September 20, 2018

ফ্লাইওভার টাকা বানানোর মেশিন

যানজট নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ফ্লাইওভার বা উড়াল সেতু। বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করে অধিকাংশ ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ফ্লাইওভার যানজট নিরসনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে এনিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্লাইওভার যানজট না কমিয়ে বরং বৈদেশিক দেনার বোঝা বাড়াচ্ছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফ্লাইওভার টাকা বানানোর মেশিনে পরিণত হয়েছে। এ জন্য প্রথম দফায় প্রকল্প অনুমোদন পায়। এরপর দফায় দফায় তার মেয়াদ ও অর্থ বাড়ানো হয়। তখন ঠিকাদার ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ মিলেমিশে একাকার হয়ে যান। চারদলীয় জোট সরকার ও মহাজোট সরকারের আমলে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উড়াল সেতুর সঙ্গে মহাখালী ও খিলগাঁও ফ্লাইওভারের মাধ্যমে রাজধানীবাসীর প্রথম পরিচয় হয়। ওই সময় মহাখালীতে ১১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম রেলওভার উড়াল সেতু নির্মাণ করা হয়। ৬৬৭ দশমিক ৭৮ মিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় ২০০৫ সালে। ফ্লাইওভারটি মহাখালী রেলক্রসিং থেকে কাকলী পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করেছে। ফলে এটির মাধ্যমে শুধু উত্তরা, বিমানবন্দর, খিলক্ষেতগামী গাড়িগুলো মহাখালী রেলক্রসিংয়ের দীর্ঘ সিগন্যাল থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে তা ফার্মগেট বিজয় সরণি হয়ে মহাখালী, গুলশান-১, বনানী, বাড্ডা রুটে চলাচলকারী পরিবহনের জন্য কোনো সুফলই বয়ে আনতে পারেনি। ফলে মহাখালী এলাকার চিরচেনা যানজট এখনও পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। একই বছর ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ খিলগাঁও-বাসাবো ফ্লাইওভার খুলে দেয়া হয় যান চলাচলের জন্য।

৮১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই উড়াল সেতুর উপর দিয়ে সকল প্রকার যান চলাচল করলেও ২০১১ সালে ফ্লাইওভারটিতে ফাটল দেখা  দেয়। এরপর বাস, ট্রাকসহ ভারী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও তা ভারী যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। তবে ফ্লাইওভারটির নকশাগত ত্রুটির কারণে খিলগাঁও রেলক্রসিংয়ের যানজটে পড়তে হচ্ছে অধিকাংশ যানবাহনকে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে নেয়া  তেজগাঁও বিজয় সরণি রেলওভার ফ্লাইওভারটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় ২০১০ সালে। নির্মিত ফ্লাইওভারটি কার্যত  কোনো যানজট নিরসন তো করেইনি বরং বিজয় সরণিতে সৃষ্টি করেছে দীর্ঘ যানজটের। এসব ফ্লাইওভার নির্মাণের দফায় দফায় আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এদিকে খিলগাঁও, মহাখালী ফ্লাইওভার যানজট নিরসনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়ার পরও হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উড়াল সেতু প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। সরকারি- বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে সরকারের কোন অর্থ ব্যয় হয়নি। এখন টোল আদায়ের মাধ্যমে অর্থ তুলে নিচ্ছে কোম্পানিটি।

এদিকে মগবাজার- মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন হয় ২০১১ সালে। ওই সময় প্রকল্পের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাস। দুই বছর দেরিতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করে এলজিইডি। বেঁধে দেয়া সময়ে কাজ করার নির্দেশনা থাকলেও এক বছর পর প্রকল্পের  মেয়াদ ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে কয়েক দফা বাড়ানো হয় নির্মাণ খরচ। প্রথম পর্যায়ে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় পর্যায়ে তা করা হয়েছে ৭৭২ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সেক্ষেত্রে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। নতুন করে প্রকল্পের সময় বাড়লে এ প্রকল্পের ব্যয় এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তাই কয়েক বছরের ব্যবধানে নির্মাণ ব্যয় দুই গুণ করা হচ্ছে। এর আগে ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মিরপুর-এয়ারপোর্ট ফ্লাইওভার প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৯১  কোটি টাকা।

এখন তা বাড়িয়ে ৩৬০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এই টাকার মধ্যে বনানী রেলক্রসিং ওভারপাসও (সংশোধিত) নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া, কুড়িল বিশ্বরোড, বনানী, প্রগতি সরণি ও নিউ এয়ারপোর্ট এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত করতে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের অর্থও কয়েক দফা বাড়ানো হয়। হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক অনুদান ও বেসরকারি অর্থায়ননির্ভর এসব ফ্লাইওভার কতটুকু কাজে আসবে তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। তাদের অনেকেই মনে করছেন এসব ফ্লাইওভার শুধু দেনাই বাড়াবে। নগরীর যানজট নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখবে না। ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ও  সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের (সিইউএস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যখন ফ্লাইওভার অকার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়ে বাতিল করা হয়েছে ঠিক তখন ধার-দেনা করে আমরা ফ্লাইওভার বিলাসিতায় মেতেছি। এক প্রকার কংক্রিটের জঞ্জাল তৈরি করছি।

শরীরের কোথায় সমস্যা সেটা নির্ণয় না করে আমরা ইচ্ছামতো ট্রিটমেন্ট চালাচ্ছি। এমন একটা সময় আসবে যখন ফ্লাইওভারের উপরও যানজট সৃষ্টি হবে। যা মহাখালী, তেজগাঁও ফ্লাইওভারে ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, রাজধানীতে পাঁচটি ফ্লাইওভার চালু হয়েছে। কিন্তু ফলাফলটা কি হয়েছে তা সবার জানা। আরও কয়েকটি ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। এক সময় দেখা যাবে পুরো রাজধানী ফ্লাইওভারে ঢেকে  গেছে। এব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক, পরিবহন বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, যে কোনো মেগাসিটিতে ফ্লাইওভার প্রকল্প যানজট নিরসনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দেখতে হবে প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রহণ করা হচ্ছে কিনা। ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান (পরিবহন মহাপরিকল্পনা) অনুযায়ী ফ্লাইওভার প্রকল্প গ্রহণ করলে তা অবশ্যই ফলপ্রসূ হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে তার সবই  ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী হচ্ছে না।

তিনি বলেন, যত টাকা ব্যয় করে এসব ফ্লাইওভার করা হচ্ছে তার অর্ধেক টাকায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও মাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের মতো জনকল্যাণকর প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল। অন্যদিকে মেগাসিটির মধ্যে কোনো ফ্লাইওভারে চলাচলের জন্য টোল আদায় এবং তা যদি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে হয় তাহলে এখানে জনস্বার্থ প্রাধান্য পাবে না। গণশুনানির মাধ্যমে জনমুখী ফ্লাইওভার প্রকল্প হাতে নিতে হবে। তাহলে সেটা কার্যকর হবে। অন্যথায় তা হিতে বিপরীত হতে পারে।মানবজমিন

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts