September 20, 2018

ফ্রান্সের লজ্জা থেকে অহঙ্কারের অলঙ্কার!

আইফেল টাওয়ার

আলোকচ্ছটায় জীবন্ত আলোকচিত্র হয়ে ভাস্বর হতে থাকে প্যারিসের লাবণ্য। সহস্র আলোকের বর্ণছটায় যখন সাজে নগরী তখন কি কোন ধাতব কনিকার বিচ্ছুরণ আভা দেয়? যদি বলি দেয়? মেনে নেওয়া হয়তো কষ্টের কিন্তু তাহলে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত আইফেল টাওয়ারকে কি ধাতব কবিতা বলা যায়? না বলে উপায়ই বা কি? অথচ ধাতুর এই খাঁচা তৈরির সময় তার কদরই বোঝেনি ঋষি গেনেভিয়েভ, সম্রাট শার্লিম্যান, ঋষি ডেনিস, পিটার আবেলার্দ, রাজা ফিলিপ অগাস্টাস, সম্রাট প্রথম ফ্রাসোয়া, সম্রাট চতুর্দশ লুই, মহামতি নেপোলিয়ন, জেনারেল চার্লস দ্য গল, আন্দ্রে ল নতর, ব্যারন হাউস্যান, সাম্রাজ্ঞী ক্যাথারিন দ্য মেডিচি ও ম্যারি আন্টনোয়াট, ভিক্টর হুগেল বালজাকের স্মৃতিবিজড়িত প্যারিস। ভেবেছিল তাদের রূপময়ী প্যারীর সৌন্দর্য ও রসময়তা কেড়ে নেওয়ার এক চক্রান্ত হচ্ছে এই আইফেল টাওয়ার। অথচ কালের বিবর্তনে আজ আইফেল টাওয়ার প্যারিস শহরের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে গোটা বিশ্বে পরিচিত। ১৮৮৭ সালের ২৬ জানুয়ারি আইফেল টাওয়ার চালু হয়েছিল। শহরের মানুষ তখন বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, প্যারিসের সৌন্দর্যই এতে নষ্ট হয়ে গেল। বিশিষ্ট জনরা গর্জে উঠেছিলেন, “এ যেন এক দৈত্য শহরের লজ্জা”। এমনকি কমিটি গড়ে রীতিমতো “আইফেল টাওয়ার হটাও” আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি সেনাবাহিনী নাৎসিদের অপব্যবহার রুখতে টাওয়ারের অংশ বিশেষ ভেঙে ফেলার কথা ভেবেছিল। পরবর্তীতে হিটলার স্বয়ং আইফেল টাওয়ার ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যদিও তার সেই নির্দেশ অমান্য করা হয়েছিল।

ফরাসি বিপ্লবের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সে সময় শহরে বসেছিল আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আসর। এই ঘটনাকে বরণীয় ও স্মরণীয় করে তুলতে গড়ে তোলা হয়েছিল এই টাওয়ার। ১৮৮৭ থেকে ১৮৮৯ দুই বছর লেগেছিল টাওয়ারটি তৈরি করতে। এত কষ্ট করে তৈরি করে চট করে আবার তা খুলে না দিয়ে পরিকল্পনা ছিল, মেলা শেষ হওয়ার ২০ বছর পর সেটি আবার খুলে নেয়া হবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর কার্যকর হয়নি। কারণ ততদিনে আইফেল টাওয়ারের খ্যাতি গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে পর্যটকরা আসতে শুরু করে এই “আয়রন লেডি”কে দেখতে, যা ততদিনে আইফেল টাওয়ারের ডাকনাম হয়ে গেছে। আশেপাশের দোকানে বিক্রি হচ্ছে আইফেল টাওয়ারের ক্ষুদ্র সংস্করণ। কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতারা এই টাওয়ার দেখে প্রেরণা পেতে শুরু করেছেন। এই সব কাণ্ড-কারখানা দেখে প্যারিসের মানুষ অবাক। অবাক স্বয়ং গুস্তাভো আইফেল-ও, যিনি এই টাওয়ারের স্থপতি। উদ্বোধনের দিন ফরাসি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার সময় তিনি ভাবতেই পারেননি যে, তার এই সৃষ্টি অমরত্বের পথে যাচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, সেই যুগে প্রায় ৩০০ মিটার লম্বা এই টাওয়ার ছিল গোটা বিশ্বে মানুষের তৈরি সবচেয়ে উচু কোনো সৃষ্টি। ১৯৫৭ সালে একটি অ্যান্টেনা বসানোর পর উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ৩২৪ মিটার। ৭ হাজার ৩০০ টন ইস্পাত দিয়ে তৈরি হয়েছে এই টাওয়ার। আর লোহার খণ্ড ছিল ১৮ হাজার ৩৮টি। ৩০০ জন শ্রমিক এই নির্মাণ যজ্ঞে অংশ নিয়েছিল। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে পরবর্তী ৪০ বছর ধরে পৃথিবীর উচ্চতম টাওয়ার ছিল এটি, টেলিগ্রাফ এবং রেডিও সঙ্কেত পাঠানোর কাজেও ব্যবহার করা হয়েছে এই টাওয়ারকে। ১৯২১ সালে ফ্রান্সের প্রথম পাবলিক রেডিও সম্প্রচার শুরু হয় এই আইফেল টাওয়ার থেকেই। এখন সূর্যাস্তের পর থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিট করে আলোর সাজে সেজে ওঠে “লা তুর দিফেল”। প্রায় ২০ হাজার বাল্বের সেই আলোর ছটা অপরূপ এক দৃশ্য উপহার দেয় প্রতিদিনই। সে আলোয় ছটায় অনেকটা ফিকে হয়ে যায় প্যারিসের অন্যসব স্থাপনা।

Related posts