September 21, 2018

নোবেল সম্মেলন ভেস্তে যাবার নেপথ্য দুই বাঙালির সততার প্রশংসা মার্কিন মিডিয়ায়

হাকিকুল ইসলাম খোকন, নিউইয়ক সংবাদদাতাঃ  শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে জীবিত ৩৩ জনের ২৬জনকে নিয়ে গত বছর আটলান্টায় যে সম্মেলন হবার কথা ছিল, তা ভেস্তে যাবার নেপথ্যে বর্ণ-বিদ্বেষমূলক আচরণ এবং আর্থিক ফায়দা হাছিলের মতলববাজি মূল কারণ বলে মার্কিন মিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছর নভেম্বরের ১৫ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত আটলান্টায় এ সম্মেলন হবার কথা এবং হোস্ট সংগঠন ছিল ‘ইউনূস ক্রিয়েটিভ ল্যাব’ নামক সেবামূলক একটি অলাভজনক সংস্থা। এ সংস্থার নেতৃত্বে রয়েছেন দুই বাংলাদেশী-আমেরিকান ড. মোহাম্মদ ভূইয়া এবং তার স্ত্রী শামীমা আমিন। ‘ইউনূস ক্রিয়েটিভ ল্যাব’র পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসও ছিলেন। সে কারণেই সংস্থাটি হোস্ট হতে সক্ষম হয় এবং ২০১৩ সালে এ সিদ্ধান্ত হবার পর আটলান্টা সিটি মেয়র কাসিম রিডও উল্লাস প্রকাশ করে সাংগঠনিক কাজে সম্পৃক্ত হন। অথচ পরবর্তীতে এই মেয়রের আপত্তির কারণেই সে সম্মেলন ভেস্তে যায়। সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছে স্পেনের বার্সিলোনায় ক্যাটালোনিয়া সিটিতে গত ১৩-১৫ নভেম্বর। সে সম্মেলনে অবশ্য ড. মুহস্মদ ইউনূস অংশ নেননি সম্মেলন সচিবালয়ের সাথে তিক্ত সম্পর্কের কারণে।

আটলান্টাস্থ সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন দৈনিক ‘দ্য আটলান্টা জার্নাল-কন্সটিটিউশন’-এর প্রথম পাতায় ২৮ এপ্রিল সর্বপ্রথম ‘পীচ সামিট ফিয়াস্কো-ফেইল্ড নোবেল সামিট গিভস রিফান্ড’ শীর্ষক সংবাদ ছাপা হয়। এ সংবাদে উঠে আসে সম্মেলনের বাংলাদেশী আয়োজকদের সততা ও একাগ্রতার তথ্য। এর আগে এই পত্রিকাসহ স্থানীয় প্রধান প্রধান টিভিতে সিটি মেয়রের সাফাই গেয়ে বেশ কটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। আটলান্টা জার্নালের পর ৫ মে ‘দ্য তাস্কেজী নিউজ’ প্রকাশ করে ‘ভূইয়া ওয়ান্টস স্টোরি টোল্ড এবাউট সামিট ফেইল্যুর’ শিরোনামে। ১১ মে ‘নর্থসাইড নেইবোর’ আরো বেশী তথ্যসহ ‘অর্গানাইজার : নো ফান্ডস ওয়েন্ট টু হিম ; মানিজ মোস্টলি রিফান্ডেড’ শিরোনামে আরেকটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। আটলান্টার টিভি ও দৈনিকসমূহে ফলাও করে প্রকাশিত সংবাদে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের নেপথ্য কাহিনী উপস্থাপিত হয়েছে। বিস্তারিত ডক্যুমেন্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এসব দৈনিক বলেছে, হোস্ট কমিটির প্রধান ড. মোহাম্মদ ভূইয়া এবং তার স্ত্রী শামীমা আমিন টানা দুই বছর এই সম্মেলন আয়োজনে সচেষ্ট ছিলেন।

প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠন করেন। এ সম্মেলনের স্বার্থে তারা উভয়ে নিজ নিজ চাকরি থেকে বেতনহীন ছুটি নেন। মার্কিন মিডিয়াগুলো আরো উল্লেখ করেছে যে, ‘সম্মেলনের সকল কাজকর্মের দায়িত্ব প্রদান করা হয় প্রচলিত রীতি অনুযায়ী। আয়-ব্যয়ের হিসাব মনিটরিংয়ের জন্যে একটি ল’ ফার্ম এবং হিসাব রক্ষকারী ফার্ম ভাড়া করা হয়। ‘ইভেন্ট প্ল্যানার’ নিয়োগ করা হয় হোস্ট কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গোপন টেন্ডারে।’ প্রকাশিত ঐসব সংবাদে আরো বলা হয়েছে যে, তহবিল গঠনের পর্ব যখন প্রায় চূড়ান্ত এবং অনেকে মোটা অংকের অর্থ প্রদানের বিনিময়ে স্পন্সরশীপ গ্রহণে আগ্রহী হয়, ঠিক তেমনি সময়ে আটলান্টার মেয়র রিড তার এক বন্ধুকে ‘ইভেন্ট প্ল্যানার’ হিসেবে নিয়োগের জন্যে মো. ভূইয়াকে অনুরোধ করেন। সে অনুরোধ রক্ষায় সক্ষম হননি মো. ভূইয়া। কারণ, ইতিমধ্যেই প্রচলিত রীতি অনুযায়ী একজনকে ঐ কাজে নিয়োগ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মো. ভূইয়া।

অপরদিকে, ২০১৪ সালের জুলাই মাসে এই সম্মেলনের স্থায়ী সচিবালয় কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাৎ করে প্রস্তুতির সর্বশেষ অবস্থা অবহিত করতে ইটালির রোমে যান মোহাম্মদ ভূইয়া এবং শামীমা আমিন। সে সময় সচিবালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট এঞ্জো কারসিয়ো তাদেরকে জানান যে, মাজেদা মটর কোম্পানীকে লীড স্পন্সর হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে হবে। এর বিনিময়ে তাদের কাছে কোন অর্থ নেয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেন কারসিয়ো। এমন কথায় চমকে উঠেন মোহাম্মদ ভূইয়া। তিনি সরাসরি নাকচ করে তাকে জানান যে, অর্থ ব্যতিত কাউকেই স্পন্সরের তালিকাভুক্ত করা সম্ভব নয়। এ কথা শুনে ক্ষেপে যান কারসিয়ো।

মার্কিন দৈনিসমূহে বলা হয়েছে, এক পর্যায়ে আটলান্টার মেয়র এবং সচিবালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোট বেঁধে উঠে পড়ে লাগেন মোহাম্মদ ভূইয়ার বিরুদ্ধে এবং হোস্ট হিসেবে তাকে না সরালে এই সিটি ঐ সম্মেলনের সকল কিছু থেকে নাম গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যেই যারা সম্মেলনের জন্যে তহবিল দিয়েছিলেন তাদেরকেও সিটি মেয়র চিঠি দিয়ে তাদের সম্পৃক্ততা প্রত্যাহারের আহবান জানান। মিডিয়ায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘শান্তিতে নোবেল বিজয়ীদের আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনের হোস্ট কমিটির প্রধান হিসেবে যাকে নিযুক্ত করা হয়েছে, তার সাথে আটলান্টার মিল হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গটির অবতারণা করা হয়, মোহাম্মদ ভূইয়া এবং তার স্ত্রী বাংলাদেশী ও মুসলমান বলে।’ এ ধরনের বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্যের পর মোহাম্মদ ভূইয়া বলেছিলেন, ‘আমার মত চেহারার লোক হচ্ছেন ড. মুহম্মদ ইউনূস। আমার মতোই ছিলেন মানবাধিকার নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। এই আটলান্টা হচ্ছে বর্ণবিদ্বেষ অবসান আন্দোলনের তীর্থস্থান।’

প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ড. মোহাম্মদ ভূইয়া এবং তার স্ত্রী শামীমা আমিন উচ্চ বেতনে চাকরি করতেন তাসকেজী ইউনিভার্সিটিতে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্টের চীফ অব স্টাফ ছিলেন শামীমা এবং মোহাম্মদ ভূইয়া শিক্ষকতার পাশাপাশি ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সম্মেলনের কারণে তারা সেখান থেকে ছুটি নেন। অর্থাৎ কর্মস্থলের বেতন পাননি। এদিকে সম্মেলনের সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবেও কিছু নেননি।’

মিডিয়াগুলোতে মোহাম্মদ ভূইয়ার নেতৃত্বাধীন ইউনূস ক্রিয়েটিভ ল্যাবের অপর কর্মকর্তাগণের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ‘আটলান্টার মেয়রের ব্যক্তিগত বন্ধু এবং শিকাগোস্থ জেসকুলকা টারমেন স্ট্যাটেজিক কম্যুনিকেশনের কর্মকর্তা রীক জেসকুলকাকে ইভেন্ট প্ল্যানার নিয়োগ না করার জন্যেই মেয়র ক্ষেপে যান। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ ভূইয়া অভিযোগ করেছেন যে, ইভেন্ট প্ল্যানারের সাথে আর্থিক স্বার্থ ছিল সিটি মেয়রের।’

প্রকাশিত সংবাদগুলোতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সম্মেলনের জন্যে যে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের কাছে স্পন্সরশীপের অর্থ নেয়া হয়েছিল তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফেরৎ দেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র আটলান্টা এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ ২৫ হাজার ডলারের চেক গ্রহণ করেনি। কারণ, এটি হচ্ছে সিটি মেয়রের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি সংস্থা। মেয়র গ্রীণ সিগন্যাল দিলেই তারা ঐ চেক নেবে। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ ভূইয়া ১৭ মে মঙ্গলবার বলেছেন, ‘সিটি মেয়র প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা ব্যতিত ঐ ২৫ হাজার ডলার ল’ ফার্মের কাছেই থাকবে।’

জানা গেছে, সম্মেলন আয়োজনের মূল দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অসততার অভিযোগ উত্থাপনের সংবাদ মিডিয়ায় আসার পর বিব্রতবোধ করেন ইউনূস ক্রিয়েটিভ ল্যাবের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইইনূস। এ প্রসঙ্গে এই ল্যাবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ ভূইয়া এ সংবাদাতাকে বলেন, ‘দুটি কারণে তিনি নিজের সম্পৃক্ততা ছিন্ন করেন। প্রথমটি হচ্ছে, রোম সচিবালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট এঞ্জো কারসিয়োকে ড. ইউনূস অনুরোধ করেছিলেন আমার সাথে সমঝোতার মাধ্যমে সম্মেলনের যাবতীয় কাজে সহায়তার জন্যে। সে অনুরোধে সাড়া না দেয়ায় মনক্ষুন্ন হন ড. ইউনূস। এমনি অবস্থায় বাংলাদেশের মিডিয়াতেও তাকে ঘিরে নেতিবাচক সংবাদ আসছে দেখে তিনি চেয়ারম্যানের পদ ত্যাগ করেছেন।’

শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিদের এ সম্মেলনের হোস্ট হবার মধ্যে গৌরবের যে ব্যাপার ছিল তা আটলান্টা সিটি মেয়রের বদ-মানসিকতার কারণে নস্যাৎ হয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ড. মুহম্মদ ভূইয়া এ সংবাদাতাকে বলেন, ‘আমি এবং আমার স্ত্রী সবসময় সততা, আত্মমর্যাদা, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী। অন্যের অপকারেও আমরা কৃপণতা করি না। আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে, অন্যায়ভাবে একজনকে ইভেন্ট প্ল্যানার হিসেবে নিয়োগ না করার জন্যে এমন একটি সম্মেলন থেকে আটলান্টা সিটি বঞ্চিত হবে। কারণ, ১৯৯৬ সালে অলিম্পিকের পর এই সিটিতে আর কোন আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়নি।’

ঢাকার সন্তান মোহাম্মদ ভূইয়া উল্লেখ করেন, ‘আমরা আরো অত্যন্ত খুশী যে, সম্মেলনের জন্যে পাওয়া সমূদয় অর্থ সংশ্লিষ্ট সকলকে কড়ায়-গন্ডায় ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। আটলান্টা মেয়র একমাত্র ব্যক্তি যিনি এয়ারপোর্টের কাছে থেকে নেয়া ২৫ হাজার ডলার ফিরিয়ে নিতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আর এটি তিনি করছেন, নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া বিষয়টিকে জিইয়ে রাখার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের মতলবে।’

‘বাংলাদেশী-আমেরিকান হিসেবে আমি এবং আমার স্ত্রী অত্যন্ত গৌরববোধ করছি যে, আমরা কোন অন্যায়, অনৈতিক চাপে মাথানত করিনি। এমনকি বেআইনী কোন চাপ অথবা বর্নবিদ্বেষমূলক আচরণকেও প্রশ্রয় দেইনি। আমরা শুরু থেকেই ন্যায় ও সত্যের পক্ষে ছিলাম’-বলেন মোহাম্মদ ভূইয়া।

মোহাম্মদ ভূইয়া জানান যে, আগামী বছরের এপ্রিল মাসের ২১ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত ৪দিনব্যাপী ‘গ্লোবাল সামিট অন হেল্থ-টেকনোলজি এ্যান্ড এডুকেশন’ অনুষ্ঠিত হবে আটলান্টা সিটিতে। এ উপলক্ষে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। সে সম্মেলনে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিরা আসবেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরাও থাকবে বিভিন্ন পর্বে।

Related posts