November 18, 2018

পথ শিশুদের জন্য সংবাদপত্র ‘বালকনামা’

১৭ বছর বয়েসী কিশোর বিকাশ কুমারকে জীবনে যত ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে সেটা অন্য অনেক কিশোরের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব না। বাবা-মার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মাত্র ৯ বছর বয়সে সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। এরপর কয়েক বছর কেটে গিয়েছিল উচ্ছন্নের মত। এই সময়টা সে স্থানীয় একটি ট্রেন ষ্টেশনে ন্যাকড়া কুড়ানির কাজ করতো। বেঁচে থাকার আশায় হতাশাচ্ছন্ন কিশোর বিকাশ খুব সহজেই আসক্ত হয়ে পড়েছিল মাদকে এবং ভাগ্যগুণে একসময় মাদক মুক্তও হতে পেরেছিল। ৮ বছর গৃহহীন এবং নিপীড়িত জীবন কাটানোর পর বিকাশ হারিয়ে যায়নি অন্ধকারে বরং সে খুঁজে পেয়েছে সুস্থ জীবনের পথ। বর্তমানে সে একজন সাংবাদিক। পথ শিশুদের জন্য ভারতে যে একটি মাত্র সংবাদপত্র রয়েছে বিকাশ সেই পত্রিকার সাংবাদিক। কারণ পথ শিশুদের দুর্দশার খবর তার থেকে ভালো আর কে জানবে। সে নিজেই তো ছিল পথ শিশু।

ভারতের এই ব্যতিক্রমি সংবাদপত্রটির নাম ‘বালকনামা’ অর্থাৎ শিশুদের কণ্ঠস্বর। এই সংবাদপত্রের সাথে অন্যগুলোর কোনো মিল নেই। যে সমস্ত শিশুরা রাস্তায় জীবনযাপন করে তারাই এটি পরিচালনা করে। পত্রিকাটিতে শিশুশ্রম, বাল্য বিবাহ, যৌন নির্যাতন এবং ভারতের অসংখ্য বস্তিবাসী শিশুদের সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়।

পত্রিকাটির ব্যাপারে বিকাশ বলেছে, ‘যদি কোনো বলিউড অভিনেতার কুকুর আহত হয়, অমনি সবগুলো সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেল সেটা ফলাও করে প্রকাশ করে। কিন্তু যখন রেল ষ্টেশনে কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় একজন পথ শিশু মারা যায় তখন তাতে কারো মাথা ব্যাথা নেই। এই পত্রিকার মাধ্যমে আমরা চাই এই সমস্ত শিশুদের কথা তুলে ধরতে। আমরা চাই আর সমস্ত নাগরিকের মত তাদেরকেও যাতে মানুষ সমান চোখে দেখাতে পারে এবং তাদের কণ্ঠস্বর যেন মানুষ শুনতে পারে।’

বালকনামা নামের এই ব্যতিক্রমি পত্রিকা দিল্লিতে প্রথম চালু হয়েছে ২০০৩ সালে। শুরুতে তাদের সংবাদদাতা ছিল মাত্র ৩৫ জন। কিন্তু এটি এখন ভারতের সাতটা বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রায় ১ হাজার সাংবাদিক কাজ করছেন এখানে। বর্তমানে তাদের পাঠকের সংখ্যাও ২০ হাজারের উপরে।

দিল্লির একটি স্থানীয় এনজিও ‘চেতনা’ পৃষ্টপোষকতা করায় বিকাশের মত আরো অনেক পথ শিশু খুঁজে পেয়েছে জীবনের একটি উদ্দেশ্য। একত্রে তারা সবাই সংগ্রাম করছে মানবাধিকার নিয়ে।

শান্নু নামের একজন কিশোরী একসময় বালকনামার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে সে উপদেষ্টা। শান্নু বলেছেন, ‘চেতনা এনজিওর সমর্থিত কর্মীদের সাথে প্রথম সাক্ষাত করার সময় মনে করেছিলাম আমিই বোধ হয় এখানে একমাত্র শিশু যে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত। কিন্তু কাজ করার সময় আমি আবস্কার করেছি আরো অনেক শিশু একই সমস্যায় ভুগছে।’

শান্নু বলেন, ‘বালকনামার মাধ্যম দিয়েই আমি আমার অধিকার সম্বন্ধে প্রথম সচেতন হয়েছি এবং নিজের ভেতরে পেয়েছি নেতৃত্বের ক্ষমতা।’

৮ পাতার এই সংবাদপত্রটিতে ভারতের দিল্লি, নদিয়া, মাথুরা, ঝাঁসি, গোয়ালর এবং আগ্রাসহ অন্যান্য শহরের বিভিন্ন ধরনের সংবাদ এবং গল্প ছাপা হয়। শান্নু বলেন, ‘এতো সব সংবাদের মধ্যে কোনগুলোকে প্রথম পাতায় দেয়া যায় সেজন্য প্রত্যেক সম্পাদকীয় বৈঠকে আমরা নিজেদের মধ্যে একরকম যুদ্ধ করি। আমাদের সাংবাদিকেরা একটা ভালো সংবাদের জন্য অত্যন্ত পরিশ্রম করে।’ যেমন, একটা সংবাদের গল্প ছিল- উত্তর ভারতের পথ শিশুরা কিভাবে তীব্র শীতের মধ্যেও উষ্ণ থাকতে পারবে তার উপরে।

‘শীতকালে কিভাবে উষ্ণ থাকা যায় সে ব্যাপারে প্রধান প্রধান সংবাদ মাধ্যমগুলোতে আমরা অনেক খবর দেখি, কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে সেখানে পথ শিশুদের ব্যাপারে কিছু থাকেনা, বিশেষ করে যারা রাস্তায় কিংবা ব্রিজের নিচে বসবাস করে। কাজেই আমাদের পত্রিকাতে আমরা এই সমস্ত দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’

‘এছাড়া অনাথ বস্তি শিশুদের উপর আমাদের তৈরি করা গল্প টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হয়েছিল এবং সেই সাথে তারা আমাদের উপরেও একটা প্রামাণ্য চিত্র ধারণ করে সেটা প্রচার করে।’

সবশেষে শান্নু বলেন, ‘পথ শিশুরা এমনিতেই নিপীড়িত। তারা তাদের ক্ষুদ্র জীবনে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু যখন দেখি আমাদের বলা গল্প মানুষ জানছে, তখন মনে হয় আমরাও সমাজে একটা পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখি। আমরা পথ শিশু হতে পারি কিন্তু আমাদের ও একটা মতামত আছে।’

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদী/ডেরি

Related posts