November 17, 2018

পুলিশের বিরুদ্ধে আজ্ঞাবহ লাঠিয়াল বাহিনী আর নীতিভ্রষ্টার অভিযোগ

152

আব্দুর রহিমঃ  অভিযোগ উঠেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত অসৎ পুলিশ সদস্যরা অপরাধ দমন না করে উল্টো নিজেরা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। পোশাক পরে চাঁদাবাজি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ করছে। অভিযান, তল্লাশি ও অভিযানের নামে অসৎ পুলিশ সদস্যরা নিরীহ ব্যক্তিদের পকেট হাতিয়ে টাকা-পয়সা, মোবাইল যা পাচ্ছে ছিনিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে থানায় ধরে নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধী আখ্যা দিয়ে নির্যাতন করে আদায় করছে মোটা অঙ্কের টাকা। পুলিশের হয়রানির শিকার হয়ে কেউ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে তাকে জড়ানো হয় একাধিক মিথ্যে মামলায়

রাজধানীর ৫১ থানায় পুলিশের রাত্রীকালীন টহল পার্টি, মোবাইল টিম, বিট পুলিশ সদস্যরা এসব অপরাধ বেশি করছে। চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ে নামা পুলিশ সদস্যরা এসব টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। থানায় ধরে নিয়ে যাওয়ার পর কখনো কখনো ওসিদের মাধ্যমেও চাঁদা আদায় করা হয়। এসব অভিযোগের ঘটনা প্রতিদিন বাড়ছে। কিন্তু শাস্তি সাময়িক বরখাস্ত, প্রত্যাহার, লঘুদ- ছাড়া ২/১ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা দায়ের করা হয়। অনেকের সাময়িক সাজা শেষে তারা আবার তদবির করে পোস্টিং ও পদোন্নতি পায়।

পুলিশের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে তদন্ত শেষে শাস্তি দেয়া হয়েছে ১০ হাজার পুলিশ সদস্যকে। এদের মধ্যে ৭৬ জনকে করা হয়েছে চাকরিচ্যুত। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড ডিসিপ্লিন (পিএসডি) শাখা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তবে ভূক্তভোগীদের অনেকেই পুলিশি হয়রানির ভয়ে অভিযোগ করার সাহস পান না। ফলে অনেক ঘটনাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

শুধু সাধারণ মানুষ নয়; পুলিশের হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছে না সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। উদাহরণত, গত ৯ জানুয়ারি-২০১৬ রাতে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কমিউনিকেশন্স বিভাগের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে আটক করে। এরপর তাকে ‘ইয়াবা ব্যবসায়ী-সেবনকারী’ বলে দেহ তল্লাশি করে। পরে গাড়িতে উঠিয়ে টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে গ্রেফতারের ভয় দেখানো হয়। এদিকে রাব্বীর ঘটনায় সমালোচনার মধ্যেই রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তাকে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে আরেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। পুলিশ প্রথমে তার কপালে বাড়ি মারে। এরপর তার পিছনে লাথি মারে। অকথ্য-অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে এবং গলা টিপে ধরে বলে, ‘মাছের রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ।’

বলাবাহুল্য, পুলিশের পক্ষ থেকে ‘মাছের রাজা ইলিশ দেশের রাজা পুলিশ’ বলে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ উক্তি করা হয়েছে তা ভয়ানক। তবে এ শুধু অভিযুক্ত পুলিশেরই নয়- এরকম ধারণা অনেক পুলিশেরই। এ অবস্থা নিরসন করা না হলে, দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া না হলে দেশের সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।

একথা এখন ওপেন সিক্রেট যে, পুলিশের চাকরি পেতে হলে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। চাকরিতে যোগদান করার আগে যে টাকা ঘুষ দিতে হয় তা সংগ্রহ করতেই পুলিশ অবৈধ আয় রোজগারের পথে পা বাড়াচ্ছে।

সবচেয়ে বড় কথা, পুলিশ বাহিনী চলছে ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ বেনিয়াদের প্রবর্তিত আইন দিয়ে। তখনকার শাসকরা পুলিশকে কাজে লাগাতো ‘ফোর্স’ হিসেবে। স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো সেই ফোর্স হিসেবেই রয়ে গেছে পুলিশ। সেবক হিসেবে তারা তৈরি হয়নি। ফলে পুলিশের মন-মানসিকতা উপনেবেশিক পুলিশের মতোই রয়ে গেছে।

পাশাপাশি সব সরকারই পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে চায়। তারা পুলিশকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে। এজন্য পুলিশও সরকারের বাইরে কাউকে পরোয়া করতে চায় না। ফলে তারা ব্যক্তিগত অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। এর পরিবর্তন খুবই জরুরী।

উল্লেখ্য, সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার আদর্শ ধার নিয়ে বিভিন্ন দেশে পুলিশ জনগণের বন্ধু, কখনো সেবক হিসেবে কাজ করছে। জনগণ পুলিশকে বন্ধু মনে করে, কোনো সমস্যা হলে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায়। পুলিশও তাদের সাধ্য অনুযায়ী উপকার/সহায়তা করতে চেষ্টা করে।

অথচ বাংলাদেশের পুলিশ আর বিভিন্ন দেশের পুলিশের মধ্যে রাত আর দিন পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। আমাদের দেশে একটা কথা চালু আছে- ‘বাঘে ধরলে এক ঘা, আর পুলিশে ধরলে আঠারো ঘা।’ বর্তমানে অধিকাংশ পুলিশের কাছ থেকে আমরা এরূপ আচরণই পাচ্ছি। পুলিশের এ ধরনের চরিত্র দেশের জনগণের কাম্য নয়। জনগণ চায় এমন পুলিশ যারা জনগণের জান-মাল রক্ষার কিন্তু এ ধরনের চরিত্র আমরা পুলিশের নিকট থেকে পাচ্ছি না কেন? কোথায় গলদ রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ খুঁজে বের করে পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে তৈরি করতে হবে।

অনেক দেশে পুলিশে নিয়োগ পাওয়া খুব কঠিন বিষয়। পুলিশ সদস্য নিয়োগ দিতে শুধু ওই পুলিশ সদস্যের স¦ভাব চরিত্রই দেখা হয় না, তার পূর্বপুরুষের খোঁজ পর্যন্ত নেয়া হয়। তার বাবা-দাদা, নানার বংশে কে কি ছিল? কেমন ছিল? তাদের স¦ভাব কি ধরনের ছিল? ইত্যাদি ইত্যাদি খোঁজ-খবর নেয়া হয়। পূর্বপুরুষের কারো স¦ভাবে খারাপ কোনো রিপোর্ট থাকলে তাকে আর পুলিশে নিয়োগ দেয়া হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে টাকার বিনিময়ে চোর-ডাকাতকেও পুলিশে নিয়োগ দেয়া হয়।

পূর্বপুরুষের চরিত্র দেখা তো দূরের কথা- ওই পুলিশ সদস্যের স¦ভাব চরিত্রের খবরটাই নেয়া হয় না। রাজনৈতিক বিবেচনায় ও টাকার বিনিময়ে আমাদের দেশের পুলিশ সদস্যরা নিয়োগ পায়। তাই পুলিশ ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিবাজ, সম্ভ্রমহরণকারী, লুণ্ঠনকারী হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। এই যদি হয় পুলিশ সদস্যদের নিয়োগ পদ্ধতি, তাহলে এদের কাছ থেকে তো আর আমরা ভালো কিছু আশা করতে পারি না।

পাশাপাশি উল্লেখ্য, নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও অরিয়েন্টেশন এমনভাবে হওয়া উচিত- যাতে মানবিক, সততা, দায়িত্বপরায়ণতা ও নৈতিক গুণাবলীর যথাযথ বিকাশ ঘটে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts