September 19, 2018

পৌরসভা নির্বাচন ক্ষয়ে যাচ্ছে এরশাদের পৃথিবী!

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

হায় এরশাদ!! জাতীয় পার্টির একি হাল!!! দেশের মানুষ অঞ্চলভেদে স্বর্ণলতা, আলোকলতা ও পরগাছা হিসেবে একটি গাছ চেনেন। স্বর্ণলতা নাম হলেও গাছটির ‘মেরুদন্ড’ নেই। অন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে স্বর্ণলতা বেড়ে ওঠে। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায় অথচ উদ্ভদটির নিজের দাঁড়ানোর কোনো শক্তি নেই। পরের ওপর নির্ভরশীল এ গাছের মতোই জাতীয় পার্টির অবস্থা! ক্ষমতাসীন দলের ছাতার নিচে রাজনীতি করায় দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। নিজের শক্তি নয়; ক্ষমতাসীনদের শক্তি অনুকম্পার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দেশের তৃতীয় বৃহৎ দলটিকে। সংকুচিত হয়ে আসছে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির অবয়ব। অবস্থা এমন পর্যায়ে এসেছে যে, পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী খুঁজে পাচ্ছে না দলটি। মাঠ পর্যায়ে এনপিপি, সিপিবি, বাসদের চেয়েও দলটির অবস্থা খারাপ।

স্বামী-স্ত্রী (এরশাদ ও রওশন এরশাদ) নিদারুণ প্রচেষ্টার পর দলের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২৩৫ পৌরসভার নির্বাচনে ৯৪ পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী দেয়া হয়েছে। কিন্তু দলের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, কাগজে-কলমে এ নামগুলো দেয়া হলেও মূলত ১০ থেকে ১২ জন মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বাকিগুলোকে এমনিতেই দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা। প্রতিদিন আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে শত শত নেতাকে। ২০ থেকে ২৫ হাজার নেতাকর্মী কারাগারে। নিত্যদিন গণগ্রেফতার থেকে বাঁচতে হাজার হাজার নেতাকর্মী পলাতক। হাজার হাজার নেতাকর্মী ফেরারি জীবন যাপন করছে। শত শত নেতাকর্মী বিদেশে রয়েছেন গ্রেফতার এড়াতে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের প্রথম সারি, দ্বিতীয় সারি ও তৃতীয় সারির নেতারা কারাগারে। যারা বাইরে রয়েছেন তারাও আছেন দৌঁড়ের ওপর। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার মতো অবস্থা তাদের নেই। তারপরও ২৪ ঘণ্টার নোটিশে বিএনপি সবগুলো পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী দিয়েছে।

শুধু তাই নয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৌশল হিসেবে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিকল্প প্রার্থীর চিন্তা মাথায় রেখে দলীয় নেতাদের প্রার্থী করা হয়েছে। দলটির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান, নির্বাচনে প্রার্থী হতেন এমন অধিকাংশ নেতা কারাগারে থাকার পরও দলের যা অবস্থা তাতে প্রতিটি পৌরসভায় ৮ থেকে ১০ জন করে নেতা রয়েছেন যারা মেয়র প্রার্থীর যোগ্য। প্রশ্ন হলো, জাতীয় পার্টির কেন এই হাল! জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দলটির শীর্ষ নেতাকে সাধারণ মানুষ দূরের কথা দলের নেতারাও বিশ্বাস করতে পারছেন না কেন? ’৯০ এর পট পরিবর্তনের পর সাংগঠনিকভাবে সারাদেশে জাতীয় পার্টি ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ’৯১ সালে ৩৫টি এবং ’৯৬ সালে ৩২টি আসন পেয়েছিল। সংসদ নির্বাচনে তিনশ’ আসনে প্রার্থী দেয়া যে দলের কোনো ব্যাপার ছিল না। হাজার প্রার্থী ভিড় করতো পার্টি অফিসে। সেই দলের ২৩৫টি পৌরসভায় প্রার্থী দেয়ার মতো অবস্থা নেই। পরমুখাপেক্ষী, পরগাছা, সামান্য সুযোগ-সুবিধার জন্য জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছায়ার নিচে অবস্থান নেয়ার কৌশল গ্রহণই দলের এই হাল।

এ ছাড়াও কয়েকজন কর্মচারী কাম পাতি নেতার ওপর এরশাদের অধিক নির্ভরশীল হওয়ায় সিনিয়র নেতা ও মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন। দেশের মেয়র প্রার্থীদের ঢাকায় এনে ঘটা করে ২৩৫ পৌরসভায় মেয়র পদে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কিন্তু তিন দিনেও সব মিলিয়ে অর্ধশত মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি। বনানীর জাপা অফিসে লাঙ্গল প্রতীকে মেয়র পদে লড়তে আগ্রহীদের ডাকেন এরশাদ। যারা এরশাদের ডাকে সাড়া দিয়ে পার্টি অফিসে আসেন তাদের মধ্যে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ তেমন ছিল না। সব মিলিয়ে মাত্র ৬০ জন মনোনয়ন ক্রয় করেন। কারণ কি? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হতে কেউ আওয়ামী লীগে চলে গেছেন। কেউ এরশাদের কর্মচারী কাম পাতি নেতাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেউ সরাসরি কেন্দ্রকে জানিয়ে দিয়েছেন দেশের রাজনীতিতে সংসদের বিরোধী দলের যে অবস্থা তাতে করে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন জাতীয় পার্টি না করে সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগদান করাই শ্রেয়।

কেউ দলকে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনে পরিণত করায় সিনিয়র নেতাদের গালাগাল করেছেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে, জাতীয় সংসদের বিরোধী দল হিসেবে পৌর নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অবস্থা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি’ প্রবাদের মতোই। প্রসঙ্গত উল্লেখ যে, ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক কর্মকান্ডে ধস নামতে শুরু করে। ২০১৪ সালে ৪৬২টি উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে মাত্র দু’জন প্রার্থী জয়ী হন। এ ছাড়া গত বছরের এপ্রিল মাসে ৩ সিটি নির্বাচনও এরশাদ সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মেয়র প্রার্থী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন ভোট পান দুই হাজারের কিছু বেশি এবং উত্তরের মেয়র প্রার্থী বাহাউদ্দিন আহমেদ বাবুল ভোট পান এক হাজারের কিছু বেশি। অথচ এদের কয়েকগুণ বেশি ভোট পান বামপন্থী প্রার্থী জোনায়েদ সাকী। সূত্র জানায়, পৌরসভা নির্বাচনে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে এইচ এম এরশাদ ও তার স্ত্রী রওশন এরশাদ জোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মাঠের নেতারা তাদের প্রতি আস্থাশীল হতে পারছেন না। জাতীয় পার্টির এ অবস্থা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, পরজীবী রাজনীতি করলে যা হয় জাতীয় পার্টির অবস্থা এখন তেমনই। নিজস্ব রাজনীতি না থাকায় দলটি ক্রমান্বয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে এ দলের অবস্থা মুসলিম লীগের চেয়েও খারাপ হবে।

কারণ, মুসলিম লীগের আদর্শ আছে, জাতীয় পার্টির সেটাও নেই। যার জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে মেয়র প্রার্থী দেয়ার চেষ্টায় দৌঁড়ঝাপ করলেও শেষ পর্যন্ত দলটি মুসির প্রসব করেছে। দলের লোকজন সুবিধাবাদী রাজনীতি পছন্দ করছেন না। হাজার হাজার নেতা কারাগারে এবং জেল-জুলুম-নির্যাতন-হামলা-মামলার পরও জনগণের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ২৩৫ পৌরসভায় মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বিএনপির কয়েক হাজার নেতা পেয়েছে। প্রতিটি পৌরসভায় ধানের শীষ নিয়ে ৪-৫ জন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য চেষ্টা তদবির করেছেন। অথচ ঘোষণা দিয়ে, তোয়াজ করে, টেলিফোন করে, অনুনয়-বিনয় করে নির্বাচনে লাঙ্গলের প্রার্থী করতে পারেনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। চলমান রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির এই নিদারুণ পরিণতিতে শেখার আছে অনেক কিছু। তাহলে সুবিধাবাদী চরিত্রের কারণে এরশাদ কি দেশের রাজনীতিতে ক্রমান্বয়ে এতিম হয়ে যাচ্ছেন? সবাই সরে যাচ্ছেন তার কাছ থেকে। সংকুচিত হয়ে আসছে তার রাজনীতির পৃথিবী!

উৎসঃ ইনকিলাব
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts