September 22, 2018

ফের রক্তাক্ত ফ্রান্স

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কঃ  ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় নিস শহরে বাস্তিল দিবসের উৎসবে জড়ো হওয়া জনতার ওপর দ্রুত গতিতে ট্রাক চালিয়ে দেয়ার ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ৮৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও প্রায় অর্ধশত মানুষ। এ ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। গত বৃহস্পতিবার রাতের এ ঘটনায় পুলিশ চালককে গুলি করে হত্যা করে ট্রাক থামায়। বাস্তিল দিবস উদযাপন করতে বহু লোক ওই সময় শহরের ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী বিখ্যাত প্রমেনেদ দেজাঙ্গলে চত্বরে জড়ো হয়েছিলেন। আতশবাজির প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরপরই সেই ভিড়ের মধ্য দিয়ে ২৫ টনি ওই ট্রাক একশ’ মিটারের বেশি চওড়া রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ গুলি চালানোর আগে ওই ট্রাকচালকই গুলি করে। ওই ট্রাকে অস্ত্র ও গ্রেনেডও পাওয়া গেছে। প্যারিসে ইসলামী স্টেট জঙ্গিদের হামলায় ১৩০ জন নিহত হওয়ার আট মাসের মাথায় ফ্রান্সজুড়ে জরুরী অবস্থার মধ্যেই এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটলো। একজন মাত্র হামলাকারী নিসের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী প্রাথমিকভাবে হামলার দায় স্বীকার না করলেও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ একে সন্ত্রাসী হামলা বলে অভিহিত করেছেন।

ফ্রান্স এখন ইসলামী সন্ত্রাসবাদের হুমকির মুখে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর বিরুদ্ধে লড়তে সম্ভাব্য সব কিছুই আমাদের করতে হবে। হামলাকারী পুলিশের গুলিতে নিহত জনতার ওপর দ্রুতগতির ট্রাক-হামলা চালিয়ে ৮৪ জন নিরীহ মানুষকে হত্যাকারী ট্রাকচালক পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধকালে নিহত হয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, জনতার ওপর ট্রাক উঠিয়ে দেবার পর বেপরোয়া চালক ঘটনাস্থল থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে যেতে থাকা নারী-পুরুষদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে। এসময় সেখানে মোতায়েন পুলিশ সদস্যরা পাল্টা গুলি চালালে বন্দুকধারী চালক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, হামলাকারী ব্যক্তির নাম ‘লাউয়েজ বুলেল’ বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। পুলিশের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গতকাল এ খবর দিয়েছে। সংবাদমাধ্যম জানায়, আত্মঘাতী হামলাকারী বুলেল তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি। সে ফ্রান্স ও তিউনিসিয়ার দ্বৈত নাগরিক ছিল। বয়স ছিল ৩১ বছর। নিস শহরেই বসবাস করতো বুলেল। জরুরী অবস্থার মেয়াদ বাড়ল গত বছর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ফ্রান্সে জারি করা জরুরী অবস্থা আরো তিন মাস বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ট্রাক-হামলার পর জরুরী অবস্থার এ সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী হামলা আখ্যা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে জরুরী অবস্থা আরও তিন মাস বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এদিকে, পুলিশের গুলিতে ওই হামলাকারী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। হামলার ঘটনায় বিশ্বনেতারা নিন্দা জানিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন। প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারী তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত। একই সঙ্গে সে ফ্রান্স ও তিউনিসিয়ার দ্বৈত নাগরিক (ডুয়েল সিটিজেনশিপ)। তার বয়স ৩১। জানা যায়, জনতার ওপর ট্রাক উঠিয়ে দেয়ার পর বেপরোয়া চালক ঘটনাস্থল থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে যেতে থাকা নারী-পুরুষদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে। এসময় সেখানে মোতায়েন পুলিশ সদস্যরা পাল্টা গুলি চালালে বন্দুকধারী চালক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। ২৫ টন বহন ক্ষমতার ট্রাকটিতে বিস্ফোরক, গ্রেনেড ও অস্ত্র ছিল। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যা যা প্রয়োজন সব করা হবেঃ ওলাঁদ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেছেন, তাঁর দেশের নিস শহরে জনতার ওপর ট্রাক তুলে দিয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানোর বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে সন্ত্রাসী হামলা।

নিস শহরে হতাহতের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শুক্রবার ভোরে এক জরুরী বৈঠকের পর এ কথা বলেন তিনি। টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, এই ঘটনা যে সন্ত্রাসী হামলা, তা অস্বীকার করার জো নেই। ওলাঁদ আরো বলেন, ফ্রান্স মারাত্মকভাবে হামলার শিকার। এ ধরনের হামলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যা যা করা দরকার, তা করা হবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেন, পুরো ফ্রান্স ইসলামি সন্ত্রাসবাদের হুমকির মধ্যে রয়েছে। দায় স্বীকার করেনি কেউ বিগত সময়ে দেখা গেছে বিভিন্ন দেশে এ ধরনের হামলার দায় ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যেই স্বীকার করে নেয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন। এর মধ্যে সবার অগ্রভাগে থাকে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক উগ্রবাদী সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস। কিন্তু নিসে হামলার ঘটনার প্রায় একদিন পেরিয়ে গেলেও আইএস বা এমন কোনো সংগঠন হামলার দায় স্বীকার করেনি। অনলাইনে উল্লাস আইএস সমর্থকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে হামলার দায় স্বীকার না করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করেছে আইএস সমর্থকরা। উল্লাস প্রকাশ করে এক আইএস সমর্থক টুইট করেছে, ফ্রান্সের নিস শহরে নিহত ক্রুসেডার ও অবিশ্বাসীদের সংখ্যা ৮৪ তে পৌঁছেছে…আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান।

বিশ্বনেতৃবৃন্দের নিন্দা হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্বনেতৃবৃন্দ। ডেইলি মেইল জানায়, নিস হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে ওবামা বলেন, মার্কিন জনগণের পক্ষ থেকে নিস শহরে বাস্তিল ডে উদযাপনে হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। হামলায় নিহতদের পরিবারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সহমর্মিতা থাকবে। তিনি বলেন, হামলার ঘটনার তদন্ত এবং হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে সব ধরনের সহযোগিতা করবে যুক্তরাষ্ট্র। এক টুইটার বার্তায় নিস হামলার ঘটনায় নিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট ঘোষণার সংবাদ সম্মেলন বাতিলের কথা জানান, মার্কিন প্রসিডেন্ট নির্বাচনের রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন এক বিবৃতিতে নিস হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, মার্কিন নাগরিকরা ফ্রান্সের প্রতি সহমর্মিতা জানাচ্ছে। সম্প্রতি হামলার ঘটনার সম্মুখীন হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের অরল্যান্ডো শহরের পুলিশ বিভাগ নিস হামলার ঘটনায় সহমর্মিতা জানিয়েছে। এদিকে বিবিসি জানায়, মঙ্গোলিয়ার উলানবাটোরে গত শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এশিয়া-ইউরোপ শীর্ষ সম্মেলনের (আসেম) শুরুতেই নিস শহরে নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়।

ওই সম্মেলনে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেল, ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-মার্ক এঁহু, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আসেমভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নিয়েছেন। ব্রিটেনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন এক টুইটার বার্তায় বলেন, নিস হামলা এবং সেখানে নিহতের ঘটনায় তিনি মর্মাহত। টুইটার বার্তায় অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল নিস হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, বাস্তিল ডে আয়োজনে নিস শহরে হামলায় নিহতদের জন্য অস্ট্রেলিয়া শোকাহত। মঙ্গোলিয়ায় অবস্থানরত চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এক বিবৃতিতে সব ধরনের সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানান এবং ফ্রান্সের নিস শহরে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে নিস হামলায় আহতদের মধ্যে দু’জন চীনা নাগরিক থাকার কথা বলা হয়েছে। নিস হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ নিস শহরে নিহতদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেন। তিনি জানান, আহতদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ আরো বলেন, ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি মোকাবিলায় পুলিশের সঙ্গে ১০ হাজার সেনাসদস্য থাকবে।

একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পুলিশকে সহায়তার আহ্বান জানান তিনি। দুইদিন আগেই ট্রাকটি ভাড়া করে হামলাকারী যে ট্রাকটি নিয়ে হামলা চালানো হয় ফ্রান্সের নিস শহরে বাস্তিল দিবস উদযাপনকারীদের ওপর, হামলার দুইদিন আগে ট্রাকটি ভাড়া করেন হামলাকারী। পুলিশ সূত্র এবং ফরাসি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে খবরটি নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। তাছাড়া ফ্রান্সের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে ওই গাড়ি চালকের নামও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সেই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেনি গার্ডিয়ান। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুইদিন আগে নিস শহরের পার্শ্ববর্তী সেইন্ট-লঁরা-দু-ভার থেকে ট্রাকটি ভাড়া করেন চালক। বিস্তারিত জানতে ফরেনসিক কর্মকর্তারা গাড়িটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। এরইমধ্যে শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাক চালককে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তিনি তিউনিসিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক। ৩১ বছর বয়সী এ ব্যক্তি একাই হামলা চালিয়েছেন নাকি তার কোনও সহযোগী ছিল তা নিশ্চিত হতে ব্যাপক পুলিশি অভিযান চলছে। ফ্রান্সের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে ট্রাক চালকের নামও প্রকাশ করা হয়েছে।

বলা হয়েছে তার নাম মোহাম্মদ লাহৌআইজ বৌহলেল। তবে খবরটির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হামলা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিসের প্রসিকিউটর অফিসের বরাত দিয়ে ফরাসি গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, মানুষের উপর যখন ট্রাকটি উঠিয়ে দেয়া হয় তখনই অন্তত ৮৪ জন নিহত হন। ভয়াবহ এই হামলার এক টুইটে নিজের একটি সংবাদ সম্মেলন পিছিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিসের স্থানীয় সরকার প্রধান ক্রিস্তিয়ান এসত্রোসি জানিয়েছেন, পুলিশ পরে ট্রাকটিতে আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক ও গ্রেনেড পেয়েছে। নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারজোকি। হামলার পর এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের পক্ষে আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। অবস্থাদৃষ্টে ঘটনাটি ভয়াবহ একটি সন্ত্রাসী হামলা বলেই মনে করা হচ্ছে। আমার ফ্রান্সের পাশে আছি। ডমিনিক মলিনাকে নামে এক মার্কিন প্রত্যক্ষদর্শী সিএনএনকে জানিয়েছেন, ট্রাকটি ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০ মাইল গতিতে ছুটছিল। হামলার পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ বলেছেন, এটা যে একটা সন্ত্রাসী হামলা ছিল তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

তিনি আরো বলেছেন, এই মাসের শেষের দিকে ফ্রান্সে জরুরি অবস্থায় যে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা আরো তিন মাস বাড়ানো হচ্ছে। ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হামলায় আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনাও করেছেন তিনি। এ ধরনের হামলাকে বর্বর ও কাপুরুষোচিত আখ্যা দিয়ে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। প্রত্যেক মার্কিন নাগরিক ফ্রান্সের মানুষের পাশে আছে বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন হিলারি ক্লিনটন। বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, এনডিটিভি।

Related posts