September 24, 2018

প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বিদেশে নারীকর্মী যাওয়ার রেকর্ড

কর্মে নিরাপত্তাহীনতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সমূহ আশঙ্কাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশী নারীদের। তবে প্রতিনিয়ত নানা প্রকার বিপদ, শঙ্কা ও প্রতিকূলতার পথ মাড়িয়েও বিদেশে যাওয়ার হার বেড়েছে তাদের।

মূলত স্বামী পরিত্যক্তা, নানাভাবে নির্যাতনের স্বীকার অসহায় ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের মেয়েরা পাড়ি দিচ্ছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। এক্ষেত্রে সরকারও এগিয়ে এসেছে, গুরুত্ব দিচ্ছে অসহায় ও নানাভাবে নির্যাতিত এ সব নারীদের কর্মসংস্থানের।

চলতি বছরের ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশে নারীকর্মী গেছে এক লাখ ৭১২ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছে ১৯ হাজার ৩৭৬ জন। তবে সবচেয়ে বেশি নারীকর্মী গেছে জর্ডান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আরব আমিরাতে গেছে ২২ হাজার ৮৬৫ জন। এ সময়ে জর্ডানে ১৯ হাজার ৯৩৩ জন ও ওমানে গেছে ১৫ হাজার ৫১৩ জন। এ ছাড়া কাতার, বাহরাইন, লেবানন, হংকংসহ বাকি কর্মী গেছে বিভিন্ন দেশে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ৯৬ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশী রয়েছেন। ১৯৭৬ সাল থেকে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী প্রবাস জীবনযাপন করছেন। যাদের পাঠানো রেমিটেন্সের বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। পুরুষকর্মীর পাশাপাশি ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে নারীকর্মীও বিদেশে যাচ্ছেন। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ৪ লাখ ৪৪ হাজার ১২৭ জন নারী বিভিন্ন দেশে গেছে। যাদের অধিকাংশই গৃহকর্মী।

এখন থেকে ১৬ বছর আগে অর্থাৎ ২০০০ সালে যেখানে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কাজের জন্য গেছে মাত্র ৪৫৪ জন, সেখানে চলতি বছর ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে এক লাখের উপরে ঠেকেছে। গত বছর (২০১৪) বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৬ হাজার নারীকর্মী বিদেশ গেছে। আগের বছর ২০১৩ সালে ৫৬ হাজার এবং এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১২ সালে প্রায় ৩৭ হাজার নারীকর্মী বিদেশে পাঠানো হয়।

১৯৯১ সাল থেকে ২০১৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি নারীকর্মী গেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, জর্ডান, সৌদি আরব ও ওমানে। এ দেশগুলাতে এই ক’বছরে পর্যায়ক্রমে নারীকর্মী গেছেন যথাক্রমে— এক লাখ ১৬ হাজার ১৩৬ জন, ৯৯ হাজার ৭২২ জন, ৮৫ হাজার ৪১৬ জন, ৪৭ হাজার ২১০ ও ৪১ হাজার ৩৯ জন। এ ছাড়া কুয়েত, কাতার, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী গেছেন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ডেস্ক ও বিভিন্ন এনজিও সূত্রে জানা যায়, সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে যে সব নারী গৃহকর্মী হিসেবে যাচ্ছেন তাদের বড় একটি অংশই শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস, পররাষ্ট্র এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রতিনিয়ত অভিযোগ আসছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা নারীকর্মীর সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে এখন অনেক নারী দেশে ফিরে আসছেন।

এ ছাড়া বিদেশে গৃহস্থালি পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারা, ভাষাগত সমস্যা ও ভিন্ন খাদ্যাভাসের জন্য মুশকিলে পড়তে হচ্ছে তাদের। এ কারণেও অনেক নারীকর্মী সংশ্লিষ্ট দেশে পৌঁছেই নিজেকে খাপ খাইয়ে না পেরে দেশে ফিরে আসার জন্য আকুতি জানাতে থাকেন বলে জানা গেছে।

রিফিউজি এ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘বিদেশে নারীকর্মীর যাওয়ার হার দিন দিন বাড়ছে, সেই সঙ্গে প্রবাসে নারী শ্রমিকদের সমস্যাও বাড়ছে। অনেক দেশেই নারীকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে সহযোগিতা চাইলেও পাচ্ছেন না। নারীকর্মীদের তাৎক্ষণিক সহযোগিতার জন্য সরকারের উচিত দ্রুত হটলাইন এবং শেল্টার হোম খোলার উদ্যোগ নেওয়া।’

এ ব্যাপারে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক (ডিজি) বেগম শামসুন নাহার “নির্যাতনের সব অভিযোগ সত্য নয়’ জানিয়ে বলেন, ‘যে সব কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন, গিয়েই ‘হোম সিক’ হয়ে পড়েন অনেকে। তারা দেশে ফেরার জন্য আবেদন করে।”

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এই কিছু দিন আগেও সৌদি আরবে ৬ নারীকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগ আসে। পরে দূতাবাস ও আমাদের তদন্তের মাধ্যমে জানা গেল ওই ৬ জনের মধ্য ২ জন শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। আর বাকি ৪ জন কোনো অবস্থায় সেখানে কাজ করবেন না। এ কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে।’

শামসুন নাহার বলেন, ‘দুই-একটা নির্যাতনের ঘটনা যে ঘটে না তা নয়। এটা আমাদের দেশেও হয়, সব জায়গায়ই (বিদেশে) হয়। এটা আমরা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সৌদি আরবে কয়েক মাস আগে যখন চুক্তি হলো সেখানেই কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়গুলো রাখার চেষ্টা করেছি। এবং সৌদি আরবে নারীকর্মীদের পাঠানো উপলক্ষ্যেই কিন্তু বিদেশে গমনেচ্ছুক নারীদের এক মাসের আবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। এ কারণে প্রথম দিকে নারীকর্মী পাঠাতে তেমন সাড়া পাওয়া না গেলেও এখন পাওয়া যাচ্ছে।’

বিএমইটি সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে মোট ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে গেছে। এর মধ্যে নারীকর্মী বিদেশে যাওয়ার হার ১৯ শতাংশের (এক-পঞ্চমাংশ) উপরে।দ্য রিপোর্ট

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts