September 26, 2018

ফেসবুকে ওসিকে ফাঁসানোর চেষ্টা, গুলিবিদ্ধ প্রেমিকা

প্রেমিকা

বহু পুরুষের উষ্ণ সান্নিধ্যের আকাঙ্খার ফলেই কি গুলি খেতে হলো বেলেঘাটার তরুণীকে? গতকাল মঙ্গলবার প্রেমিকের অস্ত্র থেকে ছুটে আসা গুলিতে জখম ঝুমকি দাস এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গণপিটুনিতে আহত ও গ্রেপ্তার হওয়া প্রেমিক দিবাকর দে একই হাসপাতালে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, বহু পুরুষের সঙ্গ পছন্দ করতেন ঝুমকি। প্রেমিক প্রবল সন্দেহ করতেন তাঁকে। সেই থেকেই অশান্তি। বাগে আনতে না পেরে রায়গঞ্জ থেকে কলকাতায় এসে প্রেমিকাকে খুনের চেষ্টা করেন দিবাকর।

ঝুমকির ফেসবুক প্রোফাইলে লেখা, “কনস্টেবল অসীম আমাকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে নোঙরামি করেছে। বেলেঘাটা থানার ওসি দেবজিৎ চ্যাটার্জি ব্যবস্থা নেয়নি। ওসি আমাকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে নোঙরামি করেছে। দিবাকর তাকে উচিত শিক্ষা দিয়েছে।” বেলেঘাটা থানা পুলিশ ফেসবুকের এই পোস্ট নিয়ে তদন্ত কাজ শুরু করেছে।

এ ব্যাপারে আজ বুধবার সংবাদ মাধ্যমের কাছ ঝুমকি দাবি করেছে, তাঁর ফেসবুক প্রোফাইল তৈরি করেছিল দিবাকর।  ওই যুবকই নিজের স্বার্থে পুলিশের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মন্তব্য করেছে।

হাসপাতালের বেড থেকে একই সঙ্গে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন গুলিবিদ্ধ ঝুমকি। তিনি জানিয়েছেন, “বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত মার্চ মাসে দিবাকর আমাকে রায়গঞ্জে নিয়ে গিয়েছিল। নিজের বাড়িতে না রেখে আমাকে একটি ভাড়া ঘরে রাখে। দিনের পর দিন ধর্ষণ করে। মারধরও করত। বাধ্য হয়ে আমি রায়গঞ্জ থেকে কলকাতায় পালিয়ে আসি।”

গতকালের ঘটনা প্রসঙ্গে ঝুমকি জানিয়েছেন, “আমি বারান্দায় বসে খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি গেট খুলে দিবাকর আসছে। আমি ভয় পেয়ে পালাতে যাই। দিবাকর আমাকে পিছন থেকে গুলি করে।”

এ ছাড়াও পুলিশ জানতে পেরেছে, ঝুমকির মা তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে বধূ নির্যাতনের অভিযোগ এনেছিলেন। এখন ঝুমকির বাবা আলাদা থাকেন। ঝুমকিও তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনে ঘর ছাড়েন। বেলেঘাটায় মা, ভাই ও মেয়েকে নিয়ে থাকেন তিনি। স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে মায়ের কাছে ফিরে আসার পর অজয় রায় নামে স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক হয়। কিছুদিন পরে ওই যুবকের বিরুদ্ধেও শ্লীলতাহানির অভিযোগ দায়ের করেন এই তরুণী। এরপর আলাপ হয় রায়গঞ্জের যুবক দিবাকরের সঙ্গে। দিবাকর নিজেকে ডাক্তার বলে পরিচয় দেন। তাঁর সঙ্গে রায়গঞ্জে গিয়ে কিছুদিন ছিলেন ঝুমকি। ফিরে আসার কিছুদিন পর এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ সূত্রে খবর, দিবাকর পুলিশি নজরদারিতে রয়েছে। ঝুমকির ভাই দিবাকরের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টা মামলা রুজু করছে। পুলিশ দিবাকরের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। ইতিমধ্যেই তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা রুজু হয়েছে।

গুলিবিদ্ধ এই তরুণী পুলিশের নামে অভিযোগের পাশাপাশি অভিনন্দনও জানিয়েছেন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘ঝুমকি দাস দে’ নামে যে প্রোফাইলটি আছে তা পরীক্ষা করছে লালবাজার। ওই প্রোফাইলে ১০ অক্টোবর পোস্ট করা হয়েছে, “লেডি সাব ইন্সপেক্টর বর্ণা ঘোষালকে সবাই ধন্যবাদ জানান। পাঁচমাস আগে আমাকে পিস্তল দেখিয়ে গণধর্ষণ করা হয়েছিল। সাব ইন্সপেক্টর বর্ণা ঘোষাল আমাকে সাহায্য করেছেন। ওঁকে ধন্যবাদ।”

সূত্র আরো জানায়, এ ঘটনায় তদন্তকারী অফিসাররা খোঁজ নিচ্ছেন, এই প্রোফাইল কে চালাতেন। কেন পুলিশের নামে অভিযোগ করা হল? প্রাথমিকভাবে অনুমান, দিবাকরই ঝুমকির বিরু‌দ্ধে পুলিশকে খেপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ওই পোস্টগুলি করেছিল। পোস্ট পড়ে অনেকে রসালো মন্তব্য করেছেন। যাঁরা মন্তব্য করেছেন তাঁরা ঝুমকির পরিচিত কি না তার খোঁজ নিচ্ছে পুলিশ।

জানা গিয়েছে, দিবাকর নিজেকে প্রাক্তন সেনাকর্মী হিসাবে পরিচয় দিত। নিজেকে ডাক্তার বলেও দাবি করত। মহিলাঘটিত কারণে তাঁকে সেনা বাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের বাসিন্দা ওই যুবকের কাছ থেকে একটি ৯ এমএম পিস্তল উদ্ধার হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, একটি ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটের মাধ্যমে বেলেঘাটার বাসিন্দা ঝুমকির সঙ্গে আলাপ হয় দিবাকরের। তার বাড়ি রায়গঞ্জ শহর থেকে কিছুটা দূরে সুভাষগঞ্জে। পাঁচ বছর আগে ঝুমকির বিয়ে হয়েছিল। তাঁর একটি মেয়ে আছে। পারিবারিক অশান্তির জেরে ঝুমকির সঙ্গে তাঁর স্বামীর ডিভোর্সের মামলা শুরু হয়। এর মধ্যেই দিবাকর ও ঝুমকির আলাপ হয়। দিবাকর নিজেকে হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক বলে পরিচয় দেয়। বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করার জন্য রায়গঞ্জ থেকে মাঝেমধ্যেই কলকাতায় আসতেন ওই যুবক। দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতাও হয়।

ঝুমকির পরিবারের লোকেদের সঙ্গেও আলাপ করে দিবাকর। দুজনের সম্পর্ক এগিয়ে যায়। এমনকি, দিবাকর ঝুমকিকে সুভাষগঞ্জেও নিয়ে যায়। কিন্তু কয়েকটি বিষয়কে ঘিরে দিবাকরের সঙ্গে গোলমাল বাধে ঝুমকির। এমনকি, দিবাকরের বিরুদ্ধে বেলেঘাটা থানায় অভিযোগও দায়ের করা হয়। পুলিশের একটি টিম রায়গঞ্জে গিয়ে তদন্তও চালায়। এর পর থেকে ঝুমকি ওই যুবককে এড়িয়ে চলতে থাকেন। অভিযোগ, দিবাকর মাঝেমধ্যেই তাঁকে প্রাণে মারার হুমকি দিত।

Related posts