September 19, 2018

পেনসিলভেনিয়ায় যেভাবে থাকেন ফেতুল্লাহ গুলেন

ফেতুল্লাহ গুলেন। তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান শেষে নেপথ্য-কারিগর হিসেবে এ নামটি উচ্চারিত হচ্ছে জোরেশোরে। অভ্যুত্থানের পর প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান ব্যক্তিগতভাবে তাকে ও তার হিজমেত আন্দোলনকে দায়ী করতে দেরি করেননি। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র-নিবাসী এ রহস্যময় ধর্মীয় নেতাকে নিয়ে সারা বিশ্বে কৌতূহল তুঙ্গে উঠে। অবশ্য, ফেতুল্লাহ গুলেন ওই অভ্যুত্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

তার পুরো নাম মোহাম্মদ ফেতুল্লাহ গুলেন। ১৯৪১ সালে তুরস্কের ছোট্ট গ্রাম কোরুচুকে তার জন্ম। ষাট ও সত্তরের দশকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন গুলেন। ১৯৮১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সক্রিয় ধর্মপ্রচার থেকে অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ‘ইমাম ইন ইজমির’। আনুষ্ঠানিক ইসলামী পড়াশুনা করেননি। কিন্তু এরপরও পশ্চিমা বিশ্বে তাকে আখ্যা দেয়া হয় দুনিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তুরস্কের বড় বড় শহরের বহু মসজিদে ধর্মীয় হিতোপদেশ দিতেন। নব্বইয়ের দশকে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সংলাপের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। পোপ দ্বিতীয় জন পল, গ্রিক অর্থডক্স প্যাট্রিয়ার্ক বার্থোলোমিওস, ইসরাইলের সেফার্ডিক প্রধান রাবাই এলিয়াহু বাকশি ডোরনসহ ভিন্ন ধর্মের অনেক নেতার সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন।

১৯৯৯ সালের জুনে তিনি চিকিৎসার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। কিন্তু পরে জানা যায়, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে অনুসারীদের প্রতি তার আহ্বানের দরুন সরকারের রোষানলে পড়েন তিনি। তাই গ্রেপ্তার এড়াতেই তার যুক্তরাষ্ট্র গমন। কিছু তুর্কি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত ওই বক্তব্যে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বর্তমান সিস্টেম এখনও ক্ষমতায় আছে। আইনসভা ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে আমাদের যেসব বন্ধু প্রভাবশালী অবস্থানে আছেন, তাদের উচিত বিস্তারিত জেনে নেয়া ও সতর্ক থাকা। যাতে করে এ সিস্টেমকে তারা পাল্টে দিতে পারেন এবং ইসলামের পক্ষে আরও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নিতে পারেন। যতক্ষণ না আপনারা ক্ষমতার সব কেন্দ্রে পৌঁছবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের অবশ্যই এ সিস্টেমের ধমনিতে প্রবেশ করতে হবে, কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়েই। কিন্তু পরিস্থিতি আরও অনুকূলে আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।’ তার দাবি, পুরো বক্তব্য উল্লেখ না করে এ উদ্ধৃতাংশ বেছে নেয়া হয়েছে। তার অনেক সমর্থক ভিডিও রেকর্ডিংটি খাঁটি কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গুলেন নিজেও বলেন, তার বক্তব্য পাল্টে দেয়া হয়েছে। ৭৫ বছর বয়সী গুলেনের দাবি, তার ও তার আন্দোলনের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাবিলাস নেই। ১৯৯৯ থেকে আজ অবদি তিনি স্বঘোষিত নির্বাসনে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের ছোট শহর সেলর্সবার্গের ২৫ একরজুড়ে অবস্থিত একটি বিশাল বাড়িতে খুবই নিভৃতে তিনি বাস করেন। প্রায় কারও সঙ্গেই তিনি কথা বলেন না। বহু অনুরোধ সত্ত্বেও, গণমাধ্যমকে তিনি সাক্ষাৎকার দেন না বলেই চলে। এ বাড়িটিতে বসেই অনেকটা রিমোট কন্ট্রোলের মতো তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন হিজমেত আন্দোলনের বিশাল সাম্রাজ্য। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, থিংকট্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, গণমাধ্যম- সব মিলিয়ে শ’ শ’ কোটি ডলারের সমপত্তি তার। সবচেয়ে বড় কথা তুরস্কের সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ প্রায় সবখানে প্রভাবশালী অবস্থানে আছেন তার বহু অনুসারী, যাদেরকে ‘গুলেনিস্ট’ বলা হয়।

২০০০ সালে তুরস্ক ত্যাগের পর, তুরস্কের সাংবিধানিক শৃঙ্খলা বাতিল করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করার দায়ে তার বিচার হয়। যদিও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তিনি ছাড়া পেয়ে যান। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। ২০০৬ সালে তখনকার নতুন প্রধানমন্ত্রী (বর্তমান প্রেসিডেন্ট) রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের আমলে তুরস্কের সর্বোচ্চ আপিল আদালত তাকে খালাসের রায় বহাল রাখে। এর পেছনে এরদোগানের হাত থাকার বিষয়টিও তখন ছিল সপষ্ট। কিন্তু এরপরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বদেশে ফিরেননি তিনি।

২০০১ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমতি পান, যদিও তখন তুরস্কে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলছিল। তবে তিনি কখন গ্রিনকার্ড পান তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেখা গেছে মার্কিন গণমাধ্যমে। একবার মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেয়। তখন তার সমর্থনে এগিয়ে আসেন সাবেক উচ্চপদস্থ সিআইএ কর্মকর্তা ও ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্স কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান গ্রাহাম ই. ফুলার। সিআইএ’র সাবেক কাবুল স্টেশন চিফ ফুলার তখন গুলেনের পক্ষে এফবিআই ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কাছে চিঠি লিখেন। তার সুপারিশের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে রয়ে যেতে দেয়া হয় গুলেনকে। তার আরেক সুপারিশকারী ছিলেন তুরস্কে সিআইএ’র সাবেক দুই কর্মী জর্জ ফিদাস ও মর্টন আব্রামোয়িৎস, যিনি আবার পরবর্তীতে তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূতও ছিলেন।

তার মতো একজন ব্যক্তি কীভাবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র এমন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ, তা এক রহস্য বটে। আবার এ কারণেই তার পেছনে মার্কিন আশীর্বাদ রয়েছে বলে মনে করেন এরদোগান সমর্থকরা।

এরদোগান সঙ্গে সমপর্কের ভাঙ্গা-গড়া

সেকুলার সরকার উৎখাতের অভিযোগ থেকে ২০০৬ সালে গুলেনের অব্যাহতি প্রাপ্তির পেছনে এরদোগানের আশীর্বাদ থাকার বিষয়টি তুরস্কে সুবিদিত। ততদিনে দেশটিতে সেকুলার অভিজাতদের নিরঙ্কুশ আধিপত্যে চিড় ধরেছে। জনপ্রিয় নেতা এরদোগান হাল ধরেছেন দেশে। গুলেনের অনুসারী বা গুলেনিস্টরা এরদোগানের দল একেপিকে সমর্থন দেয়। গুলেনিস্টদের শিক্ষিত অংশ প্রশাসন চালাতে সাহায্য করে এরদোগানকে। গণমাধ্যমও চলে যায় তার পক্ষে। অপরদিকে তাদের বহু স্কুল, চ্যারিটি, কোমপানিকে দেশে বিদেশে বিভিন্ন সুযোগ দেয় এরদোগানের সরকার। একসময়কার অজেয় ধর্মনিরপেক্ষ অক্ষ সেনাবাহিনীর প্রভাব খর্ব করতে বহু মামলা করা হয়। এ কাজে এরদোগানকে সমর্থন দেন গুলেনের অনুসারী কৌঁসুলিরা। ওই বিচারের সমর্থকরা সেনা-প্রভাব খর্ব করার পক্ষে রব তুলেছিলেন, বিরোধীরা বলেছিলেন পক্ষপাতদুষ্ট বিচার। কিন্তু ২০১৩ সালের দিকে এসে এরদোগান-গুলেন সমপর্কে চিড় ধরে। এ সময় এরদোগানের ছেলে ও মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে গুলেনপন্থি কৌঁসুলিরা। তখনই ক্ষিপ্ত এরদোগান কঠোর হয়ে দমন করেন প্রায় ২০০০ পুলিশ কমান্ডারকে। বিচার বিভাগের নিয়োগে আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য হন্য হয়ে উঠেন তিনি। প্রায় কয়েক শ’ কোটি ডলার মূল্যের গুলেনিস্টদের ব্যবসায়িক স্বার্থেও হানা দেয় সরকার। তখন এরদোগান হিজমেত আন্দোলনকে বলেছিলেন ‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’, যারা সরকারের নির্দেশ পালন নয়, বরং নিজেদের আন্দোলনের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে কাজ করে।

কতটা প্রভাবশালী গুলেন ও গুলেনপন্থিরা?

সম্ভবত, এমন কোনো খাত নেই যেখানে ফেতুল্লাহ গুলেনের নেতৃত্বাধীন হিজমেত আন্দোলন প্রভাব বিস্তার করেনি। বিশ্বের ১৫০টি দেশে বহু মাধ্যমিক স্কুল পরিচালনা করে তার সংগঠন। এক যুক্তরাষ্ট্রেই ১৬০টিরও বেশি এমন চার্টার স্কুল রয়েছে। এসব স্কুল থেকে বহু তুর্কি বের হয়েছেন, যাদের অনেকে পেশাগত ও শিক্ষাগত জীবনে ভীষণ সফল। একসময় তাকে বলা হতো ‘তুরস্কের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি’।

২০০৯ সালে তার ব্যাপারে মার্কিন পররাষ্ট্রদপ্তরে তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন তুরস্কে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস জেফরি, যেগুলো পরে উইকিলিকস উন্মুক্ত করে। সেখানে তার রাজনৈতিক এজেন্ডা সমপর্কে বিশদ আলোচনা করেছিলেন রাষ্ট্রদূত জেফরি। তিনি উল্লেখ করেন, তুরস্কের পুলিশ বাহিনীতে শক্ত অবস্থান আছে গুলেনিস্টদের। কিন্তু পুলিশ বাহিনী গুলেনিস্টরা নিয়ন্ত্রণ করে, এমন দাবি নিশ্চিত করাটা অসম্ভব হলেও, কেউই দ্বিমত করেনি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বিবিসিকে বলেন, গুলেন এমন আন্দোলনের শীর্ষে রয়েছেন, বিশ্বজুড়ে যার সম্ভবত কয়েক কোটি অনুসারী আছেন। পাশাপাশি গণমাধ্যম, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও উন্নতমানের প্রাইভেট স্কুলের মাধ্যমে কয়েক শ’ কোটি ডলারের সমপত্তি আছে এ আন্দোলনের। তার সমপর্কে প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। সংগঠনের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডলিন অলব্রাইট, সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের মতো মহারথীরা। দেশে হিজমেত আন্দোলনের সঙ্গে সমপর্ক থাকার দায়ে হাজার হাজার কৌঁসুলি ও বিচারককে বহিষ্কার করেছে এরদোগান প্রশাসন। এসব থেকেই অনুমেয় কতটা প্রভাবশালী হিজমেত আন্দোলন।

সিআইএ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ: মধ্য এশিয়ার দুই দেশ উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানে গুলেনিস্টদের কয়েকটি স্কুলের ১৩০ শিক্ষককে আটক করা হয়। অভিযোগ উঠে, তারা হলেন ছদ্মবেশী সিআইএ এজেন্ট। তুর্কি ইন্টিলিজেন্স সার্ভিসের ইস্তাম্বুল শাখার সাবেক প্রধান ওসমান নুরি তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন, সিআইএ’র ওই অপারেশনের নাম ছিল ব্রিজেস অব ফ্রেন্ডশিপ। সাবেক এফবিআই কর্মী সাইবেল এডমন্ডসও তার একটি স্মৃতিকথায় সিআইএ কর্মীদের দ্বারা গুলেন স্কুল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। যদিও সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা ও গুলেনের সুপারিশকারী গ্রাহাম ফুলার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

(উৎসঃ ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, নিউ ইয়র্ক টাইমস, উইকিপিডিয়া, বিবিসি, সিডনি মর্নিং হেরাল্ড, ওপেন ডেমোক্রেসি ও গার্ডিয়ান,মানব জমিন)

Related posts