November 14, 2018

প্রথমে ছেলেকে পরে মেয়েকে গলা কেটে খুন!

ঢাকাঃ মা তানজীন রহমানের পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি। বলেন, জিন ‘আছর’ করেছে তার ওপর প্রথমে ছেলেকে পরে মেয়েকে গলা কেটে খুন করেন মা রাজধানীর সবুজবাগের উত্তর বাসাবোয় নিহত শিশু ভাই-বোনকে তাদের মা তানজীন রহমান ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে খুন করেন। গতকাল শনিবার ভোররাতে এক প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তিতে তিনি এমনটা জানান। হত্যার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, জিনের আছর পড়েছিল তার উপর। অধিকতর জিজ্ঞাসা-বাদের জন্য তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আর কেউ জড়িত কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহত শিশু দুটির বাবা ওয়াসার কম্পিউটার অপারেটর মাহবুব রহমান বলেন, তানজীন রহমান দীর্ঘদিন ধরে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’। তার চিকিত্সা চলছিল।

গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর উত্তর বাসাবোর ১৫৭/২ নম্বর বাসায় গলাকাটা লাশ পাওয়া যায় মাশরাফি বিন মাহবুব আবরার (৭) ও হুমায়রা বিনতে মাহবুব তাকিয়ার (৫)। এ ঘটনায় মাহবুব রহমান তার স্ত্রী তানজীন রহমানকে আসামি করে সবুজবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনশ্রীর বাসা থেকে অচেতন অবস্থায় দুই ভাই-বোনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। খাবারের বিষক্রিয়ায় দুই ভাই-বোনের মৃত্যু হয়েছে প্রথমে বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্তে বেরিয়ে আসে দুই শিশুকে তার মা-ই হত্যা করে। এর পর গত শুক্রবার ফের মায়ের হাতে শিশু খুনের ঘটনায় বিস্মিত-হতবাক হন দেশবাসী।

মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার আনোয়ার হোসেন বলেন, তানজীন রহমানকে তিনি দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস তানজীন অকপটে তার দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। এমনকি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেয়ার সময়ও তিনি ছিলেন স্বাভাবিক। তবে হত্যার কারণ সম্পর্কে বারবার একই কথা বলেন- ‘আমার উপর জিনের আছর পড়েছিল’

আনোয়ার হোসেন বলেন, তানজীন রহমানের কথাবার্তায় কোথায় যেন ফাঁক রয়েছে। এ কারণেই তাকে আদালতে পাঠিয়ে ৫ দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে। ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে খুনের রহস্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, তানজীনের স্বামী ও স্বজনদের দাবি, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। এ জন্য চিকিত্সাও করা হয়েছিল। তবে এ নিয়ে আমরা চিকিত্সকের সঙ্গে কথা বলবো। হত্যার বর্ণনায় তানজীন রহমান বলেছেন, “ঘটনার সময় বাসায় অন্য কেউ ছিল না। ছেলে আবরারকে বলি, চল আমরা খুন খুন খেলি। এক পর্যায়ে মেয়ে তাকিয়াকে রুমের বাইরে বের করে দেই। এরপর দরজা বন্ধ করে আবরারের গলার পেছনে চাপাতি চালাই। এ সময় সে বলছিল, মা আমিতো ব্যথা পাচ্ছি। আবরারকে হত্যার পর দরজা খুলে তাকিয়াকে রুমের ভেতর এনে তাকেও একই কায়দায় হত্যা করি। পরে বাসার দরজা লাগিয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেই।”

মাহবুব রহমান বলেন, তিনি এশার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। বাসায় ফিরে দেখেন, দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। পরে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে বিছানার ওপর একজনের এবং পাশের রুমে অন্য সন্তানের লাশ দেখতে পান। ওই সময় তানজিনা ঘরে ছিলেন না।

শিশু দুটির ফুফু লাইলা নূর বলেন, গত ৮ মাস ধরে তার ভাই বাসাবোর ওই বাড়িতে ভাড়া থাকছেন। ২০০৮ সালে পারিবারিকভাবে ভাইয়ের সঙ্গে তানজীনের বিয়ে হয়। বিয়ের পরপরই আমরা তার (শিশুদের মা) যে মানসিক সমস্যা রয়েছে, সেটি বুঝতে পারি। এরপর গ্রিন রোডের ডক্টরস চেম্বারে ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আমরা তাকে দেখাই। চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী তাকে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি সবসময় নামাজ রোজা করতেন, কোরআন তেলওয়াত করতেন।

শিশুদের মা কী ধরনের সমস্যায় ভুগছিলেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে লাইলা নূর বলেন, তিনি সাধারণত চুপচাপ থাকতেন, কারও সঙ্গে কোনো কথা বলতেন না। সন্তান বা স্বামীর প্রতি কোনো খেয়াল রাখতেন না। তবে যখন ওষুধ দেওয়া হতো তখন তিনি ভালো থাকতেন। আর যখন ভালো থাকতেন তখন সমস্যা জানতে চাইলে বলতেন, তিনি স্বপ্নে তার দুই সন্তানকে মেরে ফেলেছেন বা তার বাবা মা (শিশুদের নানা-নানী) তাকে মেরে ফেলেছে। অথবা তিনি তার স্বামীকে মেরে ফেলেছেন। এসব স্বপ্ন দেখে তিনি দুঃশ্চিন্তা করতেন। তিনি আরও বলেন, গত ৩ জুন তারা সপরিবারে নারায়ণগঞ্জের আমাদের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি সুস্থ ছিলেন। আমাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে। গত ঈদে তারা সেখানে গিয়েছিল।

লাইলা নূর আরও বলেন, আমার ভাই মাহবুব রহমান শুক্রবার দুপুরে কোরবানির বিষয়ে কথা বলার জন্য আমাকে ফোন দিয়েছিল। আমরা তিন ভাই-বোন সবসময় এক সঙ্গে কোরবানি দিয়ে থাকি। তখন সে বলেছিল তারা সবাই ভালো আছে। এরপর রাত সাড়ে নয়টার দিকে আমার ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান ফোনে জানায়, তাকিয়া ও আবরার আর বেঁচে নেই। তারপর আমি নারায়ণগঞ্জ থেকে এখানে ছুটে আসি। তিনি আরও বলেন, খিলগাঁওয়ের বাগিচা এলাকায় আবরারদের নানার বাড়ি। তাদের নানা বেঁচে নেই। নানি, মামা ও খালারা সেখানে থাকেন। তাদের বাড়িও কুমিল্লার দেবিদ্বারে। আবরার গত এক বছর ধরে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশুনা করতো। মেয়েটাও কিছুদিন আগে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়।

দুই শিশুর ময়না তদন্ত

নিহত দুই শিশুর ময়না তদন্ত গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সম্পন্ন হয়। ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, ধারালো অস্ত্রের আঘাতেই ওই দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যেভাবে তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল, তাতে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।

Related posts