November 18, 2018

পদ্মায় পানি না থাকায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে চলছে পিকনিক 

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা পানিচুক্তি ২০ বছরে পা দিয়েছে রোববার। চুক্তির পর থেকে বাংলাদেশ কখনও ন্যায্য হিস্যায় পানি পায়নি। তবু প্রতি বছর চলে চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা। চুক্তি অনুযায়ী পানি না পাওয়ায় এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা শুকিয়ে খালে পরিণত হয়েছে। বুকজুড়ে শুধু ধু-ধু বালুচর। রোববার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পাকশির হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মা নদীর বুকজুড়ে ধু-ধু বালুচর। রেল সেতু ও সড়ক সেতুর নিচে চাষাবাদ হচ্ছে। নদীর পানি প্রবাহ একেবারেই স্থির। অন্যদিকে পাবনা শহর থেকে দক্ষিণে ছয় কিলোমিটার দূরে পদ্মার বাম তীর। এখান থেকে পদ্মার ওপারে বিশ্ব কবি রবি ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ী। নদী এখানে শুকিয়ে খালে পরিণত হয়েছে। নদীর বুক চিরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার শুধু ধু-ধু বালুচর। এক সময়ের প্রমত্তা নদীর বালুচরেই এখন ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ নদী পারাপার হচ্ছে।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের হায়দারাবাদ হাউসে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি পানিচুক্তি স্বাক্ষর হয়। ১৯৯৭ সালে ১ জানুয়ারি থেকে দুই দেশের মধ্যে ভারতের অংশে গঙ্গা নদীর পানি ভাগাভাগি চুক্তি কার্যকর হয়। বাংলাদেশের পক্ষে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের পক্ষে সে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমের ৫ মাস অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত এ চুক্তি কার্যকর হবে। পাবনার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানির প্রবাহ পরিমাপ করে দুই দেশের প্রকৌশলী ও পানি বিশেজ্ঞরা প্রতি মাসে ৩ দফা অর্থাৎ ১০ দিন পরপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি প্রবাহের পরিমাপ রেকর্ড করে তা যৌথ নদী কমিশনের কাছে উপস্থাপন করে। চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদের ২ নম্বর ধারায় ৪০ বছরে (১৯৪৯-৮৮) পানি প্রবাহের গড় ভিত্তিতে একটি শিডিউল নির্ধারণ করা হয়েছে।

সেই শিডিউল অনুযায়ী ১ থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের পানি পাওয়ার কথা গড়ে ৬৭ হাজার ৫১৬ কিউসেক। এ কার্যক্রম ৩১ মে পর্যন্ত চলবে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের মধ্যে অবস্থিত গঙ্গানদীর ওপর ফারাক্কা পয়েন্টে ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলকভাবে ভারত চালু করে। আর তখন থেকেই বাংলাদেশের পদ্মা নদীর এ করুণদশা। সে সময় দুই দেশের মধ্যে পানি চুক্তির এক সমঝোতা স্বাক্ষরে গঙ্গার ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি প্রত্যারের অনুমতি পায়। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর তৎকালীন সরকার শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে মে) গঙ্গানদীর পানি প্রবাহ বিষয়ে ৫ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তিতে ২১ থেকে ৩০ এপ্রিল ১০ দিন ভারত ফারাক্কার বিকল্প খাল দিয়ে কলকাতা বন্দরের জন্য ২০ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের জন্য ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি বরাদ্দ করা হয়। এ চুক্তিতে গঙ্গানদীর পানি প্রবাহের নূ্যনতম শতকরা ৮০ ভাগ প্রদানের অঙ্গীকার করা হয়। ওই চুক্তিতে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যুক্ত কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন ভিন্ন মত ও প্রস্তাব থাকায় কোনো দেশই এ ব্যাপারে একমত হতে পারে না। ফলে ১৯৭৭ সালের পানি চুক্তি ১৯৮২ সালের নভেম্বরের পর আর নবায়ন হয়নি। এরপর ৪র্থ পর্যায়ে ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালের শুষ্ক মৌসুমের পানি বণ্টনের জন্য ১৯৮২ সালের অক্টোবর মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মাারক (মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং-১৯৮২) স্বাক্ষরিত হয়।

কিন্তু অনুযায়ী পদ্মা নদীতে কাঙ্ক্ষিত পানি না আসায় বাংলাদেশের ওপর ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব পড়ে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য মিঠা পানির প্রধান উৎস এবং পদ্মার প্রধান শাখা গড়াই নদী শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, পদ্মা শুকিয়ে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। পদ্মার সঙ্গে সংযোগকারী অন্যান্য নদীও শুকিয়ে যাওয়ায় দেশের পদ্মা নদী প্রবাহিত এলাকার দুইপাশের জেলাতে সেচনির্ভর কৃষি ফসল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরিবেশসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। গঙ্গা নদী থেকে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে ইতিহাসের সর্বনিম্ন (৯ হাজার ২১৮ কিউসেক ) পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়। অথচ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতীত রেকর্ড থেকে জানা যায়, এ সময়ে এ পয়েন্টে সর্বনিম্ন প্রবাহ থাকে কমপক্ষে ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার কিউসেক।

এ অবস্থায় ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত ৩০ বছর মেয়াদি পানি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ মে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গা নদীর পানি ভাগাভাগি হয়ে আসছে। কিন্তু এ চুক্তি নিয়ে রয়েছে দেশের পানি বিশেষজ্ঞদের নানা প্রশ্ন।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts