November 17, 2018

ফাঁসির আগে মেয়েকে লেখা হতভাগ্য বাবার চিঠি

তার ফাঁসির আদেশ হয়ে গেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই ফাঁসি কার্যকর করা হবে। এ সময় মানুষ কি করে জানিনা। কিন্তু হুয়াং উয়েন কুং কারারক্ষীদের কাছে কাগজ চাইলেন। তারপর বসে গেলেন চিঠি লিখতে। নিজের একমাত্র মেয়েকে উদ্দেশ্য করে লিখে চলেছেন চিঠি। অথচ সেই মেয়েকে তিনি চোখেও দেখেননি কোনোদিন। তাইওয়ানের এসব হতভাগ্য মানুষ ও তাদের সময়কে নিয়েই বিবিসি’র প্রতিবেদন ‘Taiwan Kuomintang: Revisiting the White Terror years’।

যেদিন তার ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল, সেই রাতেই পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে পাঁচখানা চিঠি লিখেছিলেন জেলবন্দি হুয়াং উয়েন কুং। এর একটি লেখা হয়েছিল পাঁচ মাসের মেয়েকে লক্ষ্য করে। মেয়ের সঙ্গে হতভাগ্য পিতার এটিই প্রথম ও শেষ যোগাযোগ। চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। শিশু কন্যাকে উদ্দেশ্য করে বাবা লেখেন ‘প্রিয় চুন লান, আমাকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তুমি তোমার মায়ের গর্ভে।’

এরপর উয়েন দুঃখ করে লেখেন,‘বাবা তার সন্তানকে দেখতে পেলেন না। হায়, পৃথিবীতে এর চাইতে বেদনাদায়ক আর কি হতে পারে!’

দীর্ঘ ৫৬ বছর পর পিতার এই চিঠি হাতে পেয়েছিলেন কন্যা হুয়াং চুন লান। এর প্রথম লাইনটি পরেই কেঁদে বুক ভাসিয়েছিলেন হুয়াং লান। এই চিঠি মৃত পিতার সঙ্গে কন্যার অদ্ভূত এক যোগসূত্র গড়ে তুলেছিল। এটি পড়ার পরই তিনি বুঝতে পারেন, তার বাবা তাকে কতটা ভালোবাসতেন।

২০০৮ সালে তাইওয়ান সরকার হুয়াং উয়েন কুংয়ের কন্যার হাতে ওই চিঠিসহ তিনশ কাগজপত্র তুলে দেয়। এতদিন ধরে এসব ডকুমেন্টস সরকারের মহাফেজখানায় পরেছিল।

বাবার ছবি হাতে মেয়ে হুয়াং চুন লান। পাশেই বাঁধিয়ে রাখা আছে সেই বিখ্যাত চিঠিটি

তাইওয়ানে নির্যাতন বা ‘শ্বেত সন্ত্রাস’য়ের যুগে যে ১৭৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, তাদের জিনিসপত্র সংরক্ষিত ছিল ওই মহাফেজখানায়। ওগুলোর বেশিরভাগই ছিল চিঠিপত্র যার বেশিরভাগই পরিবারের কাছে লেখা হয়েছিল। ১৯৪৯ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছিল। এদের মধ্যে কমপক্ষে ১২শ জনকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন কুওমিনতাং দলের নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল দেশের মানুষ। সরকার বিরোধী এই বিক্ষোভটি কঠোর হাতে দমন করেছিল তাইওয়ান সরকার। ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার কারণে ওই যুগ সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। বিক্ষোভের কারণে সে সময় কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি সরকার। বই পুস্তকেও এ সম্পর্কে কোনো ইতহাস তুলে ধরা হয়নি। ঐতিহাসিকরা বলছেন, সে সময়ের বহু প্রমাণ ধ্বংস করা হয়েছে। তখন এ সংক্রান্ত কোনো আইন না থাকায় সরকারি দলিল দস্তাবেজ নষ্ট করায় কোনো বাধা ছিল না। ২০০২ সালে তাইওয়ানের আর্কাইভ অ্যাক্ট প্রণীত হয়। ফলে কয়েদিদের ওই চিঠিগুলো ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়। এখন সময়ও অনেক পাল্টেছে। ফলে মৃত্যুদণ্ডের শিকার ওইসব মানুষদের সম্মানে ২৮ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তাইওয়ানের নতুন প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন। তিনি ওই অন্ধকার যুগের ২২৮টি ঘটনা খতিয়ে দেখারও আশ্বাস দিয়েছেন। তবে বিচারের নামে নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের কোনো বিচার হবে না হওয়ায় হতাশ তাদের পরিবারগুলো।

লান ইউন জোর বাবাকেও ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলান হয়েছিল ১৯৫১ সালে। তিনি দেশের আন্ডাগ্রাউন্ড পত্রিকাগুলোতে সরকারের সমালোচনা করে কলাম লিখতেন। তার বাবাকে আটক করার পর লানের মাকেও কারাগারে ঢুকানো হয়। যদিও লান তখন কেবলই দুধের শিশু এবং সে তখন মায়ের দুধ খেত। মাত্র ছয় মাসের মাথায় লানের বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ সম্পর্কে লান বলেন,‘ ওই খুনী প্রেসিডেন্টের হাতে অনেক কয়েদির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।’ শুধু তিনি নন, সাবেক প্রেসিডেন্ট চিয়াংকে তাইওয়ানের অনেকে ‘খুনী’ হিসেবে দেখে থাকেন। তার পরিবার কম্যুনিস্ট চীন থেকে তাইওয়ানে পালিয়ে এসেছিল। তিনিই তাইওয়ানকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। কম্যুনিস্ট চীনাদের হাত থেকে তিনি দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন এবং তার এই অবদান সম্পর্কে কারো কোনো মতপার্থক্য নেই। কিন্তু বিরোধীদের দমনে তিনি যে বাড়াবাড়ি করেছেন এ নিয়ে সবাই একমত।

হয়ত এইসব ভিন্নমতাবলম্বীদের অনেকেই কম্যুনিস্ট ভাবধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাই বলে তাদের ধ্বংস করে ফেলতে হবে! তারা সবাই যে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন এমন তো নয়। কেউ কেউ তো গণতন্ত্রিক ধ্যান ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং আরো বেশি উদার সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছিলেন। এটাই কি বুঝি তাদের অপরাধ ছিল!

ধরা পড়ার পর কারাগারে বসে অনেকেই নিজের প্রিয়জনদের চিঠি লিখেছেন যদিও সেসব চিঠি কখনোই যে ঠিকানামত পৌঁছাবে না এটা তাদের জানা ছিল। তারপরও তারা লিখতেন। মাকে উদ্দেশ্য করে এক কয়েদি লিখেছিলেন,‘মা, আমার সঙ্গে এরা কি করবে, আমার তা জানা নেই। আমার কেবল একটাই চাওয়া, আমার যা হয় হউক, তুমি কষ্ট পেও না। আমি চাই তুমি সারাজীবন সুখে থাক এবং আমাকে নিয়ে গর্ব কর। আমি তো এই সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যেয়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে চলেছি।’

ফাঁসির আগে আট মাসের মেয়েকে লেখা হুয়াংয়ের সেই চিঠি

হুয়াংয়ের বাবা তার মাকে উদ্দেশ্য করে যে চিঠি লিখেছিলেন সেখানে তিনি তাকে পুনরায় বিয়ে করার কথা বলেছেন। যদিও চিঠিটি অনেক দেরিতে তাদের হাতে এসেছিল। ততদিনে তার মায়ের স্মৃতিভ্রষ্ট হয়েছে। তাই এ চিঠি তার মনে কোনো আবেগ অনুভূতি জাগাতে পারেনি। এ সম্পর্কে হুয়াং বলেন,‘আমরা যখন চিঠিটি হাতে পাই ততদিনে মা ডিমেনসিয়া (স্মৃতিহীনতা) রোগে ভুগতে শুরু করেছেন। তাই স্বামী কি লিখেছে তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যাথা ছিল না।’

তবে মায়ের কাছে লেখা ওই চিঠি পড়ে ভীষণভাবে তাড়িত হয়েছিলেন হুয়াং। তাই তিনি চান সেই কলুষিত ইতিহাস উদঘাটিত হউক এবং এর সঙ্গে জড়িতরা বিচারের আওতায় আসুক। তা সে যেই হউক না কেন! ## বামে

Related posts