September 25, 2018

পুলিশ কখন গুলি করে, কখন করে না

ঢাকাঃ চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশের রেইডে নয়জন সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহতের ঘটনা অনেক আলোচনা, বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পুলিশ বলছে, এ ধরনের অভিযানে সন্দেহভাজনের মৃত্যু অবধারিত। সত্যিই কি তাই?

জার্মানিতে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নিয়ে গত কয়েকমাস ধরেই আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামে পরপর কয়েকটি বড় হামলার পর, জার্মানির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা অনেক বেড়েছে। এ রকম অবস্থায় পুলিশের বাড়তি উদ্যোগ থাকা খুবই স্বাভাবিক। জার্মান পুলিশ সেই উদ্যোগের আওতায় কয়েক জায়গায় রেইড দিয়েছে, সন্দেহভাজনদের ধরেও নিয়ে গেছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি ক্ষেত্রে জঙ্গিরা যখন বড় এক হামলার পরিকল্পনা মোটামুটি চূড়ান্ত করে ফেলছিল, তখন তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে এ সব রেইডে কিন্তু কেউ প্রাণ হারায়নি।

তবে সম্প্রতি একটি সন্ত্রাসী হামলা চলাকালে পুলিশের গুলিতে জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে জার্মানিতে। গত ১৮ জুলাই ট্রেনের মধ্যে এক জঙ্গি কুড়াল দিয়ে এলেপাথাড়ি কুপিয়ে কমপক্ষে পাঁচজনকে আহত করে। তখন পুলিশের গুলিতে সে নিহত হয়। এর কিছুদিন আগে, গত ২৩ জুন, একটি সিনেমা হলে ‘বন্দুক’ নিয়ে ঢুকে মানুষকে জিম্মি করার চেষ্টা করে এক ব্যক্তি। পুলিশ তাকেও গুলি করে মেরে ফেলে।

কেউ কেউ বলতে পারেন, জার্মানির সাম্প্রতিক পুলিশ রেইডে সন্দেহভাজন কেউ মারা না যাওয়ার কারণ তারা পুলিশকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেনি বা সুযোগ পায়নি। এক্ষেত্রে ব্রাসেলসের উদাহরণ টানা যেতে পারে। গত বছরের নভেম্বর মাসে প্যারিস সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারায় কমপক্ষে ১৩০ ব্যক্তি। কয়েকজন বন্দুকধারী রাতের আধারে তাণ্ডব চালিয়ে তাদের হত্যা করে। সেই হামলার মূল সন্দেহভাজন সালাহ আব্দেসালামকে ১৮ মার্চ বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে জীবিত গ্রেপ্তারে সক্ষম হয় পুলিশ, গুলি বিনিময়ের পর। মোদ্দাকথা হচ্ছে, ইউরোপের, বিশেষ করে জার্মানি, ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামে পুলিশের কাছে শেষ অস্ত্র হচ্ছে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছোঁড়া। আর এটা করার ঘটনা বিরল।

কোনোভাবেই বলছি না যে, বাংলাদেশ পুলিশের জীবন বাজি রেখে সন্দেহভাজনদের জীবিত আটক করা উচিত। নৈতিক বিবেচনায়, পুলিশ প্রয়োজন মনে করলে গুলি ছুঁড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে মনে রাখতে হবে, তারা প্রশিক্ষিত। কোন পরিস্থিতিতে, কোথায়, কীভাবে গুলি করতে হবে, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, সেটা জানে বলেই তো তারা পুলিশ।

তবে হতাশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ পুলিশের রেইডে সন্দেহভাজনদের নিহত হওয়ার ঘটনা এত বেশি যে এখন পুলিশের হাতে নিহতের কোনো ঘটনা ঘটলেই সেটা নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হয়ে সাধারণ মানুষের মনে। সেসব ঘটনার পুলিশি বর্ণনা, আর গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং নিহতদের পরিবারবর্গের বক্তব্যের মধ্যে ফাঁরাক থাকে অনেক। ফলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সহজেই সন্দেহভাজনদের মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনাকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দেয় বা দিতে পারে। কিন্তু এটা কি শুধু বাংলাদেশ পুলিশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য?

প্রতিদিন সকালে ডয়চে ভেলের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগে দিনের কার্যসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেই বৈঠকে ঢাকা পুলিশের কল্যাণপুর অভিযান নিয়ে যখন কথা হয়, তখন তিন বিদেশি সাংবাদিক কয়েকটি উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর একটি ক্ষেত্রে অনেক মিল। তাদের হাতে সন্দেহভাজন নিহতের ঘটনা অহরহ ঘটে। এটা কি এজন্য যে, পুলিশ মনে করে সন্দেহভাজনদের জীবিত ধরা হলে তারা আইনের ফাঁক থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবারো বড় অপরাধে জড়াতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য পুলিশ কখনো সরাসরি দেয় না। তাদের অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ করাও সাংবাদিকতার নীতিবিরুদ্ধ। আবার আদালতে প্রমাণিত জঙ্গি বা সন্ত্রাসীরা সবাই যে আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যায়, সেটা বলাও কঠিন। বাংলাদেশের দুই শীর্ষ জঙ্গি সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমানকে কিন্তু ২০০৬ সালে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করে জীবিত উদ্ধারে সক্ষম হয়েছিল বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী। পরবর্তীতে আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের সর্বোচ্চ শাস্তিও হয়েছিল।

Related posts