September 23, 2018

পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কার্যক্রমের বেহাল দশা!

রফিকুল ইসলাম রফিক, নারায়ণগঞ্জঃ  রূপগঞ্জ উপজেলায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থেকে কাঙ্খিত স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট এলাকার সুবিধাভোগীরা। এসব এলাকায় অবস্থিত বেশির ভাগ কেন্দ্র নির্ধারিত সময়ের পর খোলা হয় এবং সময়ের আগের তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, এ উপজেলায় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কার্যক্রমের চরম বেহাল দশা বিরাজ করছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই। জানা যায়, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নাজমুল আনোয়ার নিয়মিত এ অফিস করেন না। বেশির ভাগ সময় তিনি থাকেন বিভিন্ন বেসরকারী ক্লিনিকে। এদিকে, উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ৭ ইউনিয়নের মধ্যে দাউদপুর ও মুড়াপাড়া ইউনিয়নে কোন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নেই।

উপজেলার কায়েতপাড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে ৫টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থাকলেও তাতে চলছে দায়িত্বে অবহেলা, ওষুধপত্র বিতরণে অনিয়ম, ভুয়া কেনাকাটা ও কালোবাজারী ডেলিভারী দেখিয়ে মোটা অংকের সরকারী অর্থ আত্বসাৎসহ ব্যাপক আকারে নানা অনিয়ম। এসব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র গুলোতে জনবলও সংকট রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে রূপগঞ্জ উপজেলায় ৫টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এছাড়া দাউদপুর ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের জন্য ভবন নির্মানের উদ্দেশ্যে অর্থ বরাদ্ধ দেয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ভবন নির্মান না করেই অর্থ উত্তোলন করে পালিয়ে যায় এবং মুড়াপাড়া ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের জন্য ভবন নির্মানের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

কিন্তু এসব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের বিষয়ে স্থানীয় মানুষের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় আশানুরূপ সাড়া জাগাতে পারেনি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ। অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নানা সংকট থাকলেও পর্যাপ্ত ওষুধসহ কাঙ্খিত স্বাস্থ্যসেবা নিয়মিত দেয়া হচ্ছে। দেখা গেছে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র গুলো খোলা থাকার কথা থাকলেও বেশিরভাগ কেন্দ্র গুলো খোলা হয় সাড়ে ১০টায় আর বন্ধ হয়ে যায় ২টার আগেই। তাই অনত্র চিকিৎসা নিতে হয় রোগীদের। এ অবস্থায় প্রতিনিয়ত আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থের পাশাপাশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সকাল ১০টা পর্যন্ত অধিকাংশ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র খোলা হয়নি।

উপজেলার পূর্বগ্রাম এলাকায় অবস্থিত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে অবস্থান করে দেখা গেছে, সকাল ১০টা পর্যন্ত ওই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি  খোলা হয়নি। একটু পরেই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা একজন এসে হাজির হলেন। দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি উপজেলায় মিটিং ছিল তাই আসতে একটু দেরি হয়েছে বলে জানান। উপজেলার পশ্চিমগাঁও এলাকার হনুফা বেগম, দক্ষিনপাড়া এলাকার লতুফা আক্তারসহ অনেকে বলেন, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য সরকার গ্রামে গ্রামে ডাক্তার দিয়েছে। অথচ চিকিৎসা নিতে সাত/আট মাইল পথ পার হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে।’ কেওডালা এলাকার স্বপ্না বেগম বলেন, ‘ডাক্তার বসেন শুনে পূর্বগ্রাম ও রূপসী এলাকায় অবস্থিত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কয়েক দিন থেকে ঘুরছি। অথচ পাঁচ দিন ঘুরেও ডাক্তারের দেখা পাইনি।’

একই ধরনের কথা বলেন, দক্ষিনপাড়া গ্রামের আফিয়া বেগম, পশ্চিমগাঁও এলাকার সূর্য বানুসহ আরও অন্তত ১০ জন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থেকে আমরা তেমন কোন সেবা পাচ্ছি না। দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে রোগীকে নিয়ে আসলেও চা খেতে তাদের পয়সা দিতে হয়। তারপরও আবার সময়মত কেন্দ্র খোলা না পাওয়ায় রোগীকে নিয়ে যেতে হয় অনেক দূরে। এ বিষয়ে কায়েতপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ইনচার্জ জানান, আমাদের কেন্দ্রে সিজারিয়ান কোনো অপারেশন হয় না। আর নির্ধারিত সময়ের আগে কেন্দ্র বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, মিটিংয়ে থাকায় কেন্দ্র বন্ধ ছিল কিন্তু নিয়মিত কেন্দ্র খোলা থাকে। এছাড়া বিনামূল্যে যেসব সেবা প্রদান করার কথা তা আমরা আমাদের সাধ্যমত দিয়ে যাচ্ছি।

আর অন্যান্য কেন্দ্র কর্মকর্তারা কোনো তথ্য না দিয়ে এড়িয়ে যান। সরকারিভাবে উপজেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র গুলো থেকে বিনা মূল্যে গর্ভবতী সেবা, স্বাভাবিক প্রসব সেবা, জটিল প্রসব সেবা, সিজারিয়ান অপারেশন, গর্ভোত্তর সেবা, শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণ ও জন্ম নিয়ন্ত্রক পিল প্রদানসহ মোট ২৭টি সেবা প্রদান করার কথা থাকলেও বেশিরভাগ সেবা থেকে বি ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রোগীদের। এ ব্যাপারে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নাজমুল আনোয়ার তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করলেও সেবা ঘাটতির কথা স্বীকার করে জানান, জনবল সঙ্কটের কারণে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে জনবল বাড়ানো হলে এসব সমস্যা থাকবে না। আর সিজারিয়ান অপারেশনের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসা জরুরি রোগীদের সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য পাঠানো হয় হাসপাতালে। তবে যেসব কেন্দ্র নির্ধারিত সময়ের আগে বন্ধ হয়ে যায় তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/৩ মে ২০১৬

Related posts