September 23, 2018

‘পুষ্পফুটিত হবে আমাদের বটতলা, মিশিব সবার তরে একে অন্যের তরে,

অনীল চন্দ্র রায়,
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ
শত বাধা ও প্রতিকুলতার মাঝেও ওরা পুর্স্ফুটিত ফুলগুলো সুবাতাসে যেমন গন্ধ ছড়িয়ে দেয় তেমনি ভাবে তারা দীর্ঘ ৬৮ বছর অবরুদ্ধ থেকে জীবন যুদ্ধে জয়ি সদ্য বিলুপ্ত কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাশিয়ারছড়া ছিটমহলের কল্পনা আক্তার,ফাতেমা বেগম, পারুল আক্তার ও মর্জিনা বেগম। সদ্য প্রতিষ্ঠিত নতুন বাংলা দিপ্তীমান স্টাডি হোমে থেকে নিজের পড়ালেখার পাশাপাশি ৫০ জন অক্ষর জ্ঞানহীন শিশুসহ অন্যান্যদের বিনা বেতনে পড়ালেখা করাচ্ছে। তাদের শুধু চাওয়া পাওয়া তারা যেন সমাজে মাথা উচু করে দাড়াতে পারে ।

কল্পনা আক্তারঃ   আজ খুব ভালো লাগছে বাবা মায়ের আট সন্তানের মধ্যে আমি চতুর্থ। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে আমি যখন গংগারহাট এম এ এস বিদ্যালয়ে পড়লা লেখা করি। তখন আমার মনে ভিষন একটা ইচ্ছা শক্তি জন্ম নিল যে, আমি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর একজন পুলিশ অফিসার হবো। যখন ২০১২ সালে এসএসসি পরীক্ষা মানবিক বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হই আমি ভাবলাম আমার ইচ্ছা টা ইচ্ছাই রয়ে যাবে বোধ হয়। কারন আমি তখন্ও ছিটমহলবাসী । আমার চাকুরী হবে কি করে । স্বপ্ন দেখতে দেখতে যখন এইচ এসসি পাশ করলাম বিএ ফুলবাড়ী ডিগ্রী কলেজে ভর্তি হলাম । ঠিক কয়েক মাস পরেই আমাদের
ছিটমহল অধিবাসী বাংলাদেশের লাল সবুজের পতকা তলে স্থান পায়।

ইতি মধ্যে বটতলা কামাল পুরে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরী করি।ছোট ছোট সোনামনিদের হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য । তার নিদিষ্ট সময় বিকেল চারটাথেকে রাত নয়টা পর্যন্ত। শিশুদেরকে শিক্ষা দিতে দিতে আগের দেখা স্বপ্নটা বদলে গেছে। এখন আমার ইচ্ছা হচ্ছে যে, নতুন বাংলা দাশিয়ার ছড়াতে যে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হবে সে প্রতিষ্ঠান গুলোতে শিক্ষকতা করে জীবনের মোড় বদলে দিব । তাই আশা করছি শিক্ষাকতার সুযোগ করে দিবে আমাদের সরকার। দাশিয়ার ছড়া বাসীদের জন্য এ পদক্ষেপ নিবেন সরকার নিজে। শুধু ছিট বাসীদের জন্যে। এটাই আমার প্রত্যাশা । তবে আমরা যে প্রতিষ্ঠানটিতে শুরু করেছে সেটা দিকে নজর দিবেন আমাদের উপজেলাবাসীসহ সারা দেশ। তাদের যেন কোন কাছে অবহেলার স্বীকার না হই আমরা । তবে চাকুরী পাওয়ার পরেই নতুন বাংলা দিপ্তীমান স্টাডি হোম প্রতিষ্ঠানটির প্রতি যে কোন অবহেলা না হয়। প্রতিষ্ঠানের কথা যেন বিশ্বের কাছে ছড়িয়ে পরে এতে যেন কোন সন্দেহ না থাকে।

ফাতেমা বেগমঃ আমার পিতা আব্দুল করিম তালুকদার । আমরা ছয় ভাইবোন বিভিন্ন স্কুল কলেজে পড়ালেখা করি। আমি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে হাই স্কুলে পা দেই। আমাদের পরিবারটি নিন্ম পর্যায়ের পরিবার অথ্যাৎ আমার বাবা রিকশা চালিয়ে সংসার চালানোর পাশা পাশি পড়ালেখার খরচ চালাতে খুব কষ্ট হয়। এ ভাবে আমার পড়ালেখা চলতে থাকে। যদি আমি ছিটমহল বাসী । গ্রামের সবাই বলে ছিটমহলে বাস করে পড়া লেখা করে কি হবে। চাকুরী ভাগ্যে হবে না। তবুও আমার স্বপ্ন ছিল অনেক বড় কিছু হব কারন আমি মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকতে চাই। এ ভাবে দিন যায় মাস বয়ে বছর পেরিয়ে আসে আমার লেখা পড়া। আমি বড় মানুষ হব । বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হই। এস এসসি ভর্তি হবো এগিয়ে যাই।

কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়া লেখার সুযোগ হলো না। কারন আমার বাবার আর্থিক অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হয়ে গেল। তাই আমি মানবিক শাখায় ভর্তি হয়ে অর্থ উর্পাজনের জন্য স্ব পরিবার মিলে ঢাকায় চলে যাই। কারন বাবা পক্ষে সংসার চালানোর পাশাপাশি আমাদের চার ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ চালানো তার পক্ষে আর সম্ভব না। তাই আমার বড় হওযয়ার স্বপ্ন দিন দিন হারিয়ে যায়। ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসফেক্টরীতে চাকুরী করে টাকা উর্পাজন করি ।সেই টাকা দিয়ে এইচ এসসি পাশ করি। ফুলবাড়ী ডিগ্রী কলেজে স্নাতকে ভর্তি হই। কারন টাকার অভাবে অনার্স পড়ার সুযোগ হয়নি আমার কপালে। ডিগ্রীতে অনেক সময় পাওয়া যায়। লেখা পড়ার পাশাপাশি ।

তখনই আমাদের গ্রামে একটি নতুন বাংলা দিপ্তীমানস্টেডি হোম কোচিংসেন্টার খুলে হামিদুল ভাই। আর আমি সেখানে ছোট ছোট সোনামনি ঝড়ে পড়াদের শিক্ষাদেই। ভর্তি হওয়া সমসাময়িক সময়ে আমাদের ছিটমহল অনেকচেষ্টার পর ৩১ জুলাই মধ্য রাতে বাংলাদেশ হয়ে যায়। তখন আবার নতুন করে স্বপ্ন দেকা শুরু করি। মনে ভাবি আমি যদি একটি সরকারী চাকুরি পেতাম।তা হলে পরিবারের আর্থিক দুরাবস্থা দুর করতে পারতাম । নিজেকে একটু সুখি মনে করতাম। কারন পিতা মাতা মাথার উপরথেকে অর্থের ভার কমে যাবে। তাই আমার অনেক বড় আশা সরকারী চাকুরীর।

পারুল আক্তারঃ আমি কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজে বিবি এস অর্নাস হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছি। আমার বাড়ী দাশিয়ার ছড়ায়। পরিবারটি মধ্যবিত্ত তাই পরিবারে আমাদের অনেক সমস্যারমোকাবেলা করে চলতে হয়। দারিদ্রতা তার মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন স্কুল এবং কলেজে পড়–য়া তিন ভাইবোন নিয়ে আমাদের পরিবারের সংখ্যা ৫জন। আমার বাবা একজন কৃষক। আমাদের পরিবারে একমাত্র উর্পাজন কারী ব্যক্তি বাবা। পরিবারকে সহায়তা করার ভালো অবস্থানও আমারনেই। তাই আর্থিক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সর্বদা একটি ভাল সরকারী চাকুরী করার স্বপ্ন দেখি। আর চাকুরীটা শিক্ষকতা হলে আমার জন্য আত্যন্ত ভাল। কারন মেয়েদের জন্য শিক্ষকতা করা একটি সম্মানিত পেশা।

তা ছাড়া শিক্ষকতা করলে নিজের গ্রামে থেকে পরিবারের সবাই এক সাথে থেকে করা যায়। তাই আমার এই ক্ষুদ্র মনের একটি ক্ষুদ্র প্রত্যাশা যেন একটি সরকারী চাকুরী যেন পাই। আমার বাবা মা অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা করাচ্ছেন। ভবিষ্যতে আমি যদি কোন চাকুরী পাই তা হলে আমার পরিবারের জন্য কিছু করতে পারব এবং নিজেকে ক ধন্য মনে করব। আমার পড়ালেখার পাশাপাশি একটি কোচিংসেন্টারে শিক্ষকতা করছি। এই কোচিং সেন্টারের নাম নতুন বাংলা দিপ্তীমান স্টেডীহোম। এখানে গ্রামে ঝরে পড়াছেলেমেয়েদের আমরা বিনা টাকায় বিনা খরচে পড়ালেখা করাই। তাদের লেখা পড়ার সমস্থ খরচ আমরাই বহন করি। এ

কোচিংসেন্টারের বৈশিষ্ট্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী । বৈশিষ্ট্য গুলো হলো ঝরে পড়াছেলে মেয়েদের পাঠ দান,লেখা পড়ার পাশাপাশি বির্তক কুইজ ছায়া সংসদ, বিনোদন মূলক ইত্যাদির ব্যবস্থা, সাপ্তাহিক ও মাসিক পরিক্ষা, সমাজের বিভিন্ন সচেতনাতা মূলক কার্যাবলির মধ্যে যৌতুককে না বলা, মাদক মুক্ত সমাজ গড়া, পরিবেশের ভারসম্য রক্ষা করার জন্য গাছলাগানো ও বাঁচানো, আরও অনেক কিছু । এই কোচিংসেন্টার মূলত টিচার প্যানেল কর্তৃক সমস্থ খরচ বহন করি। এর মধ্যে বিত্তবানরা নিজেদের ইচ্ছামত যা টাকা পাঠায় । মূলত এ ভাবেই এ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছি। এটুকু বলতে চাই যেহেতু আমরা সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহলের অধিবাসী আমরা এতদিন শোষিত, বঞ্চিত ছিলাম। আমরা আর বি ত থাকতে চাই না।

আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরী প্রত্যাশা করি। দু সময়ে স্বপ্ন আশা কল্পনাই মানুষকে ভবিষ্যতের জন্য বাঁচতে সহায়তা করে। আমার মনেও তেমনি স্বপ্ন, আশা, কল্পনা বিরাজমান আছে। একজন মানুষ হিসেবে মনের ভাবগুলো ব্যক্ত করে । আমি এতটুকু হলেও স্বিস্তি পাচ্ছি।

মর্জিনা খাতুনঃ আমার পিতার নাম আব্দুলমোত্তালিব মা রহিমা বেগম, বাবা একজন কৃষক । বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ার ছড়ার বটতলা কামালপুর গ্রামে আমার বাড়ি। আমার পরিবারের সদস্যসের সংখ্যা ৫ বোন ৩ ভাই। আমরা বিভিন্ন স্কুল কলেজে সবাই পড়ালেখা করি। আমি উত্তর চন্দ্রখানা কুমরপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছি। গংগারহাট দ্বিমুখী দাখিল মাদরাসা থেকে বিজ্ঞান বিভাগে দাখিল পাস করেছি। আমার বাড়ি থেকে স্কুলে দুরত্ব প্রায় ৪ কিলোমিটার । উপজেলার শাহ বাজার সিনিয়র কামিল মাদরাসা থেকে আলিম ও পরে ফাজিল পাস করেছি। নাগেশ্বরী কামিল মাদরাসা থেকে আদব বিভাগে কামিল শেষ করেছি। এখন রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স করছি।

আমার ইচ্ছা ছিল আমি আলিম পাস করে বাংলা অথবা ইংরেজি বিষয়ে অনার্স মাস্টার্স করব। সেটা আমার কপালে জুটেনি। কারন আমি যৌথ পরিবার যুক্ত। বাহিরে পরিবেশের সাথে মিশতে পছন্দ করত না আমার পরিবার। বিশেষ করে ছিটমহলের অধিবাসী হওয়ায় লেখা পড়া করে কি হবে। চাকুরীতো কপালে জুটবে না। কারন আমি তো ছিটের অধিবাসী। তখন মনমানসিকতা কেমন যেন খারাপ হয়ে যেত।

আল্লাহ তালা কেমন জায়গায় আমাদের জন্ম গ্রহনের আদেশ দিলেন যে সারা জীবন ঘৃনার ব্যক্তি হয়ে থাকব। এমনকি আমাদের ছিটমহলে ছেলে মেয়েদের কোন ভাল পরিবারে বিয়ে দিতে চাইলে তারা আরও অহংকারের দৃষ্টিতে তাকাইতো। আর বলত যেখানে রাস্তানেই, বিদ্যুৎনেই, নেই কোন বিচার ব্যবস্থা ও পরিচয়ের। সেখানে কি ভাবে বিয়ে দেয়া বানেয়া সম্ভব। সব সময় ঘৃনার দৃষ্টিতে দেখত। আল্লাহর রহমতে ১৯৭৪ সালে মুজিব ইন্দিরা চুক্তিতে জননেত্রী শেখ হাসিনা বাস্তবায়ন করে ফেলেছেন ছিটমহল অধিবাসীদের হাজার হাজার লোকের মুখে। মুচকি হাসি। ফুটিয়ে তুলেছেন শেখ হাসিনা।

১১১টি ছিটমহলের মানুষের জন্য। আমরা যখন কোথাও বেড়াতে যাই। কেউ যদি প্রশ্ন করত তোমাদের বাসা কোথায় যদি উত্তর দিতাম দাশিয়ারছড়া। তখনেই মনে হত তাদের বমি বমি ভাব। এমন লাগত তাদের কাছে আমাদেরকে। এটা আমাদেরকে বিধাতাই ফয়সালা করে দিয়েছেন । ৩১ জুলাই মধ্য রাতে । পহেলা আগষ্ট থেকে আমরা বিশ্বের কাছে বলতে পারি । আমরা বাঙ্গালি, আমরা বাংলাদেশি, এটা আমাদের অহংকার । তাই সেই অহংকারের সঙ্গে বলতে চাই যে আমরা কোন না কোন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবো এবং চাকুরীর সুযোগ পাব। শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মস্থলে যেন যেতে পারি। জীবনের প্রথম থেকেই ইচ্ছা ছিল সরকারী কোন না কোন পদে আমি যুক্ত হবো।

সে কর্মের মাধ্যমে যেন জীবন অতিবাহিত করি। এটাই আমার প্রত্যাশা। আমি শিক্ষকতা করে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই। ভালবাসা ও সোহাগ দেওয়া, মিষ্টি কথা বলা সুন্দর সুন্দর ছড়া বলা, এটাই যেন করতে পারি। বাবা মা, ভাই বোনদেক নিয়ে যেন আর্থিক স্বচ্ছলতার মাধ্যমে চলতে পারি। ফুটান্ত গোলাপ যে গোলাপ ফুটিয়ে উজ্জ্বল করবে একটি বাগানকে এই বাগানেই হলো আমাদের দাশিয়ারছড়া। তাই আমরা নতুন বাংলা দিপ্তীমান স্টেডী হোম চালু করেছি। একটি একটি পরিপূর্ণ বাগান হয়ে উঠবে কামালপুর।পুষ্পফুটিত হবে আমাদের বটতলা। প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরী হবে মনের বাগান। যে বাগানে প্রতিজনে হবো আমরা মালি। খাবার তুলবো ঘরে আনন্দ সুরে। মিশিব সবার তরে একে অন্যের তরে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts