September 21, 2018

প্রশাসন পুলিশ র‌্যাব নত ছিল নূর হোসেনের কাছে

নূর হোসেন

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার অন্যতম প্রধান আসামি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনের আর্থিক আধিপত্যের কাছে নত ছিল জেলার তৎকালীন সিভিল প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও র‌্যাব-১১ এর কতিপয় কর্মকর্তা। নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের সঙ্গে আধিপত্য, রাজনৈতিক প্রভাব সর্বোপরি আর্থিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে পূর্ব শত্রুতার জেরেই র‌্যাব-১১ এর কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাকে খুনের মিশন বাস্তবায়ন করে নূর। তবে সাতজন অপহৃত হওয়ার পরও নূরের সঙ্গে সখ্য থাকার কারণে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের নীরবতা ছিল স্পষ্ট। অপহরণের ঘটনায় নূরের সম্পৃক্ততা উল্লেখ করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি হওয়ার পরও তাকে গ্রেফতারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ। সর্বোপরি চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার সাক্ষ্য, তথ্যপ্রমাণ পরীক্ষা ও পর‌্যালোচনান্তে র‌্যাব সদর দফতর জড়িত থাকার গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে হাইকোর্টে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় সাত সদস্যের ওই তদন্ত কমিটি নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমানে সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের সচিব ও সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহাজাহান আলী মোল্লা। ১৩৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে ২৪২ পৃষ্ঠার ১৯টি সংযুক্তির মধ্যে হাইকোর্টের সুয়োমুটো রুলে কপি, সাক্ষ্য গ্রহণের নোটিস, বিজ্ঞপ্তি, সাক্ষ্য, কলকাতায় গিয়ে নূর হোসেনের সাক্ষ্য নেওয়ার অনুমতি চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পাঠানো অনুমতিপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এ প্রতিবেদন তৈরি করতে ৩৭১ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, উপযুক্ত মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্যসহ পারিপার্শ্বিক অবস্থা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর‌্যালোচনা করে দেখা যায় যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের সঙ্গে অপর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনের বিরোধের জের ধরে নূর হোসেন কাউন্সিলর নজরুলকে ঘায়েল করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে সুযোগ খুঁজছিল। আর্থিক আধিপত্যের কারণে নূর র‌্যাব-১১ এর তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফসহ পুলিশের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মতিন, নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামের সঙ্গে সখ্য থাকায় ওই সুযোগটি কাজে লাগায়। সাক্ষী নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটি, ভাই আবদুস সালাম ও শ্বশুর শহীদুল ইসলামের বক্তব্য একসঙ্গে পর‌্যালোচনায় দেখা যায় তারা ঘটনার পরপরই নজরুলকে জীবিত উদ্ধারের জন্য পুলিশ সুপার ও ফতুল্লা থানার ওসির কাছে বারবার ছুটে গেছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী তাদের উদ্ধারে দৃশ্যমান ও বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে অপহরণের পরপরই তা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ায় চলে আসে। জেলা পুলিশ সুপারসহ পুলিশের অন্যান্য সদস্যরা এ বিষয়ে প্রথম থেকেই র‌্যাব এবং নেপথ্যে নূর হোসেনের প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় ভূমিকা সন্দেহ করে আসছিলেন। র‌্যাব-১১ এর সিও, মেজর আরিফ ও লে. কমান্ডার মাসুদ রানার বক্তব্য একত্রে পর‌্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা দাবি করেছিলেন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে র‌্যাব সদর দফতর প্রথম থেকেই অবহিত ছিল এবং র‌্যাবের এডিজি অপস কর্নেল জিয়াউল আহ্সানের নির্দেশে এ অপহরণ, হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটানো হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন তারেক সাঈদ। এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের এডিজি কর্নেল জিয়াউল আহ্সান র‌্যাবের সাবেক ডিজি মোখলেসুর রহমানের দেওয়া বক্তব্য ও জিয়াউল আহ্সানের উপস্থাপিত বিভিন্ন তথ্য, অডিও ও ভিডিওর বক্তব্য এবং এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পরীক্ষা ও পর‌্যালোচনান্তে প্রতীয়মান হয় যে, এ নৃশংস ও অমানবিক ঘটনার সঙ্গে র‌্যাব সদর দফতর জড়িত থাকার গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। বরং অপহরণের ঘটনাটি র‌্যাব-১১ এর সিও তারেক সাঈদ তাৎক্ষণিকভাবে ও অপহরণের বিষয়ে ঘটনার দিন বিভিন্ন সময়ে জিজ্ঞাসা করা হলে অস্বীকার করেন। তারেক সাঈদ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়ার কারণে র‌্যাব সদর দফতর সাতজন অপহরণের বিষয়ে সঠিক তথ্য পায়নি মর্মে প্রতীয়মান হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সাতজনকে অপহরণ ও লাশ গুমের বিষয়ে র‌্যাব-১১ এ তৎকালীন কর্মরত এএসপি মেহেদী শাহ্রিয়ারের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। তিনি সাতজনকে অপহরণের সময় র‌্যাব ফোর্সদের ও টহল দলের কার্যক্রম সমন্বয় করেন এবং অপহরণের পর অ্যাডভোকেট চন্দন কুমারের পরিত্যক্ত গাড়ি নিকেতনে ফেলে আসার জন্য ড্রাইভার দিয়ে লে. কমান্ডার মাসুদ রানাকে সাহায্য করেন মর্মে তার সাক্ষ্যে স্বীকার করেন। লাশ গুমের জন্য তিনি বাজার থেকে বস্তা ও রশি খরিদ করান, বস্তায় ইট ভরে সেলাই করার ব্যবস্থা করেন এবং মাইক্রোবাসে করে ইটের বস্তা, রশি ও র‌্যাবের অন্যান্য সদস্যদের নিয়োজিত করেন। পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্নের জন্য নির্দেশ দিলে তারা ইটের বস্তা, রশি ইত্যাদি কাঁচপুর ব্রিজের নিচে বিআইডব্লিউটিএর পরিত্যক্ত ল্যান্ডিং স্টেশনের নির্দেশ মোতাবেক পৌঁছে দেন, এ সমস্ত বিষয় তার সাক্ষ্য, ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে গ্রেফতার হওয়া র‌্যাব সদস্যদের সাক্ষ্য এবং এ ঘটনার বিষয়ে র‌্যাব সদরদফতর থেকে পাঠানো লিখিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়।
প্রতিবেদনের একটি অংশে উল্লেখ রয়েছে, কর্নেল জিয়াউল আহ্সান ও গ্রেফতারকৃত তারেক সাঈদের বক্তব্য পর‌্যালোচনা করে দেখা যায়, মেজর আরিফ ঢাকার মোহাম্মদপুরে কনকর্ড টাওয়ারে ফ্ল্যাট কিনেছেন এবং নূর হোসেনের মাধ্যমে কিস্তির ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। নূর হোসেন বাহিনীর অন্যতম সদস্য আলী মোহাম্মদ (পি ডব্লিউ ৩৫৪) তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, এপ্রিল মাসের ৪ তারিখ নূর হোসেনের স্ত্রীর কাছে তিনি শুনেছেন, নূর হোসেন ফোন করেছে তাই মেজর আরিফকে শাহজাহানের মাধ্যমে দুই কোটি টাকা দিয়েছেন। নূর হোসেনের বাড়ি থেকে ওইদিন তিনি শাহজাহানকে বড় একটি ব্যাগ নিয়ে নিচে নামতে দেখেন। নূরের বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখেন, রাস্তার পাশে দাঁড়ানো মেজর আরিফের গাড়িতে শাহজাহান ভারী বস্তা নিয়ে ওঠেন। নূরের অন্যতম আরেক সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিলের (পি ডব্লিউ ৩৫০) বক্তব্যেও নূরের সঙ্গে মেজর আরিফের বিশেষ সম্পর্কের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। স্যুয়োমোটো রুল নং-১৮৪০৩/২০১৪ ও ০৫/০৫/২০১৪ ও ০৫/০৫/২০১৪ তারিখের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে ঘটনার বিষয়ে গণতদন্তক্রমে উপযুক্ত সাক্ষ্য পর‌্যালোচনায় দেখা যায়, নূর হোসেনের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় এবং এ ঘটনা ঘটানোর আগ থেকে নূর কর্তৃক মেজর আরিফকে টাকা দেওয়া, র‌্যাব-১১ এর তৎকালীন সিও তারেক সাঈদ মোহাম্মদের নির্দেশ ও মনিটরিংয়ে, মেজর আরিফের নির্দেশে ও প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণে, অপহরণকালে লে. কমান্ডার মাসুদ রানার ঘটনাস্থলে উপস্থিতিতে ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় এবং এএসপি মেহেদী শাহরিয়ার কর্তৃক এ অপহরণ ঘটনা ফোর্সেস ও টহল দলের কাজের সমন্বয়, হত্যা ও লাশ গুমের জন্য যানবাহন, ড্রাইভার, ইটের বস্তা, রশি সরবরাহ করে। র‌্যাব-১১ এর সংশ্লিষ্ট সদস্যরা ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুলকে হত্যার উদ্দেশ্যে সাতজনকে বিনা বাধায় ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল অপহরণ করে তাদের নৃশংসভাবে হত্যা ও তাদের লাশ গুম করেন। হত্যাকারীদের এ কমিটির কাছে দেওয়া বক্তব্যে তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
হাইকোর্ট বিভাগের অপর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কমিটি তদন্ত করে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম ও অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাসহ তৎকালীন জেলা প্রশাসক মনোজকান্তি বড়ালের (পি ডব্লিউ ৩২৪) প্রদত্ত সাক্ষ্যসহ পারিপার্শ্বিক ও সামগ্রিক অবস্থা পর‌্যালোচনায় এ কমিটি সম্যকভাবে অবহিত হয় যে, অপহরণ ঘটনার বিষয়টি ঘটানোর পরপরই পুলিশ সুপারসহ সিভিল প্রশাসন অবহিত হয়। তাদের ধারণা ছিল নূর হোসেনের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় র‌্যাব-১১ এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সদস্যদের দ্বারা এ অপহরণের ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। তবে অপহরণের পর থেকে লাশ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত জেলা পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসক মনোজকান্তি বড়ালের দৃশ্যমান কোনো কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়নি। ঘটনার দিন ২৭ এপ্রিল দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে ফতুল্লা থানার ওসি আকতার হোসেন কর্তৃক সাধারণ ডায়েরিতে অপহরণের বিষয়ে নূর হোসেনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও নূর হোসেনকে গ্রেফতারের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এটা পুলিশ বাহিনীর ও জেলা প্রশাসনের ব্যর্থতা। ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত নূর হোসেন দেশেই অবস্থান করেছিলেন বলে গ্রেফতার হওয়া আলী মোহাম্মদ ও চার্চিলের বক্তব্য পর‌্যালোচনা করে জানা যায়। ২৮ এপ্রিল রাত পর্যন্ত নূর তার শিমরাইলের বাসভবন এবং অফিসে দলবল নিয়ে অবস্থান করছিলেন।
প্রতিবেদনের একটি অংশে মতামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এ অপহরণ ঘটনাটি জানার পরপরই নূর হোসেনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হয়তো অপহৃত সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো। এ ছাড়াও প্রতীয়মান হয় যে, নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এ ঘটনা জানার পরে জেলার নির্বাহী হিসেবে এবং আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কমিটির সভাপতি হিসেবে অপহৃত সাতজনকে জীবিত উদ্ধারে তার তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি যদি তৎপর হতেন কিংবা পুলিশ প্রশাসনকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হিসেবে অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারে জোরালোভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলতেন তাহলে হয়তো তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় খানসাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরদিন তাদের লাশ উদ্ধার করা হয় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে।

Related posts