November 17, 2018

ফিতরা রোজাকে পরিশুদ্ধ করে

ডেস্ক রিপোর্টঃ  ইবাদত-বন্দেগীতে কোনো ধরনের ত্রুটি বিচ্যুতি হলে মহান রাব্বুল আলামীন তা শুধরে নেয়ার সুযোগ দিয়েছেন। ফরজ নামাজের ক্ষতি পুষিয়ে যেমন নফল নামাজের ব্যবস্থা রেখেছেন। এমনিভাবে সিয়াম পালনে যে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকে তার ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য ‘সদকাতুল ফিতর’ আদায়ের বিধান দিয়েছেন।

‘সাদকাহ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘দান’। পরম করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য যে দান করা হয়, তাকে বলে সাদকাহ। ‘আল ফিতর’ অর্থ রোজা না রাখা বা রোজা রাখা থেকে বিরত হয়ে যাওয়া। রমজান মাস শেষে রোজা ভাঙার দরুণ যে দান তাকে বলা হয় ‘সাদকাতুল ফিতর’। এর অপর নাম, যাকাতুল ফিতর। রোজা বিরতির যাকাত। ইসলামী বিধান অনুযায়ী ‘ফিতরা’ আদায় ওয়াজিব।

হাদিসে এসেছে, রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহর ফরজ ইবাদতগুলো যথাসাধ্যভাবে আদায় করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনেক সময় ভুলভ্রান্তি হয়ে যায়, মাহে রমজানের রোজা পালনে অত্যন্ত সতর্কতা সত্ত্বেও যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়, তার প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণের জন্য শরিয়তে রমজান মাসের শেষে সাদাকাতুল ফিতরকে ওয়াজিব করে দেয়া হয়েছে।

ফিতরা মূলত খাদ্যবস্তুনির্ভর দান। নির্ধারিত পরিমাণ ভোজ্যসামগ্রী বা তার সমপরিমাণ অর্থ বিতরণের মাধ্যমে ফিতরা আদায় করা যেতে পারে। মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) হাদিসে ফিতরার সঠিক পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী নির্ধারণ করে দিয়েছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসুল (সা.) ফিতরার খাদ্যবস্তু ও পরিমাণ নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, মুসলমান আজাদ কিংবা ক্রীতদাস নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবার পক্ষ থেকে এক সা পরিমাণ (প্রায় চার সের) খেজুর বা যব ফিতরা হিসেবে আদায় করতে হবে।

(হাদিস নং ৭৯১, বোখারি শরিফ, দ্বিতীয় খ-, পৃ. ৫৯) মাহে রমজানে সব ইবাদতের সওয়াব যেমন অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়, নফল ইবাদতে ফরজের সমান এবং একটা ফরজে ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব পাওয়া যায়, তেমনিভাবে এ মাসে দান-খয়রাত বা সাদকা করলেও অধিক সওয়াব বা পুণ্য লাভ করা যায়। একবার নবী করিম (সা.)-কে সর্বোত্তম দান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘দাতার কাছে যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্যমান বেশি।’ (বুখারি) রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দান করার ব্যাপারে উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়ে যেত। তিনি মাহে রমজানকে সহানুভূতির মাস বলে আখ্যায়িত করেছেন। নবী করিম (সা.) সাদকাতুল ফিতর এ জন্য নির্ধারিত করেছেন, যাতে ভুলক্রমে অনর্থক কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে রোজা পবিত্র হয় এবং মিসকিনদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা হয়।

রমজান মাস শেষ দশক আসার সঙ্গে সঙ্গে রোজাদারের অপরিহার্য কর্তব্য হলো নির্ধারিত পরিমাণে সাদকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করা। সামর্থ্যবান পিতার ওপর তার নাবালক ছেলেমেয়েদের পক্ষ থেকে সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। মহিলাদের কেবল নিজের পক্ষে ফিতরা দেয়া ওয়াজিব। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের নিজের সম্পদ থাকলে তা থেকেই ফিতরা দেয়া যাবে। আর প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা মুস্তাহাব। গৃহকর্তা এবং তার পোষ্যদের সংখ্যা হিসাব করে প্রতিজনের বিপরীতে নির্ধারিত অর্থমূল্যে ফিতরা আদায় করা বাঞ্ছনীয়। ফিতরা সেসব গরিব-মিসকিনই পাবেন, যারা জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সাদকা বা জাকাত দরিদ্র, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ইসলামের প্রতি যাদের মন আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, বন্দি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত বিপদগ্রস্ত পথিকের জন্য (ব্যয়িত হবে), এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা-আত-তওবা, আয়াত-৬০)

ফিতরা ঈদের দুই-তিন দিন আগে আদায় করলে অধিক সওয়াব পাওয়া যায়। ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায় করা সুন্নত। তবে তা সম্ভব না হলে ঈদের নামাজের পর অবশ্যই আদায় করতে হবে। হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) সাদাকায়ে ফিতরের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তা লোকেরা সালাতের উদ্দেশে বের হওয়ার আগেই আদায় করে। নবী করিম (সা.) নিজেও ঈদের দু-এক দিন আগে ফিতরা আদায় করে দিতেন।’ (আবু দাউদ) হাদিসে উল্লেখ আছে যে ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজাদার ব্যক্তির অসৎ কাজকর্ম থেকে সিয়ামকে পবিত্র করার জন্য এবং অভাবীদের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেয়ার জন্য সাদাকাতুল ফিতরের বিধান দিয়েছেন। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে এ ফিতরা আদায় করবে, তা জাকাত হিসেবে কবুল হবে আর নামাজের শেষে আদায় করা হলে তখন তা সাদকা হিসেবে কবুল হবে।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজা) সাদকা-ফিতরা যাদের দেয়া হবে, তাদের এ কথা জানানোর প্রয়োজন নেই যে তোমাকে ফিতরা দিচ্ছি অথবা এটা যাকাতের টাকা প্রভৃতি। বরং গরিব আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীকে সাদকা, ফিতরা বা যাকাত দেয়ার সময় তা কিসের বাবদ দেয়া হচ্ছে, তা আলোচনা না করাই শ্রেয়। দাতার কথাবার্তা বা কার্যকলাপ দ্বারা যেন এ কথা প্রকাশ না পায় যে সে গ্রহীতাকে সাহায্য করছে। এ সাদকা তো দাতার দান নয়, বরং সাদকা দিয়ে সে দায়মুক্ত হলো মাত্র। আর সওয়াব বা প্রতিদান তো আল্লাহরই কাছে পাবেন। উপরন্তু গ্রহীতা তা গ্রহণের ফলেই দাতা দায়িত্বমুক্ত হতে পেরেছেন। এ অর্থে বরং গ্রহীতাই দাতার উপকার করেছেন।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ২০ জুন ২০১৬

Related posts