September 21, 2018

সুখবরঃ গ্রীনকার্ড দিবে সৌদি, অনুসরন করবে কি অন্য আরব রাষ্ট্র?

06 Apr, 2016, নাজমুল হোসেন, লন্ডন থেকেঃ গত কয়েকদিন আগে একটি সংবাদে সৌদি প্রবাসীরা খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। সৌদি আরব বসবাসরত প্রবাসীদের ক্ষুদ্র ব্যবসা বা মুদি দোকান বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু ঠিক এমন সময় আজ জানা গেল, নতুন একটি সুখবর।সৌদি উপ প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্লুমবার্গের সঙ্গে সাক্ষাতকারে এই সুখবরটির কথা বলেন।

সুখবরটি কি? 

তাহলো, দেশটিতে কর্মরত বিদেশীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে চলেছে সৌদি সরকার। অনেকটা আমেরিকান গ্রিনকার্ডের মতই হবে সৌদি গ্রিনকার্ড।

তবে কবে নাগাদ এ স্কিম চালু হবে তার বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি, তবে এর উপর আমরা কাজ করছি বলে তিনি জনান। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্লুমবার্গের সাথে সউদির তেল কোম্পানি ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে আলাপের এক ফাকে এই কথা বলেন।তবে আশা করা হচ্ছে, ২০২০ সালের মধ্যে দেশটিতে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ বা গ্রিনকার্ডের এ স্কীম পাবেন  সৌদি প্রবাসীরা।

এতে করে শুধুমাত্র প্রবাসী কর্মজীবীরাই যে উপকৃত হবেন তা নয়, যারা বিনিয়োগ করে ব্যবসা- বাণিজ্য করতে চান বা  ধর্মীয় কারনে বিশেষ করে মক্কা বা মদিনায় অবস্থান করতে চান তাদেরও সর্বপরি সুবিধা হবে।

কেন করবে এটিঃ 

২০২০ সালের মধ্যে সৌদি সরকার তেল ছাড়া অন্য দিক থেকে প্রতি বছর আরো ১০০ বিলিয়ন ডলার আয়ের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ধারণা,  গ্রিনকার্ডের মাধ্যমে প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলার রোজগার করা সম্ভব। আর এ সম্ভাবনার লক্ষ্যেই এমন পরিকল্পনা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সৌদি উপ প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি ব্লুমবার্গের সঙ্গে সাক্ষাতকারে এই কথা বলেন।

গ্রিন কার্ডের আয় ছাড়াও প্রতি বছর এ স্কিমে বিদেশী শ্রমিক আনতে কোম্পানী গুলো থেকে প্রতি বছর ফিস বাবদ আরো  ১০ বিলিয়ন ডলার আয় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তেলের আয়ের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর ও অধিক আয়ের উপায় হিসেবে  তিনি বৃহৎ প্যাকেজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ট্যাক্স আরোপ, ভর্তুকি কমানো, গ্রীন কার্ড স্কিম, ও বিদেশী বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেন।

বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য গ্রীন কার্ড স্কীম খুবই জরুরী বলে ধারনা করা হচ্ছে।

অপেক্ষাকৃত তরুণ এই যুবরাজ তথা বর্তমান সউদি নেতৃত্বের নতুন নতুন পরিবর্তন ও নীতির প্রতিফলনে দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। ইতিমধ্যে, তাঁরা ইরানের সাথে তাদের তিক্ততা থাকলেও ইরানের দীর্ঘ দিনের বন্ধু রাষ্ট্র ও নিজেদের একান্ত বন্ধু রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাথে সাপে-নেউলে সম্পর্ক থাকা ভারতের সাথেও সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে।সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সৌদি সফর করে গেলেন। তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে অথনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য ভবিষ্যতে ভারত, চীনে তাদের তেল বাজারজাত করতে চায় বলে  ব্লুমবার্গের এই সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন। আর এদিকে সৌদি আরবের সাথে মার্কিনীদের রয়েছে দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু চীন- মার্কিন সম্পর্ক তিক্ত হলেও সৌদি তার সম্পর্কের হাত চীনের দিকে প্রসারিত করতে চাচ্ছে। তাদের এসব যুগান্তকারী ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকেও বুঝা যায় যে, পুরোন নীতির বদলে অভিবাসীদের বসবাসেও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে তাঁরা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।তারই ধারাবাহিকতায় প্রবাসীদের জন্য স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য গ্রীন কার্ডের চিন্তা ভাবনা।

প্রবাসীদের প্রতিক্রিয়াঃ 

এদিকে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের এই ঘোষণা প্রবাসীদের আশার আলো জাগিয়েছে, তাঁরা খুবই খুশী হলেও, কারো কারো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। তবে এই স্কীম সম্পর্কে আরো জানতে বা পরিষ্কার হতে উদ্গ্রীব হয়ে আছে।

জেদ্দায় অবস্থানরত সফিক আরমান জানান,’ আমি আসলে কোন ভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না যে এ দেশ এ রকম একটি স্কীম আনবে প্রবাসীদের জন্য।’

মক্কায় অবস্থানরত একজন চিকিৎসক এর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এটা আমাদের জন্য খুবই খুশির খবর, কারন আমরা সারা জীবন এখানে সেবা দিচ্ছি ও  তাদের উন্নয়নে কাজ করছি, আর আমাদের যখন আর প্রয়োজন নাই তখন ছুড়ে ফেলার মতো অবস্থা। কয়েকদিন আগে আমার এক সহকর্মী ৩০ বছর এ দেশে চাকুরী করে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পায়নি। যদি সৌদি সরকার এ সুযোগ দেয়, তা হবে একটি যুগান্তকারী ঘটনা আমাদের সবার জন্য।

উল্লেখ্য, বাকালা বা ক্ষুদ্র ব্যবসা (বাকালা) বন্ধ করার জন্য সৌদি আরবের সুরা কমিটির এক সদস্যের সুপারিশের পর সে দেশে প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম হতাশা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে যারা সৌদি আরবের যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে তারা যুক্তি দিয়ে বলছেন, এর ফলে সৌদি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই ইস্যু নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সাথে কথা বলে আরব নিউজ।

আসলেই কি নির্ভরযোগ্য তথ্যঃ 

এ সংবাদ প্রকাশের পর অনেকেই আমদের সাথে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছে আসলেই কি এ ঘোষণা দিয়েছে ? কতখানি নির্ভরযোগ্য সংবাদ ?এ প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে গত ৪ এপ্রিল, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬ টা ৪৯ মিনিটে ‘Biggest Ever Saudi Overhaul Targets $100 Billion of Revenue’ শিরোনামের  ‘Interview: Saudi Arabia’s Deputy Crown Prince Outlines Plans’ উপশিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপায়, তাতে ‘Saudi Green Cards’ অংশে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে।

এদিকে, আজ আরব নিউজ জেদ্দা থেকে ”Bloomberg: Saudi post-oil plan aims for long-term prosperity” শিরোনামে এ সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে একটি ফিচার প্রকাশ করেছে। যাতে বলা হয়েছে, “So Prince Mohammed also proposes finding other ways to raise money, with plans to generate $100 billion per year in additional non-oil revenue by 2020. Measures range from cutting the cost of subsidies for household bills, taxes on consumers and a Green Card-style program for expatriates,” the report stated.

আর গতকাল আরব আমিরাতের গালফ নিউজ ‘Saudi Arabia mulls permanent residency for expats’ শিরোনামে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।তবে এ প্রতিবেদনে কিছুটা উস্মা প্রকাশ করা হয়েছে।

কেমন হয় আমেরিকান গ্রীন কার্ডঃ

আমেরিকায় থাকার ও কাজের অনুমতির জন্য যে কার্ড দেয়া হয় তাকে সাধারণত গ্রীন কার্ড ( Green Card ) বা যাকে আবার পারমানেন্ট রেসিডেন্সী বা পি আর বলা হয়। এ কার্ডের রঙ সবুজ বিদায় একে ‘গ্রীন কার্ড’ বলা হয়। পরবর্তীতে স্থায়ী ইমিগ্রেশন এর পথে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এটি।কারন, সাধারণত একবারেই সিটিজেনশিপ দেয়া হয় না।

গ্রীন কার্ড বা পি আর বিভিন্ন মেয়াদের রয়েছে (একটিই সারা জীবন থাকার অনুমতি নয়)।এর মেয়াদকাল সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং এরপর পুনঃনবায়ন করা যায়।এ সময় কোন গুরুতর অপরাধ করলে গ্রীন কার্ড বাতিল করতে পারে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ।

চাকুরীদাতা স্পন্সর হয়ে (Sponsor)  সাধারণত এ জন্য আবেদন করতে হয়।

এ কার্ডের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ক্রমান্বয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের ও কাজ করার অনুমতি পাওয়া যায়।সাধারণত, গ্রিন কার্ড নিয়ে পাঁচ বছর [5 years] থাকার পর  ইউ এস সিটিজেনশিপ এর জন্য আবেদন করতে পারা যায়।

 অন্যান্য আরব দেশেও প্রভাবঃ

এ সংবাদে অন্যান্য আরব দেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশীদের মধ্যেও তোলপাড় শুরু হয়েছে।অনেকে এখন চিন্তা করছে, তাহলে আরব দেশগুলোর মধ্যে সউদীই হবে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক বসবাস ও কাজ কর্মের জন্য। আবার গ্রীন কার্ড পেলে সহজে পারিবারিক ভিসা নিয়ে সবাই একসাথে থাকা যায়।  বর্তমানে একদিকে যেমন পারিবারিক ভিসা অত্যন্ত কঠিন অন্যদিকে পারিবারিক ভিসা নিয়ে কাজের অনুমতিও থাকে না বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে।গ্রীন কার্ডের মাধ্যমে পরিবারকে আনলে যেহেতু পরিবারের অন্যজনও কাজ করতে পারবে, সন্তানসহ স্বচ্ছলভাবে বিদেশে অবস্থান করা যাবে।

এ প্রসঙ্গে আবুধাবীতে হাসপাতালে কর্মরত আউয়াল সরকার জানান,  তিনি নিজেও ভাবছেন সুযোগ পেলে তিনি মক্কা বা মদিনায় চলে যাবেন, কাজকর্মের পাশাপাশি ধর্মকর্মেরও সুবিধা হবে।

এছাড়াও, ধারনা করা যায়, সৌদি সরকার যদি এ ধরনের গ্রীন কার্ডের প্রবর্তন করে তাহলে অন্যান্য আরব দেশেও বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এ ব্যাপারে ভাববে।কারন, এতদিন পুরো আরব বিশ্বেই গ্রীন কার্ড বা স্থায়ীভাবে বসবাসের কোন সুযোগ ছিল না। বন্ধুপ্রতিম সউদীকে অনেক ক্ষেত্রেই অন্যান্য আরব রাষ্ট্র অনুসরন করে। স্বাভাবিকভাবে সউদির পর অন্য দেশেও এর প্রবর্তন হবে বলে প্রবাসীদের দৃঢ় আশাবাদ।         

উল্লেখ্য, সৌদিতে বর্তমানে ৯০ লাখ বিদেশী শ্রমিকের মধ্যে ১২ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক। যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি।এ স্কিম চালু হলে সবাই কম বেশী উপকৃত হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।এদিকে বাংলাদেশ থেকে আরো জনশক্তি রফতানি বাড়াতে বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।তবে সরকার ও প্রবাসীদের সজাগ থাকতে হবে এ স্কীমের কথা বলে কুচক্রী মহল যাতে বিদেশে অবস্থানরত সরলপ্রান প্রবাসী বা দেশ থেকে যেতে ইচ্ছুক সর্ব সাধারনের সাথে প্রতারনা করতে না পারে বা অসুবিধায় ফেলতে না পারে।

 

ফলোআপ আরো নিউজ: সৌদি নাগরিকত্ব বা গ্রীন কার্ড নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছেঃ >>http://bangla.theglobalnews24.com/?p=23099

Related posts