September 21, 2018

ফাহিম হত্যায় আদালত দায়ী!

সিরাজী এম আর মোস্তাক
আদালত কর্তৃক দশ দিনের রিমান্ড আদেশের পর আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হেফাজতে গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিমের হত্যায় বিচার বিভাগের অক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ পুরোপুরি ব্যর্থ, অকর্ম্মন্য ও ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। এটি হুকুম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান মাত্র। দেশে আইন শৃঙ্খলা বা বিচার বলতে কিছু নেই। সম্প্রতি পুলিশের আইজিপি মহোদয় আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাতদিনের সাঁড়াশি অভিযানের আদেশ দিয়েছেন এবং সারাদেশে ১৪৫০০ এর অধিক জনতাকে আটক করেছেন। এ আদেশদানের ক্ষমতা শুধুমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিচার বিভাগ ব্যতিত অন্য কারো নেই। পুলিশ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নকারী মাত্র। সাঁড়াশি অভিযানের নোটিশে আইজিপি ব্যতিত কারো স্বাক্ষর নেই। তিনি নিজ ক্ষমতায় তা করেছেন।

এতে স্পষ্ট হয় যে, বিচারকেরা তাদের দায়িত্বভার পুলিশের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এ কারণেই ছবিতে উল্লেখিত ফুটফুটে বালক ফাহিমের হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। এ ঘটণায় বিচার বিভাগ চড়া মূল্য দিতে বাধ্য। জনগণ তাদের শ্রমের বিনিময়ে কেন এমন অক্ষম বিচার বিভাগ পুষবেন?
বিচার বিভাগের ন্যায় মানবাধিকার কমিশনও নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বসে বসে আঙ্গুল চুষছে। এদের কেহই পুলিশ কর্তৃক সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের দায় এড়াতে পারবেনা। অপরাধীদের অবশ্যই সাজা দিতে হবে; তবে তা বিচারের আওতায়। অথচ সম্প্রতি সব হত্যাকান্ডই বিচারবহির্ভুত হয়েছে। কেন এমন হয়েছে?

বিচার বিভাগে আইন চর্চা বাদ দিয়ে ইতিহাস চর্চা শুরু হয়েছে। তারা বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুস্পষ্ট মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব বিকৃত করে নতুন ইতিহাস সৃস্টি করেছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালিকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেছিলেন। তার সময়ে দেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল না। তিনি দেশবাসীকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারে বিভক্ত করেননি। যুদ্ধনীতি অনুসারে তিনি মাত্র ৬৭৬ বীরকে খেতাব দিয়ে বাকী সবাইকে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেছিলেন। এ নীতিতে তিনি যে কাউকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিতে কুন্ঠা করেননি। এমনকি ১৯ শে ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে নৃশংশ হত্যাকান্ডের জন্য বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও তার বাহিনী দেশের প্রথম মানবতা বিরোধী অপরাধী হিসেবে পরোয়ানাভুক্ত ও ফেরারী হলেও বঙ্গবন্ধু তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও খেতাব দিয়েছেন।

স্বাধীনতার পর ধ্বজাধারী মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে বঙ্গবন্ধু তাদেরকে অস্ত্র জমা দিয়ে সরকারি চাকুরিতে যোগদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে চাকুরিতে যোগদান করেছিল। এভাবে দেশে দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার আবির্ভাব হয়েছিল। আজও তাদের সন্তান-সন্তুত্তিরা মুক্তিযোদ্ধা কোটা সুবিধা ভোগ করছে। বাংলাদেশের আইনবিমূখ আদালত কোন আইনে এ অবৈধ মুক্তিযোদ্ধা কোটা সম্মতি দিয়েছে?

একইভাবে, বঙ্গবন্ধু তিরানব্বই হাজার ঘাতক পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের বিচারের উদ্দেশ্যে দালাল আইনে বিচার শুরু করেছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, যুদ্ধবিধ্বস্থ সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি স্বীয় পিতামাতা, সন্তান-সন্ততি ও জামাতা ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার ন্যায় সকলেই অসহায় ছিল। তারা শুধু আত্মরক্ষার্থে পাকিস্তান বাহিনীর বাধ্যানুগত ছিল। বাংলাদেশের কোনো নাগরিকই স্বেচ্ছায় যুদ্ধাপরাধ বা মানবতা বিরোধী অপরাধ করেনি। এ বিশ্বাসে বঙ্গবন্ধু ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার ‘সিমলা চুক্তির’ পর নিজেই দালাল আইনে পরিচালিত বিচার প্রক্রিয়া বাতিল করেন। উক্ত বিচারের সামান্য কাগজও তিনি অবশিষ্ট রাখেননি। তিনি কথিত দালালদেরকেও মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেছিলেন।

এতে তৎকালিন সন্ত্রাসী বামগোষ্ঠি বঙ্গবন্ধুর প্রতি রুষ্ট হন। তারা তাকে হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। প্রচলিত বিচার বিভাগ মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা সম্পর্কে ‘বঙ্গবন্ধুর মহাতত্ত্ব’ বিবর্জন করে পাকিস্তানি অপরাধীদের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশের যুদ্ধবিধ্বস্থ নাগরিকদেরকে অভিযুক্ত করেছে। দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ত্রিশ লাখ শহীদকে রাজাকার সাব্যস্ত করেছে। মাত্র একচল্লিশ বীরাঙ্গনাকে স্বীকৃতি দিয়ে দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনদেরকে পাকবাহিনীর প্রেমিকা করেছে। এভাবে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ আইন চর্চা বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে উপযাচক ভূমিকা পালন করেছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর তাদের কর্তৃত্ব হারিয়েছে। তাই আদালতের ‘নো এ্যারেষ্ট, নো হ্যারেজ’ নির্দেশনাসহ জামিনের পরও মুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশ নির্দ্বিধায় জেলগেটে আটক করে গুম করছে। এ দায় কি বিচার বিভাগের ওপর পড়ে না?

পৃথিবীর কোথাও মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ আলাদা নয়। যিনি শহীদ তিনিও যোদ্ধা। শহীদের চেয়ে যোদ্ধা সংখ্যা কখনো কম হয়না। বাংলাদেশেও ত্রিশ লাখ শহীদের বিপরীতে মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটা মোটেও বৈধ নয়। এতে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি থেকে বি ত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের পরিবর্তে যুদ্ধবিধ্বস্থ অসহায় বাংলাদেশী নাগরিকেরা অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত হয়েছে। আদালত কর্তৃক এ সকল মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাস চর্চাই পুলিশের কাছে তাদের ব্যর্থতার প্রধান কারণ। ফয়জুল্লাহ ফাহিমের মতো মেধাবী যুবক এ ব্যর্থতার নগ্ন শিকার। আদালত কিভাবে এ দায় এড়াবে?

লেখকঃ সিরাজী এম আর মোস্তাক, এ্যাডভোকেট, ঢাকা।
(ইহা লেখকের একান্ত ব্যক্তি গতমত, প্রকাশক বা সম্পাদক দায়ী নহে)

Related posts