November 13, 2018

ফিলিস্তিনীদের যেভাবে ইহুদী বানাচ্ছে ইসরায়েল

ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডকে দ্বিখন্ডিত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ প্রস্তাব অনুসারে নিজেদের মাতৃভূমির মাত্র ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনীদের এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদীবাদীদের হাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এভাবে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের স্থায়ী আসন গেড়ে বসে।

এ রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দেয়নি বেশিরভাগ মুসলিম দেশই। মধ্যপ্রাচ্যের ‘অবৈধ’ রাষ্ট্র বলে আখ্যায়িত করা হয় ইসরায়েলকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল করে নিজেদের সীমানা সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে ইসরায়েল। তবে এখন আর শুধু সীমানা সম্প্রসারণই নয়, ফিলিস্তিনিদের ওপর ধর্মীয় সম্প্রসারণবাদও শুরু করেছে তারা।

ফিলিস্তিনের স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী ও কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েলের দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের স্কুলগুলোতে ইসরায়েলী পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দিতে তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রদান করছে ইসরায়েল। বর্তমানে পূর্ব জেরুজালেমের প্রায় সবগুলো স্কুলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রণীত পাঠ্যসূচি ব্যবহার করা হয়। এর আগে এলাকার স্কুলগুলোর জন্য ব্যবহার করা হতো জর্দানের পাঠ্যসূচি।

ইসরায়েলের এ ধরনের প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনীরা। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, পূর্ব জেরুজালেমে বাস করা ৩ লাখ ফিলিস্তিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করছে ইসরায়েল। এ লক্ষ্যে পূর্ব জেরুজালেম থেকে পশ্চিম তীরকে আলাদা করার জন্যই ফিলিস্তিনের পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন ঘটাতে চাইছে ইসরায়েল। অথচ ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হওয়ার কথা রয়েছে পূর্ব জেরুজালেম।

ফিলিস্তিনের শিক্ষামন্ত্রী সাবরি সাইদাম বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের জাতীয় পরিচয়ের ওপর আঘাতের অংশ হিসেবে ইসরায়েল আমাদের পাঠ্যক্রমের ওপর এ আঘাত হানার চেষ্টা করছে। দেশটি তার অবৈধ দখলদারিত্ব মজবুত করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

তবে ইসরায়েলের এ ধরনের প্রচেষ্টা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর প্রথম ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলী পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল দেশটি। এর প্রতিবাদে তখন ফিলিস্তিনের শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা কয়েক মাস ধরে আন্দোলন অব্যহত রাখে। তাদের আন্দোলনে কারণে ইসরায়েলের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়ার পর সেখানকার শিক্ষাব্যয় বহন করে আসছে ইসরায়েল। স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠগুলোর ভয়, ইসরায়েলী পাঠ্যক্রম গ্রহণ না করলে পূর্ব জেরুজালেমের শিক্ষাখাতে বাজেট কমিয়ে দেবে তারা। ইসরায়েলী পাঠ্যক্রমে ফিলিস্তিনের ইতিহাস এবং জাতীয় পরিচয়ের বিষয়টিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এর পরিবর্তে ইসরায়েলের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বেশি। পুরো জেরুজালেমকে ইসরায়েলের একক রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা আছে তাদের পাঠ্যক্রমে।

ফিলিস্তিনী স্কুলগুলোর অভিভাবক সমিতির মুখপাত্র হাতেম খিওয়েশ বলেন, ‘আল-আকসা আমাদের পবিত্র ভূমি নয়, ফিলিস্তিনের পতাকা আমাদের পতাকা নয়- এসব কথা আমরা আমাদের সন্তানদের শিখাতে চাই না। আমাদের এই ভূখণ্ড দখলকারীদের এবং এরিয়েল শ্যারন একজন ‘হিরো’- এই কথাগুলোও আমরা তাদের শিক্ষা দিতে চাই না।’

গত বছর ইসরায়েলের উর্দ্ধতন এক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, পূর্ব জেরুজালেমের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে ১ হাজার ৯০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে, যাদের মাত্র পাঁচ শতাংশ শিক্ষার্থী ইসরায়েলের পাঠ্যক্রম অনুসারে ‍শিক্ষাগ্রহণ করে। এ তথ্য গণমাধ্যগুলোতে প্রকাশিত হওয়ার পরই ফিলিস্তিনীদের ওপর ইসরায়েলের পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দেয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এতদিন ধরে ইসরায়েল এবং তাদের দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদী এবং ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা পাঠ্যক্রম অনুসারে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল ইসরায়েল। সাইদাম জানান, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসারে, সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে দখলকৃত ভূখণ্ডের ঐতিহ্য, জাতীয় পরিচয় এবং সাস্কৃতিক মূল্যবোধ মেনে চলার কথা রয়েছে ইসরায়েলের।

তবে ইসরায়েলের শিক্ষামন্ত্রী নাফতালি বেনেট জানান, ইসরায়েলী পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা স্কুলগুলোর প্রতি তিনি উদার থাকবেন। তার ভাষায়, ‘আমার নীতি স্পষ্ট। আমি ইসরায়েলীকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’ যেসব স্কুল ইসরায়েলের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করবে তাদের জন্য অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ফিলিস্তিনের একটি সুশীল সমাজের প্রধান জাকারিয়া ওদেহ বলেন, ‘রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে ফিলিস্তিনীদের ইহুদী বানানোর জন্য শ্রেণিকক্ষে তাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে চাইছে ইসরায়েল। কারণ রাজনৈতিক সমস্যাই তাদের হতাশার প্রধান কারণ।

ইসরায়েলী পাঠ্যক্রমে ফিলিস্তিনীদের একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ইসরায়েল সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে না নিলে পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনীদের পরিচালিত স্বায়ত্ত্বশাসিত স্কুলও বন্ধ করে দেয়া হবে ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের এ ধরনের প্রচেষ্টাকে ফিলিস্তিনের নতুন প্রজন্মকে ইহুদী বানানোর চেষ্টা বলেই আখ্যায়িত করছে সুশীল সমাজ

Related posts