন্দমঠের কি বুঝে? ওর বাবা বামদা মুখার্জী যদি আনন্দমঠ নিয়ে কথা বলতেন তাও না হয় বুঝা যেত।’ প্রণব বাবু সরোজ বাবুর এই আক্রমণের জবাব দিয়ে ছিলেন কি না জানি না। তবে জবাব দিতে এগিয়ে আসেন পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের (ই) সভাপতি আনন্দ গোপাল মুখার্জী। তিনি প্রথমেই প্রশ্ন তুলেন, সরোজ মুখার্জী আনন্দ মঠের কি বুঝে? প্রত্যেক বিপ্লবীর কাছেই আনন্দমঠ প্রেরণার বস্তু। আনন্দ গোপাল বাবুর সহায়তায় এসেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী ও ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীর ভক্তিভূষণ ও ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক অশোক ঘোষ। ভক্তিভূষণ বাবু বলেন, ‘আমি থাকলে সরোজ বাবুকে যোগ্য জবাবই দিতাম।’ উল্লেখ্য, সরোজ বাবু ফ্রন্ট কমিটির মিটিংয়ে আনন্দমঠের শতবর্ষ নিয়ে তার আপত্তি প্রকাশ করেন। ভক্তিভূষণের অপর সহযোগী অশোক ঘোষ আনন্দমঠকে সাম্প্রদায়িক প্রেরণাস্বরূপ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে আনন্দমঠ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার দাবি জানান। সর্বশেষে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আইনমন্ত্রী সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘‘যারা বলেন আনন্দমঠ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনারা একজন মুসলমানকে দেখান যিনি আনন্দমঠ পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন? আনন্দমঠ কি সত্যিকার জাতীয়তাবোধের উদ্বোধক?… জনসংঘ নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে মনে করে। কিন্তু ভারতীয় সংবিধানের জাতীয়তাবাদ আর জনসংঘের জাতীয়তাবাদ এক নয়। আনন্দ মঠের জাতীয়তাবাদ ঐ জাতীয়।’’

আনন্দমঠ নিয়ে উপরের বিতর্কে দু’টো পক্ষ দুই প্রান্তিক চিন্তার উপর দাঁড়ানো। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস (ই) এবং ফরোয়ার্ড ব্লকসহ অধিকাংশই বলেছেন, আনন্দমঠ স্বাধীনতা আন্দোলনের উদ্বোধক এবং আজকের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং আনন্দ মঠের জাতীয়তাবাদ একই। অন্যদিকে সিপিএম এবং মনসুর হাবিবুল্লাহ বলছেন, আনন্দমঠ সাম্প্রদায়িক এবং বর্তমান ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সাথে এর কোন সামঞ্জস্য নেই।

পশ্চিমবঙ্গে আনন্দমঠ নিয়ে এই ঝগড়ার ইতিটা কিভাবে আমি বলতে পারি না। তবে আনন্দমঠ দিয়ে আনন্দমঠকে যতটা চিনি, আনন্দ মঠের পরের ইতিহাস যা বলে, তার বিচারে সরোজ বাবু ও মনসুর সাহেবদের অবস্থানটা বড়ই দুর্বল। কংগ্রেস রাজনীতির যে দর্শন ছিল এবং এখনো যা আছে তার সাথে হিন্দু মহাসভা এবং জনসংঘীদের কোনই পার্থক্য নেই। পার্থক্য যেটা সেটা বহিরাবরণের। আনন্দমঠ যে তখন হিন্দুদের মধ্যে কোনই বিতর্কের সৃষ্টি করেনি, সবাই একে লুফে নিয়েছিল এ কথা আমি বলি না। বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই আনন্দমঠের মূলমন্ত্রের লেখক কালি প্রসন্ন ঘোষকে লিখেছিলেন, ‘আমি আনন্দমঠ লিখিয়া কি করিব আর আপনি বা তাহার মূলমন্ত্র বুঝাইয়া কি করিবেন? এ ঈর্ষাপর আত্মোদরপরায়ণ জাতির উন্নতি নাই।’ কিন্তু এই সাথে তিনি একথাও বলেছিলেন, একদিন দেখিবে- বিশ-ত্রিশ বছর পর এই গান লইয়া বাংলা উন্মত্ত হইয়াছে। বঙ্কিমের এই কথাটিই অরবিন্দ যেভাবে তুলে ধরেছেন তা এই : ‘‘বঙ্কিম ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন একদিন আসবে যেদিন আনন্দমঠের বন্দে মাতরম ধ্বনিতে গোটা ভারত উচ্চকিত হবে। বিস্ময়করভাবে তার ভবিষ্যদ্বাণী ফলেছে।’’

অরবিন্দের সাথে আমরাও একমত। আনন্দমঠ প্রকাশিত হয় ১৮৮২ সালে। আর নিখিল ভারত কংগ্রেসের প্রথম সম্মেলন বসে কোলকাতায় ১৮৮৬ সালে। এই সম্মেলনে কি হেমচন্দ্র ‘রাখি বন্ধন’ নামে একটি কবিতা পাঠ করেন। এই কবিতায় কবি হেমচন্দ্র আনন্দমঠের ‘বন্দে মাতরম’কে জাগরণের স্লোগান হিসেবে উদ্ধৃত করেন। এভাবেই আনন্দমঠের বন্দে মাতরম সর্বভারতীয় রূপ পরিগ্রহ করল। বিপিন চন্দ্র পালের সম্পাদনায় বাংলা থেকে যখন ‘বন্দে মাতরম’ নামে পত্রিকা বের হলো, সেই সময় ভারতের অপর প্রান্ত থেকে লালা লাজপত রায়ের সম্পাদনায় আরেকটি পত্রিকা বের হলো। হিন্দুদের পত্র-পত্রিকা, প্রবন্ধ-গল্পে আনন্দমঠ ও আনন্দমঠের বন্দে মাতরম হলো অত্যন্ত পবিত্র আলোচনার এক বিষয়। ১৯০৫ সালে জনৈক যোগীনাথ সরকারের হাত দিয়ে ‘বন্দে মাতরম’ নামে সংগীতের একটা সংলকন বের হলো।

ভারতের এক প্রান্তের এ সংকলনটির ভূমিকা লিখলেন আরেক প্রান্তের (মহারাষ্ট্রের) সখারাম গণেশ দেউকর। মাত্র ২৩ দিনে পুস্তিকাটির তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সময়টা হিন্দুদের বঙ্গভঙ্গ রহিতকরণ আন্দোলনের সময়। মুসলিম স্বার্থবিরোধী এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই হিন্দুদের দ্বারা সৃষ্টি হলো স্বদেশী আন্দোলন। এই আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ আনন্দ মঠের স্রষ্টা বাবু বঙ্কিম চন্দ্রের মুসলিম নিধনে নিয়োজিত সন্তান সেনাদের বন্দে মাতরমকে স্লোগান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ কথায় বলতে চাই, সরোজ বাবু যাকে সাম্প্রদায়িক বলে চিহ্নিত করে স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছেন, সেই ‘বন্দে মাতরম’, সেই ‘আনন্দমঠ’, ভারতীয় হিন্দুদের উত্থান-চিন্তার সাথে ছিল একাত্ম। স্বয়ং সরোজবাবুও এটা অস্বীকার করতে পারেন না। তিনি কংগ্রেসী হিসেবে ১৯৩০ সালে জেলে যান।

‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি দেয়ার জন্য জেলে সরোজ বাবু বেত খেয়েছিলেন। আর ঐ সালেই সরোজ বাবু ও তার সঙ্গীরা দমদম জেলে ‘আনন্দমঠ’ মঞ্চস্থ করেছিলেন- যে আনন্দমঠে আছে ‘ধর্ম’ গেল জাতি গেল, মান গেল, কুল গেল, এখন তো প্রাণ পর্যন্ত যায়। এ নেড়েদের না তাড়াইলে আর কি হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে?’’ এখন সরোজ বাবু বলছেন, এগুলো তারা করেছেন না বুঝে। এটা সরোজ বাবুর একান্তই ব্যক্তিগত মত। আর একটা জিনিস ভুল মনে হওয়া এবং বাস্তবতা দু’টো সম্পূর্ণই স্বতন্ত্র জিনিস। তার একার এক উপলব্ধি দিয়ে তার জাতির বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারেন না, পারলেও তা আরেক ভুল হবে। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বাধীন ভারতীয় হিন্দুদের উত্থান চিন্তা থেকে এবং তাদের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে আনন্দমঠীয় আদর্শকে কিছুতেই বিচ্ছিন্ন করা যায় না। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যথার্থ বলেছেন, ‘বঙ্কিম বাবু যাহা কিছু করিয়াছেন… সব গিয়া একপথে দাঁড়িয়াছে। সে পথ জন্মভূমিকে উপাসনা- জন্ম ভূমিকে মা বলা- জন্মভূমিকে ভালোবাসা- জন্মভূমিকে ভক্তি করা। তিনি এই কার্য করিয়াছেন, ইহা ভারতবর্ষের আর কেহ করে নাই। তিনি আমাদের অন্তঃদ্রষ্টা। সে মন্ত্র বন্দে মাতরম।’

সুতরাং আনন্দ মঠ নিয়ে বিতর্কে প্রণব বাবুরাই জিতে যাচ্ছেন। তাই বলে সরোজ বাবু ও মনসুর সাহেবদের সব কথাই বেঠিক তা বলি না। বর্তমান ভারতের শাসনতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ আনন্দমঠীয় জাতীয়তাবাদ থেকে ভিন্ন- সরোজ বাবু ও মনসুর সাহেবদের এই কথা বহিরাবরণের দিক দিয়ে পুরোটাই ঠিক, কিন্তু অন্তর্গত দিক দিয়ে পুরোটাই বেঠিক। অন্তত ভারতীয় সংখ্যালঘুদের আজ কোনই সন্দেহ নেই যে, ধর্ম নিরপেক্ষতার পোশাক ভারতের শাসনতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ আরএসএস ও জনসংঘ, অন্যকথায় আনন্দমঠীয় দর্শনকেই বাস্তব রূপ দেবার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রমাণ তালাশের প্রয়োজন নেই। ভারতের হরিজন, খৃস্টান, মুসলিম, শিখ প্রভৃতি সংখ্যালঘুদের কথাগুলো কান পেতে শুনলেই সব স্বকর্ণে শোনা যাবে। এরপর সরোজ বাবু ও মনসুর সাহেবরা যেখানে আনন্দ মঠ ও বন্দে মাতরমকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, বক্তব্যের সে অংশটা তাদের ষোল আনাই ঠিক। আনন্দ মঠ ও বন্দে মাতরম সব অর্থ সব দিকের বিচারেই সাম্প্রদায়িক-একান্তভাবেই হিন্দু সম্প্রদায়ের নিজস্ব মর্মকথা। তাইতো দেখি, স্বাধীনতা আন্দোলনের যৌথ মঞ্চে যখন হিন্দুরা বন্দে মাতারম স্লোগান দিয়েছে, তখনই মুসলমানদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে আল্লাহ্ আকবর ধ্বনি। বৃটিশ ভারতে যৌথ আন্দোলনের দ্বিধা-বিভক্তির এখান থেকেই শুরু, শেষ হয়েছে ভারত বিভাগের মধ্যদিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আনন্দ মঠের ‘নেড়েদের তাড়াইয়া হিন্দুয়ানী’ রক্ষার স্লোগান শুধু হিন্দুদের জাগায়নি মুসলমানদেরও জাগিয়ে তুলেছিল। এই জাগারই উত্তর ফল তাদের স্বতন্ত্র আবাস-ভূমি এবং আজকের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। সুতরাং আনন্দ মঠ ইতিহাসের একটা মাইলস্টোন। সরোজ বাবুরা যাই বলুন এর শতবার্ষিকী ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই যুক্তিযুক্ত হয়েছে। আমরা এপারে বাংলাদেশীরা বুঝি কি না সেটাই প্রশ্ন। উপনিবেশিক শাসনামলে কোলকাতা কেন্দ্রীক বর্ণ হিন্দু সাহিত্যিকদের রচনায় মুসলিম বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ যেভাবে ছড়িয়ে দেয়। তার ফল সরূপ আমাদের আজকের বাংলাদেশ এবং ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ । উপনিবেশিক শাসনামলে কোলকাতা কেন্দ্রীক বর্ণ হিন্দু সাহিত্যিকদের রচনায় মুসলিম বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ যেভাবে ছড়িয়ে দেয়।

(ইহা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত মত, আমাদের প্রকাশনা নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে না, যার জন্য  প্রকাশক বা সম্পাদক দায়ী নহে)

Related posts