September 26, 2018

নেশায় ভ্রষ্ট পথশিশুসহ ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থীরা!

111
আলম শাইন

সম্প্রতি আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে, ‘শিশুরা রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার’ শিরোনামে। লেখাপাঠে পাঠক তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন মাধ্যমে। গঠনমূলক সমালোচনার মধ্য দিয়ে পাঠক তাদের মতামত পেশ করেছেন। তন্মধ্যে ঘনিষ্টদের একজন পরামর্শ দিয়েছেন, জামায়েত-শিবির নিয়ে কিছু না লিখতে। তিনি সাফসাফ জানিয়েছেন, আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জাতীয়পার্টি নিয়ে লেখা যাবে কিন্ত জামায়েত-শিবির নিয়ে লেখা যাবে না। যুক্তি দেখিয়েছেন, ওরা প্রতিশোধ পরায়ন। যে কোন  সময় রক্তারক্তি কান্ড ঘটিয়ে দিতে পারে। হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়া ওদের পুরনো অভ্যাস, কাজেই সাবধান হতে হবে। জানিনা এ কেমন ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে রাজনীতি করছে দলটি! মানুষ জবাই করতে বোধে বাধে না কেন তাদের তা বোধগম্য নয় আমার। যে এলাকার ঘটনা পূর্ব প্রকাশিত লেখায় স্থান পেয়েছে, সেখানে মাঝেমধ্যে অমনটি ঘটে বিধায় তিনি আমাকে সতর্ক করেছেন। ভদ্রলোক তৎসঙ্গে আরো জানিয়েছেন যে, ‘আমাদের দেশের রেওয়াজই এমন। সব দলই আজকাল শিশুদেরকে রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবহার করছে, কাজেই নিদৃষ্ট কোন দলের কথা না বলাই শ্রেয়’।

সেই উক্তির রেশ ধরেই বলছি, আসুন আমরা শিশুদেরকে শিশুর মতোই গড়ে তুলি। কোন দলেই যেন এরা ঠাঁই না পায় সে দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখি। সজাগ দৃষ্টি রাখি পথশিশুরা যেন বিপদগামী না হয় সে দিকটায়। কারন আমাদের দেশের পথশিশুরা শুধু রাজনৈতিক সহিংসতায়ই ব্যবহার হচ্ছে না, ব্যবহার হচ্ছে মাদক পাচারের কাজেও, এবং নিজেরাও জড়িয়ে পড়ছে মাদকের ভয়ঙ্কর জালে। জানা যায়, মাদক ব্যবসায়ীরা নিরাপদ ভেবে পথশিশুদেরকে মাদক পাচারে ব্যবহার করছে। তার আগে অবশ্য ওদেরকে মাদকাসক্ত করে তুলছে মাদক ব্যবসায়ীরাই।

সম্প্রতি খবরের কাগজের এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানা গেছে, ‘আইসিডিডিআরবি’ ও বেসরকারি সংস্থা ‘মোস্ট অ্যাট রিস্ক অ্যাডোলেসেন্ট’ (এমএআরএ)-এর ২০১২ সালের তথ্য মোতাবেক বাংলাদেশের মোট পথশিশুর সংখ্যা ৪ লাখ ৪৫ হাজার। তন্মধ্যে রাজধানীতে রয়েছে ৩ লাখেরও বেশি পথশিশু। এদের বেশি সংখ্যকই মাদকাসক্ত।  প্রায় ৪৪ ভাগ পথশিশু মাদক গ্রহণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত। ৩৫ শতাংশ পথশিশু পিকেটিং এবং বোমাবাজির সঙ্গে জড়িত। বাকি ২১ শতাংশ পথশিশু ছিনতাই ও আন্ডারগ্রাউন্ডের সন্ত্রাসীদের সোর্স হিসাবে কাজ করছে এবং অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। জড়িত হচ্ছে ছিঁচকে চুরির সঙ্গেও।

অপরদিকে ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’ এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে, রাজধানীর ৮৫ শতাংশ পথশিশু কোন না কোন ধরনের মাদক গ্রহনের সঙ্গে জড়িত। আরেক পরিসংখ্যানে সংস্থাটি জানিয়েছে, রাজধানীতে মাদক সেবীদের ২২৯টি স্পট রয়েছে। সে তথ্য মোতাবেক জানা যায়, রাজধানীর সদরঘাট ল  টার্মিনাল, চাঁনখারপুল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, হাইকোর্ট প্রাঙ্গন, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম চত্বর, কমলাপুর রেল স্টেশন, সায়েদাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনালসহ অন্যান্য স্থানে অবাধে হেরোইন, গাঁজা, ঘুমের ওষুধসহ নানা ধরনের মাদক গ্রহন করছে পথশিশুরা।

সমীক্ষায় জানা যায়, পথশিশুরা মাদকাসক্ত হওয়ার মূল কারন অবিভাবকত্বহীনতা। এ ছাড়াও দারিদ্রতার অজুহাতে পথশিশুদেরকে নামতে হয় উপার্জনের পথে। উপার্জনের হাতেখড়ি হয় পুরনো কাগজপত্র সংগ্রহ এবং বোতল বা প্লাস্টিক সামগ্রী সংগ্রহের মাধ্যমে। ফেলে দেয়া নানা সামগ্রী কুড়াতে গিয়ে এরা প্রথমে নেশার রাজ্যে পা রাখে।  দেখা যায় ভাঙ্গারি দব্যাদি কুড়াতে গিয়ে সাক্ষাত মিলে কোন মাদকসেবীর সঙ্গে।

ওরা মাদক গ্রহনের পর অবশিষ্ট অংশটুকু বাড়িয়ে দেয় শিশুটির দিকে। আবার অনেক মাদক ব্যবসায়ীরা আছে এদেরকে খুঁজে বের করে একটু-আধটু নেশাজাতীয় সামগ্রী হাতে ধরিয়ে দেয়, শিখিয়ে দেয় ব্যবহার পদ্ধতিও। ব্যস্  শুরু হয়ে গেল ওদের নেশার রাজ্যে পদচারণা। নেশায় তাড়িত হয়ে শিশুরা তখন মাদক ব্যবসায়ীর কথায় ওঠবস করতে আরম্ভ করে। এ সুযোগে ওদের ময়লা-আবর্জনার ব্যাগে নেশাজাতীয় দ্রবাদি ঢুকিয়ে যথাস্থানে পৌঁছে দিতে হুকুম করে। এভাবেই পথশিশুরা একদিন হয়ে ওঠে তুখোড় নেশারু।

সমীক্ষায় জানা যায়, পথশিশুদের পরেই রাজধানীতে মাদকাসক্ত হচ্ছে বেশি ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থীরা। বাবার অগাধ অর্থ-কড়ি নাশের মোক্ষমস্থান হিসাবে বেছে নেয় এরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসকে। এখানকার মাদকসেবীরা ‘মডার্ণ স্টুডেন্ট’ হিসাবে পরিচিত। নেশাজাতীয় দ্রবাদির সঙ্গে জড়িত হতে না পারলে বন্ধুদের কাছে যেন ওদের মান-ই থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে ভালো ছাত্রটিকেও ভিড়তে হয় নেশারুদের দলে। এতদস্থানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু ছাত্রই নয় ছাত্রীরাও সামান তালে এগিয়ে আছে। এদের বেশির ভাগই ইয়াবাসেবীর দলভূক্ত। কেউ কেউ গাঁজা, হেরোইন চর্চাও করে।

চিত্রটি তুলে ধরার পেছনে আমাদের কোন অসৎ উদ্দেশ্য নেই। নেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজকে হেয় করার অভিপ্রায়। এ নিবন্ধন লেখার মূল উদ্দেশ্যটি হচ্ছে অবিভাবকদেরকে সচেতন করা। কারন আমাদের অবিভাবকরা এখন অনেকটাই সন্তাননির্ভর হয়ে পড়েছেন। সন্তানের কথায় ওঠবস করাটকে আভিজাত্য হিসাবে দেখছেন। কাড়িকাড়ি কড়ি সন্তানের হাতে তুলে দিতে না পারলে যেন তাদের স্বস্তি নেই। হাত নিশপিষ করে। এ ধরনের মহান অবিভাবকদের কল্যাণেই ‘ঐশী’র জন্ম। এটা আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে, ঐশীকে তার মা-বাবার হন্তারক হতে সাহায্য করেছে নিজের মা-বাবাই। সুতরাং বোধকরছি এ বিষয়ে আর তেমন কিছু বলার নেই আমাদের। শুধু এটুকুই বলার আছে, মর্মন্ত‘দ এ ঘটনার যেন পুনরাবত্তি না হয় দেশে তার প্রতি  সচেষ্ট হবেন।

লেখক: আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।

Related posts