September 26, 2018

পুরোনো সেই ঝগড়া; পিছিয়ে বিএনপি!

এবারই প্রথম দলীয় পতাকায় পৌরসভায় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। একদিকে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতিশ্রুতি অন্যদিকে গণতন্ত্র রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে অংশ নিচ্ছে সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ফলে সার্বিকভাবে নির্বাচনী আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে শুরু হয়েছে তর্ক-বির্তক আর পুরোনো ঝগড়া। বিশেষ করে প্রার্থীতা বাতিল ইস্যুকে একপক্ষ যৌক্তিক বললেও অন্যপক্ষের দাবি তাদের হটানো হচ্ছে। তবে শেষ অব্দি দু’দলই জয়ী হবার স্বপ্ন দেখছে। আর নির্বাচন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ বেশ কৌশলী হলেও কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে বিএনপি। বিশেষ করে দলীয় মনোনয়ন না থাকা, হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা কিংবা ১০০ জন ভোটারের লিখিত সমর্থন না থাকা ইত্যাদি শর্ত পূরণে ব্যর্থতার দায়ে মেয়র পদে অন্তত: ৮১ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী।

যদিও মনোনয়নপত্র বাতিলের কাতারে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও রয়েছেন। কার্যত: পৌর নির্বাচনে একচেটিয়া জয় নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ। আর এ জন্য বিভিন্ন শক্ত কৌশল অবলম্বন করছে দলটি। অপরদিকে, নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই বিভিন্ন অভিযোগ করে আসছে বিএনপি। জানা গেছে, রোববার ছিল আবেদন যাচাইয়ের শেষ দিন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৮১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থিদের প্রার্থী বেশি। অপরদিকে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এ সুযোগে এগিয়ে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কেননা এবার রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় মনোনয়ন দিতে পারবে কেবল একজনের ক্ষেত্রে। এতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর আবেদনপত্র বাতিল হয়ে গেলে আওয়ামী লীগ সুবিধা পাচ্ছে। আবার বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করায় এগিয়ে থাকছে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী। মনোনয়নপ্রত্র বিতরণের পর থেকেই আওয়ামী লীগের নেতারা বলে আসছেন, বিদ্রোহীদের বশে আনা হবে।

যদি না আসে তাহলে দলীয় শৃংখলা ভঙ্গের দায়ে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু শেষাবধি বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে থাকবেন নাকি দল থেকে বহিষ্কার মেনে নেবেন, এ নিয়ে অনেকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। এদের অনেকেই বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে থাকায় প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তবে ‘গণতন্ত্রের স্বার্থে’ পৌর নির্বাচনে আসা বিএনপি নেতাদের দাবি, পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তারা ৮০ শতাংশ বেশি ভোট পাবে। তবে তাদের শঙ্কা সিটি নির্বাচনের মতো এবারও জনগণ তাদের ভোটধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। যদি পারে বিএনপি ব্যাপক ব্যবধানে জয়লাভ করবে বলে দাবি করেছে ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বর্জনকারী এই রাজনৈতিক দল। পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাই শেষে রোববার দ্বিতীয় দিনে কয়েকটি পৌরসভায় সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৫৯ জন মেয়র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এর আগে শনিবার মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিনে কয়েকটি পৌরসভায় মেয়র পদে বিএনপি, জাতীয় পার্টি মনোনীত ও আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিদ্রোহীসহ কমপক্ষে ২২ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এছাড়া কাউন্সিলর পদের আবেদনও বাতিল হয়েছে অনেকের।

তবে এগুলোর মধ্যে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীই বেশি রয়েছেন। শুক্রবার শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানানোর পর বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সাংবাদিকদের বলেন, পৌর নির্বাচনকে ‘আন্দোলনের অংশ’ হিসেবেই দেখছি। বিএনপি নেতা অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদের অভিযোগ, কারচুপি হবে জেনেও বিএনপি পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। জেনেশুনে তারা বিষপান করেছেন। আরো একটি প্রহসনের নির্বাচন মঞ্চস্থ করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিম পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শামসুর রহমানের মনোনয়ন বাতিলের পর শামসুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচন তো হবে দূরের কথা, এখন দেখা যায় আমাকে দাঁড়াইতেই দিচ্ছে না। সুষ্ঠু নির্বাচন কোথা থেকে হবে। আমার তো মনে হয় না নির্বাচন হবে এখানে। সুষ্ঠু নির্বাচন তো দূরের কথা। বিরোধী পার্টিকে দাঁড়াইতেই দিচ্ছে না তাহলে নির্বাচন হবে কীভাবে?’ কিন্তু বিএনপির এই দাবিকে খারিজ করে আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, পৌর নির্বাচনে জিততে পারবে না ভেবেই বিএনপি মিথ্যাচার করছে। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের এত বাইরে চলে গেছে যে, চেষ্টা করলেও এই নির্বাচনে তাদের জয়লাভ করার সুযোগ নেই।

আর সেজন্যই তারা সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ও মিথ্যাচার করছে। তাদের ভ্রান্ত ধারণা, এসব করে জনগণের কিছুটা অনুকম্পা পাওয়া যাবে। তবে এই মুহূর্তে বিএনপির চেয়ে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে বেশি ‘সতর্ক’ আওয়ামী লীগ। গত শুক্রবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে হানিফ বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে যদি কেউ ১৩ তারিখের মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করেন, তাহলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।’ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেবে না। বিভিন্ন বিভাগের সাংগাঠনিক সম্পাদকরা, এ ক্ষেত্রে টেলিফোনেও বিদ্রোহী প্রার্থীদের ১৩ ডিসেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময় পার হওয়ার আগেই প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দেশও দিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। সব বিদ্রোহী প্রার্থীর এলাকাগত অবস্থানসহ সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে দলের জেলা নেতাদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা নিজ নিজ জেলার বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছেন। অবশ্য কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে ‘বুঝিয়ে-শুনিয়ে’ বিদ্রোহী প্রার্থীদের বাগে আনার প্রচেষ্টাও রয়েছে দলের মধ্যে।

বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থী অনেকটাই প্রভাবশালী কিংবা দলের জন্য অপরিহার্য, এমন প্রার্থীর বেলায় এ কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিনিময়ে দলীয় পদ-পদবি অথবা অন্য কোনো জায়গায় ‘উপযুক্ত মূল্যায়নে’র আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের হিসাবে, ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় ২৩৪টি পৌরসভার মধ্যে কমপক্ষে অর্ধশত দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। সর্বোচ্চ তিন-চারজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন এমন পৌরসভার সংখ্যা ৮ থেকে ১০টি। বিদ্রোহী প্রার্থীর বিষয়ে হানিফ বলেন, ‘দুই-একটি জায়গায় কৌশলগত কারণে একাধিক প্রার্থী’ রাখা হয়েছে। তবে তিনি এও বলেন, ১৩ ডিসেম্বরের পর কোনো পৌরসভায় বিদ্রোহী প্রার্থী থাকবে না।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts