November 18, 2018

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া >> আমরা সচিব বানাই’

অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কাঠামো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনির্দিষ্টকালের ‘মর্যাদার’ আন্দোলনের প্রথম দিনেই ‘ক্ষোভ প্রকাশ’ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, ‘সচিবদের মর্যাদা চাইলে বিসিএস দিয়ে সচিব হয়ে গেলেই পারেন’। তবে এ বিষয়ে আন্দোলনরত শিক্ষকদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলেছেন, ‘আমরা সচিব হতে যাব কেন, আমরা সচিব বানাই।’ একইসঙ্গে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

গত বছরের মাঝামাঝিতে অষ্টম বেতন কাঠামো প্রস্তাবের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা নানা কর্মসূচিতে নিজেদের ‘মর্যাদাহানি ও সুবিধা কমে যাওয়ায়’ আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্ব ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অষ্টম বেতন কাঠামোয় ‘অসঙ্গতি’ দূর করতে বেধে দেয়া সময় শেষ হওয়ায় সোমবার থেকে ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছেন। শিক্ষকদের কঠোর কর্মসূচির কারণে ইতোমধ্যে অচল হয়ে পড়েছে সবগুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

আর এ দিনই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার আহবান জানিয়ে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা শিক্ষক, আপনারা সম্মান নিয়ে থাকুন। সমস্যা হলে আমরা দেখব।’

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষকদের মর্যাদা অনেক ওপরে ‘ শিক্ষকদের মর্যাদাহানির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা সচিবদের মর্যাদা চাইলে কিছু বলার নেই। সম্মানটা নিজেদের ওপর নির্ভর করে। সচিবদের মর্যাদা চাইলে বিসিএস দিয়ে সচিব হয়ে গেলেই পারেন।’

এই বক্তব্যকে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বিষয় বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলোর ফোরাম বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা ভালো মনে করেছেন তাই বলেছেন। তবে আমরা আন্দোলন করছি মর্যাদার জন্য। আলাদা বেতনও আমরা চাচ্ছি না। আর সচিবও হতে চাই না।’

‘আর সচিবদের সাথে তুলনার তো কোনো বিষয় এখানে নেই। আমরা প্রতিনিয়তই সচিব বানাই। কেন আমরা সচিব হতে যাব?’ প্রশ্ন রাখেন দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘মর্যাদার’ আন্দোলনের এই নেতা।

এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক চিত্তরঞ্জণ মিশ্র। ‘মর্যাদার’ জন্য আন্দোলনকারী এই শিক্ষক বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে সচিবদের তু্লনা করা হয় না। আমাদের আন্দোলন তো মর্যাদার। এখানে সচিবদের বিষয় কেন আসছে! সেটা মাথায় আসছে না। আর আমরাই বা সচিব হতে যাব কেন? সচিবরা তো আমাদের হাতেই তৈরি হয়।’

ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘কোনো কোটার ভিত্তিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায় না। কিন্তু সচিবদের মধ্যে অনেকেই তো কোটার ভিত্তিতে হয়। আর সেরাদের সেরারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। এখানে তাদের সাথে আমাদের মেলানোর কোনো সুযোগ নেই।’

প্রায় নয় মাস আগে অষ্টম বেতন কাঠামোর প্রস্তাব আসার পর গ্রেডে মর্যাদার অবনমন এবং টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এরপর সরকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দাবি পর্যালোচনায় কমিটি করে। কমিটির সভাপতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত শিক্ষকদের নিয়ে বৈঠকও করেন।

গত ৬ ডিসেম্বর বৈঠকে অর্থমন্ত্রী শিক্ষকদের তিনটি দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ১০ দিন পর বেতন কাঠামোর গেজেটে তার প্রতিফলন ঘটেনি বলে শিক্ষকদের অভিযোগ। এরপর ২ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে লাগাতার কর্মবিরতির ঘোষণা দেন শিক্ষকরা।

ওই প্রতিশ্রুতির বিষয়ে অধ্যাপক ফরিদ বলেন, ‘আসলে শিক্ষকদের মর্যাদাহানির জন্য যারা দায়ী তাদের দিয়েই কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, তারা তো বৈষম্য নিরসনের জন্য কাজ করবে না। আসলে সচিবদের দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য দরকার সরকারের অন্য একটি তদন্ত কমিটি।’ এই বিষয়টি সমর্থন করেন চিত্র রঞ্জণ মিশ্রও। বলেন, ‘সমস্যা তো আমলাই তৈরি করেছেন। তাদের দিয়ে তদন্তে ভালো ফল আশা করা যায় না।’

শিক্ষকদের ক্লাশে ফিরতে প্রধানমন্ত্রীর আহবানের বিষয়ে শিক্ষক নেতা ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আট মাস ধরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমরা ঘুরছি। কিন্তু উনি আমাদের সাথে দেখা করেননি। হয়তো উনি সময় পান নাই দেখা করার। দেখা করার প্রয়োজনও মনে করেননি। তিনি দেখা করলে হয়ত সমস্যা এই পর্যন্ত আসত না। এখনো প্রধানমন্ত্রী আমাদের সাথে বসলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এ দায় কি আপনাদের ওপর বর্তায় না? এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সমর্থক এই শিক্ষক নেতা বলেন, ‘ক্লাশ-পরীক্ষা কিংবা শিক্ষার্থীদের বিষয়ে শিক্ষকরা অনেক দরদী। সেশনজট কমাতে আমরাই অনবরত চেষ্টা করে যাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের দিয়ে তাকিয়ে আমরা অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু আমলারা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে আমাদের আন্দোলন করতে বাধ্য করেছেন।’

আমলারাদের জন্য গাড়ি কিংবা আনুষঙ্গিক যে পরিমাণ ভাতা দেওয়া হয় তার সমপরিমাণ বেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পান না বলে দাবি করেন ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘মূলত’ আমলারাই এই জটলা পাকিয়েছেন। আমরা আমাদের মর্যাদার জায়গায় কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নই। আমাদের আন্দোলন চলবে। এর জন্য কোনো সমস্যা হলে তা মাথা পেতে নিব। বস্তুত, আমরা চাইনি; আন্দোলনের দিকে আমাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে।’

কতিপয় আমলা শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভুল বোঝাচ্ছে অভিযোগ করে চিত্ররঞ্জণ মিশ্র বলেন, ‘অষ্টম বেতন কাঠামো ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষকরা সিলেকশন গ্রেড নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু এর আগে তো এভাবে কথা বলতে হয়নি (সপ্তম বেতন কাঠামো) । কিন্তু এবার কেন কথা বলতে হচ্ছে?’ প্রশ্ন করেন মিশ্র।

‘এবার একটি অদৃশ্য আমলাতান্ত্রিক শক্তি শিক্ষকদের সরকারের মুখোমুখি করছে। সরকারের সাথে শিক্ষকদের দূরত্ব তৈরি করছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষক, তারা মানবসম্পদ গড়ার কারিগর উল্লেখ করে চিত্ররঞ্জণ মিশ্র বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বলেছেন, জ্ঞানের অভাবে শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। এটা কোন ধরনের কথা! ওনার মতো একজন ব্যক্তির শিক্ষকদের সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা উচিত হয়নি।’

বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের প্রধান্য থাকতে পারে না উল্লেখ করে এই সমস্যা সমাধানে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আওয়ামী সমর্থিত এই শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের সাথে বসলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

প্রসঙ্গত, অষ্টম বেতন কাঠামোকে কেন্দ্র করে প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসকরাও কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা গভর্নর আতিউর রহমানের আশ্বাস পেয়ে অষ্টম বেতন কাঠামো নিয়ে তিন দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করেছেন। প্রিয়

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts