September 20, 2018

পানি কূটনীতির ফাঁদে বাংলাদেশ

ঢাকাঃ  ভারতের একতরফা পানি কূটনীতির ফাঁদে আটকে আছে যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠক। ছয় বছর অতিক্রম করেছে, এরপরও ভারত জেআরসি’র ফিরতি বৈঠকের দিনক্ষণ জানাতে পারছে না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস অন্তর এই বৈঠক হওয়ার কথা। সর্বশেষ দিল্লিতে ২০১০ সালের মার্চে এই বৈঠক বসেছিল। পরবর্তী বৈঠকের তারিখ চূড়ান্ত করেও ভারতের আপত্তির কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। এতে করে ঝুলে আছে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ইস্যু, তিস্তার পানি চুক্তি, চুক্তি মোতাবেক গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া, সীমান্ত নদীভাঙন প্রতিরোধ কাজ, নদীভাঙনে ওপারে জেগে ওঠা ভূমি ফিরিয়ে আনা, ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ও টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ রাখা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়গুলো। ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব সীমান্ত নদীর অধিকাংশই ভাঙনপ্রবণ।

বর্ষায় পানি বৃদ্ধির সময় একবার এবং পানি নেমে যাওয়ার সময় একবার এসব নদীতে ভাঙন দেখা দেয়। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভাঙনের কারণে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৫০ হাজার একর জমি হারিয়েছে। তবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত জমি হারানোর পরিমাণ ৩০ হাজার একরের বেশি হবে না। জেআরসি’র একাধিক বৈঠকে বাংলাদেশ ওপারে (ভারতীয় অংশে) জেগে ওঠা ভূমি ফিরিয়ে আনার বিষয়টি উত্থাপন করলেও ভারত তা আমলে নেয়নি। এতে করে সুরমা, কুশিয়ারা, আত্রাই, ধরলা, দুধকুমার, মনু, মাতামুহুরি, ইছামতি, কালিন্দী, রায়মঙ্গল, তিস্তা, গোমতি, ফেনী, পুনর্ভবা, মহানন্দা, গঙ্গা (পদ্মা) সহ বিভিন্ন নদী ভাঙনে বাংলাদেশ তার মূল্যবান ভূমি হারাচ্ছে। আর এসব ভূমি জেগে উঠছে ওপারে ভারতীয় অংশে। হারানো এসব ভূমিতে বাংলাদেশের কৃষকরা আবাদের জন্য যেতে চাইলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র বাঁধার কারণে যেতে পারে না।

এতে করে সীমান্ত নদীবর্তী মানুষগুলো ক্রমান্বয়ে নিজেদের বসতবাড়ি, আবাদি জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। ভাসমান মানুষ হিসাবে তারা আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত নদীভাঙন ঠেকাতে তারা কোন কাজ করতে পারছে না। কাজ করতে গেলেই বিএসএফ’র বাঁধার মুখে পড়তে হয়। অথচ ভারতীয় অংশে ঠিক নদীভাঙন কার্যক্রম চলে বছরজুড়েই। তিস্তা, গঙ্গা, কুশিয়ারা, ইছামতি, মহানন্দাসহ বেশ অধিকাংশ সীমান্ত নদীতে ভারত পরিকল্পিতভাবে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের কারণে বাংলাদেশ অংশে ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। জেআরসি’র বৈঠক না হওয়ায় এ বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ কোন আলোচনা করতে পারছে না। এছাড়াও ত্রিশ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ি বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না। চলতি শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে সর্বনিন্ম পানি পেয়েছে। জেআরসি’র তথ্যানুযায়ি, গত ২১ থেকে ৩১ মার্চ ওই দশদিনে ভারত বাংলাদেশকে ১৫ হাজার ৬০৬ কিউসেক পানি দিয়েছে। যা ছিল স্মরণকালের সর্বনিন্ম পানির রেকর্ড।

১৯৯৬ সালে সালে স্বাক্ষরিত ত্রিশ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি চুক্তি অনুযায়ি বাংলাদেশ কেন এত কম পানি পেএ নিয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কিংবা যৌথ নদী কমিশনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি। ভারতের কাছে আপত্তি তোলা হয়নি কেন বাংলাদেশকে এই শুষ্ক মৌসুমে ধারাবাহিকভাবে কম পানি দেয়া হলো। জেআরসি’র তথ্যানুযায়ী, ইতোপূর্বে ২০০৮ সালে ১১ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ওই দশদিনে ফারাক্কা পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশের সর্বনিন্ম পানি পাওয়ার রেকর্ড ছিল ১৭ হাজার ৫১৯ কিউসেক। ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত গঙ্গার পানি আটকে রাখায় পদ্মা অববাহিকার সকল নদ-নদী তার নাব্যতা হারিয়েছে। ষড়ঋতু অনুযায়ী বর্ষা দ্বারপ্রান্তে এসে গেলেও পদ্মা এখনও মরা গাং। এই নদীতে পানি নেই। নদীর বুকে এখন নৌকার পরিবর্তে চলছে ট্রাক। বালুর ব্যবসা চলছে দেদারছে। ভারত গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ১৯৭৫ সাল থেকেই শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার অবস্থা এতটাই করুণ যে, ধু-ধু বালুকারাশি পাড়ি দিয়ে যে পদ্মার দেখা মিলছে তাকে খাল না বলে বড় জোড় ছোট একটি শাখা নদীর সাথেই তুলনা করা যায়।

পদ্মার এই করুণ পরিণতির জন্য দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা ভারতের একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেই দায়ী করছেন। জেআরসি’র ৩৭তম বৈঠকে বাংলাদেশ সমতা, ন্যায়ানুগতা ও পারস্পরিক ক্ষতি না করার নীতির ভিত্তিতে ১৫ বছরের জন্য তিস্তা নদীর একটি অর্ন্তবতীকালীন চুক্তির খসড়া উপস্থাপন করে। তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে ভারতের সাথে অন্তবর্তীকালীন খসড়া চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব রয়েছে তিস্তার ৪০ ভাগ পানি ভারত পাবে এবং ৪০ ভাগ পানি পাবে বাংলাদেশ। আর তিস্তার নাব্যতা রক্ষার জন্য থাকবে বাকি ২০ ভাগ পানি। কিন্ত অদ্যাবধি পর্যন্ত তিস্তা চুক্তির ব্যপারে ভারত উদাসীন। এতে করে এই শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা সেচনির্ভর প্রকল্পে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমিয়ে ১০ হাজার হেক্টরে আনা হয়েছে। এ ব্যাপারে পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, সীমান্ত চুক্তি ভারতের পার্লামেন্টে পাশ হয়েছে। আশা করি তিস্তা নদীর পানি বন্টন নিয়েও ভারতের সাথে চুক্তি সই হবে। তিনি বলেন, জেআরসি’র বৈঠকের তারিখ ঠিক করতে আমরা ভারতকে চিঠি দিয়েছি। আশা করি, সহসাই ভারত এই বৈঠকের দিনক্ষণ আমাদের জানাবে। তিনি স্বীকার করেন যে, জেআরসি’র মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক না বসায় উভয় দেশের অমিমাংসিত অনেক সমস্যা আটকে রয়েছে।

উৎসঃ   ইনকিলাব

Related posts