September 25, 2018

ফারাক্কা আলোচনা সভাঃ বাংলাদেশ-ভারতের পানি সমাধানে কার্যকরী উদ্যোগের আহ্বান

হাকিকুল ইসলাম খোকন
নিউইয়র্ক প্রতিনিধিঃ   
ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস স্মরণে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি (আইএফসি) নিউইয়র্ক আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বাংলাদেশের সাথে ভারতের পানি সমস্যার সমাধানের জন্য কার্যকরী উদ্যোগের জন্য দুই দেশের সরকারের প্রতি জোড়ালো আহ্বান জানিয়ে বলেছেন- আমরা মিঠা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। বছরের পর বছর ধরে শুধুই সমাধানের কথাই শুনে যাচ্ছি কিন্তু কোন সমাধান আজো হয়নি। বক্তারা বলেন, উজানে ভারত কর্তৃক একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের নদ-নদী আজ পানি শুন্য হতে চলেছে, পদ্মা-তিস্তা শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে চীন কর্তৃক ব্রক্ষপুত্রের উজানে বাঁধ নির্মাণে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে ভারত সোচ্চার হওয়ায় ভাটির সর্বনিম্মে অবস্থিত বাংলাদেশের কয়েক দশকের কষ্টের কথা স্বীকৃত হয়েছে। সভায় দেশের নদী ও পানি সমস্যার সমাধানে দল-মত নির্বিশেষে সকলকে ঐক্য হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের পানি বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সদস্য মনোনীত হওয়ায় জাতিসংঘকে সাধুবাদ ও তাঁকে (প্রধানমন্ত্রী) অভিনন্দন জানিয়ে বলা হয়, বিশ্বের দশজন রাষ্ট্র নায়কদের নিয়ে গঠিত এই কমিটির সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের পানি সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ পেলেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের নদী-পানির সমস্যা সমাধানে দেশের বাইরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান দারুনভাবে সহায়ক হবে। ফারাক্কা কমিটি মনে করে দেশকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রীর এই সুযোগ কাজে লাগানো জরুরী। খবর ইউএনএ’র।

‘উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদ এবং বাংলাদেশের নদী-পানির ন্যায্য অধিকার’ দাবীতে ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবসে ১৬ মে সোমবার বিকেলে সিটির জ্যাকসন হাইটস্থ পপুলার ড্রাইভিং স্কুল মিলনায়তনে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। উল্লেখ্য, ৪০ বছর আগে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ‘মরণ ফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ’ অভিমুখে হাজার হাজার মানুষের লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে এই দিন বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের বজ্রকন্ঠ ভারতের তৎকালীন কংগ্রেসী শাসকমহলেও কাঁপন ধরিয়ে দেয়। যার রেশ উপমহাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পৌঁছে যায়। ১৯৭৬ সালের লং মার্চের মূল লক্ষ্য ছিল ফারাক্কা বাঁধ। কিন্তু পদ্মাসহ দেশের সকল অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে সমস্যা আজো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তিস্তা নিয়ে চুক্তির নামে দীর্ঘমেয়াদী লুকোচুরি খেলা চলছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারত তার একতরফা নীতির আওতায় গঙ্গা তথা পদ্মায় যে অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে সেই বাঁধ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য আজ মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। দেশ ও প্রবাসের জনগণের প্রত্যাশা ভারত সরকার সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি পানি সমস্যার সমাধানেও এগিয়ে আসবে।

আইএফসি, নিউইয়র্ক-এর চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান ইউসুফজাই’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন  সাপ্তাহিক আজকাল সম্পাদক মনজুর আহমেদ। অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন বসাংবাদিক-কলামিস্ট মঈনুদ্দীন নাসের,  কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট আলী ইমাম শিকদার, লেখক  জয়নাল আবেদীন, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সহ সভাপতি কাজী আজহারুল হক মিলন, সহ সভাপতি ফারুক হোসেন মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহীম হাওলাদার,  কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম, সরোয়ার খান বাবু প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের সহ সভাপতি অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন।

সভায় বক্তারা বলেন, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ফারাক্কা লং মার্চ-এর ৪০তম বার্ষিকীতে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ কওে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জীব-জীবিকার প্রয়োজনে মওলানার লং মার্চ যে কত গুরুপূর্ণ ছিলো তা আজ দেশের মানুষ গুরুত্বের সাথে উপলব্ধি করছে। নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে নদী সৃষ্ট বাংলাদেশ বাঁচবে না। এই সহজ কথাটি ভারতের সাধারণ মানুষ যতটুকু বুঝেন, বাংলাদেশের মানুষ ততটা বুঝেন না বা জানেন না। কারণ নদী পানি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সকল উপাত্ত জনসমুক্ষে না এনে বিগত ৪৩ বছর যৌথ নদী কমিশনে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ভারতে পানি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়, বাংলাদেশে তা হয় না। কাজেই পানির কমতি হলে কি হতে পারে তা সরাসরি ভুক্তভোগীরা ছাড়া তা আর কেউ বুঝেন না। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই এক্ষনি সোচ্চার হয়ে বলতে হবে, আন্ত নদী সংযোগের মাধ্যমে নদীর পানি সরিয়ে নিলে নদী মাতৃক বাংলাদেশ নদী হারা হবে। নদী সৃষ্ট পৃথিবীর বড় ব-দ্বীপ তার স্বাভাবিক গড়ন-গতিশীলতা হারিয়ে সাগর ভঙ্গনের শিকার হবে।

অন্যদিকে ভাটিতে নদীগুলো মরে গেলে উজানেরগুলো মরে বিরান হয়ে যাবে। কারণ প্লাবন ভূমির স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রবাহ থেকে সড়িয়ে উষ্ণ এলাকা দিয়ে প্রবাহিত করলে শুষ্ক মাটি সম্পন্ন পানি চুষে নেবে। তখন এই ভূ-ভাগের পানি চক্র ধ্বংস হবে। গঙ্গা-ব্রক্ষপুত্র অববাহিকাসহ তখন পুরো হিমালয় অঞ্চলে নেমে আসবে পরিবেশনগত মহাবিপর্যয়। বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়ন বিমুখ নয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে নদীর পানিতে হাত দেয়া যাবে না- একথা কেউ বলছে না। বক্তারা বলেন, নদীর সার্ভিস পেতে হলে নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কোথায় কতটুকু পানি দরকার, তা নির্ধারণে আগে ঠিক করে নিতে হবে নদী নিজে বেঁচে থাকার জন্য তার বুকে কতটুকু পানি প্রবাহ অবশ্যই থাকত হবে। অর্থাৎ নদীর বেসিন ভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। যা এখন সাড়া পৃথিবীর বেসিন বা অববাহিকা ভিত্তিক সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দরকার অববাহিকার সকল দেশের অংশগ্রহণ এবং সহযোগিতা।

কাজেই গঙ্গা ও ব্রক্ষপুত্রের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার জন্য আজ দরকার অববাহিকার সকল দেশ তথা বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল এবং গণ চীনের মধ্যে যৌথ পানি ব্যবস্থাপনা। এশিয়ায় মেকং নদী কমিশন, ইউরোপের দানিউব নদী কমিশনের আদলে গঙ্গা ও ব্রক্ষপুত্র নদীর বিষয়ে যৌথ কমিশন গঠন জরুরী হয়ে পড়েছে। সমন্বিত পানি ব্যাবস্থাপর মাধ্যমে নদ-নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার অন্য কোন বিকল্প নেই। একমাত্র অংশীদারিত্ব এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমেই তা করা সম্ভব। ভাটির সর্বনিম্নে অবস্থিত বাংলাদেশ এব্যাপারে আজ উদ্যোগী হতে হবে।

সভায় আইএফসি’র অন্যতম উপদেষ্টা, বাংলাদেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক-কলামিস্ট, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং এক সময়ের নায়ক, পরিচালক, প্রযোজক ও ফিল্ম মেকার সাদেক খানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ এবং তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় এক মিনিট নিরবতা পালন সহ বিশেষ দোয়া করা হয়।

সভায় উল্লেখযোগ্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সহ সভাপতি আব্বাসউদ্দিন দুলাল, কাশেম চৌধুরী, সৈয়দ কামরুল ইসলাম, মোহাম্মদ একে আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/২১ মে ২০১৬

Related posts