November 20, 2018

প্রধান বিচারপতির আকাঙ্খা ও বাস্তবতাঃ এ্যাডঃ তৈমূর


রফিকুল ইসলাম রফিক,নারায়ণগঞ্জঃ মামলা জট কমিয়ে আনতে দেশে সান্ধ্য আদালত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। ০১/৪/২০১৬ ইং তারিখে সাভারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আয়োজিত এক কর্মশালায় তিনি বলেন, “ষোল কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১৬শ জন বিচারক নিতান্তই অপ্রতুল। তারপরও আছে বিচারকক্ষের স্বল্পতা। ১৭৩ জন বিচারককে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতে হয়, যে কারণে মামলা জটে আটকে রয়েছে ত্রিশ লাখ মামলা। এই মামলা নিষ্পত্তিতে আইনজীবী ও সরকারের সাড়া পাওয়া গেলে অচিরেই দেশে সান্ধ্য আদালত চালু করা হবে।” প্রধান বিচারপতি আরো বলেন, “দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আর মানবাধিকার রক্ষার জন্য আমাদের সংবিধান পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান। আমরা যে কোনো মূল্যে এই সংবিধানের মর্যাদা রক্ষায় বদ্ধপরিকর। প দশ সংশোধনীর মাধ্যমে আমাদের সংবিধানে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।” সাভারের অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিচারিক কাজের যথাযথ মূল্যায়ন এবং সাফল্য নির্ধারণের মানদন্ড নিরূপন শীর্ষক দুদিনব্যাপী এই কর্মশালার উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এ সব কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের ভাবমুর্তি রক্ষার্থে সচেষ্ট আছেন যা তার কথা বার্তা থেকে অনুমান করা যাচ্ছে। তবে তার গৃহিত পদক্ষেপ বা আকাঙ্খা কতটুকু কার্যকর হবে তা দেখার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বিচার বিভাগকে দোষ ত্রুটির উর্দ্ধে রাখতে চান। অধিকন্তু সুপ্রীম কোর্ট প্রাঙ্গনের আবর্জ্জনা পরিষ্কার করার ফটোশেসনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সাথে বিলবোর্ডে রাস্তার মোড়ে মোড়ে শোভা পাচ্ছে। এ ছবি প্রকাশের সমালোচনা থাকতে পারে; কিন্তু আমি এর বিপক্ষে নই। কারণ বিচারপতিদের রাজনৈতিক নেতার আচরনের মনোভাবাপন্ন করার জন্য এ দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বই দায়ী; কারণ জাতীয় প্রশ্নে রাজনৈতিক নেতৃত্ব একমে  আসতে পারে না। তাছাড়া পৃথিবীর কোন প্রধান বিচারপতির এ ধরণের ছবি বিল বোর্ডে প্রকাশিত হয়েছে কিনা তা আমার জানা নাই। কোন পাঠকের জানা থাকলে, জানার আশায় রইলাম। ছাপানো কজ লিষ্ট প্রকাশ করা হাই কোর্টের দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য। প্রধান বিচারপতি কজ লিষ্ট ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছেন, যুক্তি হিসাবে নাকি দেখানো হয়েছে যে, অর্থনৈতিক সাস্ত্রয়। বিচার বিভাগ কি কোন লাভজনক প্রতিষ্ঠান? এখানে বিচার প্রার্থীদের সুবিধা অসুবিধা দেখতে হবে। লাভ লোকসানের প্রশ্ন এখানে আসবে কেন?  দেশের সকল মানুষইতো ডিজিটাল প্রযু্ক্তিতে অভিজ্ঞ নহে। ডিজিটাল পদ্ধতি যে সম্পূর্ণ নিরাপদ নহে তা সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় রিজার্ভ লুটের মাধ্যমেইতো প্রকাশিত হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমুর্তি রক্ষায় প্রধান বিচারপতি আইনজীবীদের সহযোগীত চেয়েছেন। কজ লিষ্ট ছাপা বন্ধ করায় দল মত নির্বিশেষে সকল আইনজীবী প্রধান বিচারপতির এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আইনজীবীদের প্রতিবাদের মূখে কাগজী কজ লিষ্ট ছাপানোর আদেশ দিতে তিনি সম্মত হয়েছেন।

অবসর গ্রহণের পর রায় লেখা অসংবিধানিক প্রধান বিচারপতির এ মন্তব্যে যুগান্তকারী মাইল ফলক সৃষ্টি হয়েছে। এতে শুধু সকল বিচারপতিদের প্রতি একটি নির্দিষ্ট বার্তা নহে বরং বিচার প্রার্থীদের কষ্ঠের অনেক লাঘব হয়েছে। রায়ে খালাশ পাওয়ার পরও শুধুমাত্র বিলম্বে রায় লিখার কারণে ১২/১৩ মাস অতিরিক্ত জেলখাটার নজির রয়েছে। এখনতো ৬(ছয়) মাস পর্যন্ত রায় লেখার আইনগত বৈধতা তিনি দিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের খবরদারির কথাও বিভিন্ন সময়ে তা বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে। নারায়নগঞ্জের ৭ খুনের বিষয়ে র‌্যবের বিরুদ্ধে হাই কোর্ট তদন্ত নির্দেশ দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী বিভাগের উপর হস্তক্ষেপ মনে করে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। প্রশাসন বিচার বিভাগকে ভালো নজরে দেখে না এ কথাও প্রধান বিচারপতির ভাষণে প্রকাশ পেয়েছে। এমনি ধরনে অনেক বাধা বিúত্তি, আলোচনা ও সমালোচনায়া মাঝ থেকে বিচার বিভাগ থেকে জনগণ নিরপেক্ষ বিচার পাক এটাই হওয়া উচিৎ বিচার বিভাগের সাফল্য।

মামলার জট কমানোর জন্য প্রধান বিচারপতি স্বাক্ষ্যকালীন কোর্ট বসানোর উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছেন। ইতোপূর্বে হাইকোর্টের সার্টিক ব্যার কথাও তিনি বলেছেন। মামলায় জট অবশ্যই একটি জাতীয় সমস্যা। এ সমস্যা যানজট, জলজটের মতোই জনস্বার্থে আশু নিরসনের দাবী রাখে। কেন অধিক মামলার সৃষ্টি হয়ে জটের সৃষ্টি হয়েছে তাহাও প্রধান বিচারপতিকে ভেবে দেখতে হবে।

সরকার দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের জন্য বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে আইন আদালতকে ব্যবহার করছে। দেশব্যাপী বিরোধী দলীয় সকল নেতাকর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে ডজনে ডজনে মামলা হয়েছে। কোথাও কোথাও আসামীর সংখ্যা ২/৩ হাজার এবং ক্ষেত্র বিশেষ আরো বেশী। কেহ ঘটনায় জড়িত থাকুক বা না থাকুক সরকারী দল না করলেই তার বিরুদ্ধে মামলা। নিম্ম আদালত বড় আকারের তদবীর ব্যতীত বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের জামিন দেয় না। বিরোধী দলের জন্য একেবারেই জামিন নিষিদ্ধ। নিম্ম আদালতগুলি পুলিশের দেয়া শেকশন দেখেই সিদ্ধান্ত দেয়। ঘটনার সাথে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা আছে কি নাই তা নিম্মআদালত বিচার বিশ্লেষণ করে না। বিরোধী দলের হলে তো কথাই নাই। কোথাও কোথাও প্রকাশ্য আদালতেই বিচারকগণ তাদের অসাহয়ত্বে কথা বলে থাকে। নিম্ম আদালতে বিচার না পাওয়ার কারণে দেশব্যাপী সকল জেলা থেকে মামলা বন্যার পানির মত ধেয়ে আসে হাই কোর্টের দিকে। হাই কোর্টের বারান্দায় হালে যত বিচারপ্রার্থী দেখা যায় বিগত সময় এতো দেখা যেতো না। এখন মামলা রুজু হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। এক বাস দু’বার পুড়িয়ে আসামীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। মামলার জট কমাতে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দিলে, মামলায় সংখ্যা কমে আসতো। অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি বিরোধী দলকে মিথ্যা মামলা না দেয়ার জন্য প্রধান বিচারপতি সরকারকে কোন পরামর্শ বা নির্দেশনা দিবেন কি?

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, যাত্রাবাড়ীতে বাসে অগ্নি সংযোগে খালেদা জিয়াকে প্রধান আসামী করে চার্জশীট দিলে নিম্ম আদালত অন্যান্য আসামীদের সাথে তার বিরুদ্ধেও গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করে। খালেদা জিয়া তথা বিএনপি রাজনীতি শুন্য করার জন্য সরকারের একটি কৌশল অথচ এ কৌশলের অংশীদারীত্ব নিলজ্জ ভাবে গ্রহণ করছে আইন/আদালত, ইতোপূর্বে এমন নগ্ন আচরন আর দেখা যায় নাই। ০৫/৪/২০১৬ তারিখে মহানগর দায়রা আদালত তাকে জামিন দিয়েছেন তবে অন্যান্য সহ আসামীদের ভাগ্যে কি আছে তা বলা যাচ্ছে না।

আরো উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বিএনপি সরকার আমলে ০৪/৬/২০০৪ ইং তারিখ আওয়ামী লীগ আহুত হরতালের বিআরটিসি ঢাকা মেট্রো-ব-১১-০৭৬৩নং দ্বিতল বাসে অগ্নি সংযোগে ১১ জন যাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় [সূত্রঃ রমনা থানা মামলা নং- ১৬(৬)২০০৪] আওয়ামী লীগ আহুত হরতালে বিগত বিএনপি আমলে বিআরটিসি’র ৫৩টি বাসে অগ্নি সংযোগ করা হয়। এখন প্রশ্ন আসে, খালেদা জিয়া যাত্রাবাড়ীতে যদি বাসে আগুন দিয়ে থাকেন তবে শেরাটন হোটেলের সামনে বিআরটিসি’র দ্বিতল বাসে ০৪/৬/২০০৬ ইং তারিখে অগ্নি সংযোগে ১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করলো কে? মামলা জটের অন্যতম কারণ হিসাবে আইন/আদালতের অব্যবহারকে প্রধান বিচারপতি কোন বিবেচনায় নিবেন?

বাংলাদেশ এখনো ১৮৩৬, ১৮৭২, ১৮৯৮ সালের সেকেলে আইন রয়েছে উল্লেখ করে ০২/৪/২০১৬ ইং তারিখে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, “প্রয়োগ করতে গেলে দেখা যায় এসব আইনের ব্যবহারিক কার্যকারিতা খুব কম। তিনি বলেন, ‘আমাকে একটা বিষয় পীড়া দেয়, যখন দেখি নতুন যেসব আইন বা সংবিধান সংশোধন হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে আইনসভায় আলোচনা হয় না। আইনের উদ্দেশ্য বোঝার জন্য যখন সংসদীয় বিতর্ক নিয়ে আসি, এতে কিছু পাই না।’ আইনপ্রণেতাদের অন্যতম দুর্বলতা হলো আইন বিষয়ে অজ্ঞতা এ কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, “অজ্ঞতা থাকতে পারে, আমারও অজ্ঞতা আছে। কিন্তু এমপিদের মধ্যে লেখাপড়া করা, আইন বোঝার একাগ্রতা কম দেখা যায়। এ জন্য ধীরে ধীরে আইনসভায় আইনের চর্চা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।”

বর্তমান পার্লামেন্ট সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য যথার্থ। তাছাড়া একটি নির্বাচন বিহীন অনির্বাচিত (সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৬৫(২) মোতাবেক) পার্লামেন্ট থেকে এর বেশী কিছু আশা করা যায় কি? এ জন্য বিচার বিভাগের অবদান কম নহে। কারণ তত্বাবধায়ক সরকারের সংবিধানিক ব্যবস্থা বিচারপতি খাইরুল হকের (অবসরে যাওয়ার ১৪ মাস পরে লিখিত) রায়ে বাতিল হওয়ায় একতরফা নির্বাচনের পথ সুগম হয়। অন্যদিকে এ অনির্বাচিত পার্লামেন্টকে বৈধতা দিয়েছে বিচার বিভাগ। অধিকন্তু টাকা ওয়ালারা দেশকে লুটে খাওয়ার জন্য রাজনীতিতে প্রবেশ করে মিডিয়া, পার্লামেন্ট ও রাজনীতি উভয়কে দখল করে ফেলেছে। কারণ জনগণ প্রতারনার শিকার হতে হতে এখন নগদে বিশ্বাসী। ফলে টাকা ওয়ালারা সহজে মাঠ দখল করে ফেলেছে। যার জন্য পারমিট শিকারীর মত নমিনেশন শিকার এখন সহজ ব্যাপার। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ডেডিকেটেট ও কমিটেড কর্মী তৈয়ার করার চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলি মন্ত্রী/এম.পি বানানোর ফ্যক্টরীতে পরিনত হয়েছে। ফলে ১/১১ এর মত দলে যখন ক্রাক ডাউন হয় তখন এ শিকারীদের আর খুজে পাওয়া যায় না। তখন তারা বলে রাজনৈতিক দল করে ভুল করেছি। অভাগা তৃণমূলের সুবিধাবি তরাই তখন দলের হাল ধরে। টাকা ওয়ালারা মিডিয়া, রাজনৈতিক দল ও পার্লামেন্ট দখল করছে বিধায় লেখাপড়া জানা রাজনৈতিকদের মূল্য রাজনৈতিক দলের নিকট দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। টাকা ওয়ালাদের ফটোশেসন মিডিয়াতে যত ফলাও করে প্রচারিত হয়, মাঠ কর্মীদের জান বাজী রাখা কর্মসূচী ততটা প্রচারিত হয় না। ফলে বিদ্যা বুদ্দি চর্চা সম্পন্ন লোকদের জন্য পার্লামেন্টের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ০৪/৪/২০১৬ ইং তারিখে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীপরিষদের সভায় প্রধান বিচারপতির উক্ত বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা হয়েছে। তারপরও প্রধান বিচারপতি যদি তার বক্তব্যে অবিচল থাকতে পারেন তবে এটাই হবে বিচার বিভাগের সাফল্য।

আইন প্রনেতারা নিজেদের রক্ষা স্বার্থকে মাথায় রেখেই আইন প্রনয়ন করে। বিচার বিভাগ গণতন্ত্রের স্বার্থে নয় বরং আইন প্রনেতাদের স্বার্থে কাজ করেছে; ব্যতিক্রম কিছু বিচারপতি ছাড়া, যারা সংখ্যায় নগন্য। যেমন ১৯৭১ ইং সনে ৯ই মার্চ পূর্ব পাকিস্তান হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি বি.এ. সিদ্দিকী মেজর জেনারেল টিক্কা খাঁনকে পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর হিসাবে শপথ বাক্য পাঠ করতে অস্বীকার করেছিলেন। এ ধরনের মনোভাবাপন্ন বিচারপতিরা জনগণের শ্রদ্ধা পাবেন অনন্ত কাল, কারণ তারা হলেন জনগণের বিচারপতি। আইন প্রনেতাদের ধারকের চেয়ে জনগণকে রক্ষা করার বিচার বিভাগই দেশবাসী প্রত্যাশা করে।

লেখকঃ রাজনীতিবিদ ও সাবেক চেয়ারম্যান (বিআরটিসি)

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/১৮ এপ্রিল ২০১৬/রিপন ডেরি

Related posts