September 26, 2018

নেপালের নয়া প্রধানমন্ত্রী, আসলেই কি ভারতের বন্ধু?

 

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কঃ নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পেরিয়ে একটি স্থিতিশীল জায়গায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে নেপাল। দেশটির ২৬ বছরের বহুদলীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২৪তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বুধবার পার্লামেন্ট মাওবাদী নেতা পুষ্প কমল দহলকে নির্বাচিত করেছে। এর আগে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত নেপালে সশস্ত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রচণ্ড। ২০০৭ সালে একটি শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরে আসে তার দল।

২০০৮-২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন প্রচণ্ড। এবার আবারো দায়িত্ব পেয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি অলির পদত্যাগের এক সপ্তাহের মাথায় দায়িত্ব পেলেন প্রচণ্ড। দীর্ঘদিনের অস্থিতিশীল নেপালে শান্তি ফিরিয়ে আনার দায়িত্বটাও এখন তার। এক্ষেত্রে শক্তিধর প্রতিবেশি এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভারত। কারণ ভারতের সঙ্গে প্রচণ্ডের সম্পর্কের সমীকরণটা একটু জটিল। তবে বেশ পুরনো।

১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত নেপালে গৃহযুদ্ধ চলার পুরো সময়টাই ভারতে কাটিয়েছেন প্রচণ্ড। নেপালের মাওবাদী নেতাদের জন্য ভারত ছিল নিরাপদ স্বর্গ। এই সময়ে তারা শুধু নিজ দেশের আন্দোলন নিয়েই মাথা ঘামিয়েছে। ভারত সরকারকে কখনোই বৈরী করে তুলতে চায়নি নেপালি মাওবাদীরা। ভারতের সঙ্গে প্রচণ্ডের সম্পর্কের কিছু প্রধান দিক এখানে তুলে ধরা হলো:

১. নেপালে অবস্থানকালে ভারতের তৎকালীন বিজেপি সরকারকে চিঠি দিয়ে নেপালের মাওবাদী আন্দোলনের পক্ষে নৈতিক সমর্থন চান প্রচণ্ড। সেইসঙ্গে দিল্লির সাথে আন্তরিক সম্পর্কের ইচ্ছাও ব্যক্ত করেন তিনি। ভারত নেপালের মাওবাদীদের কাজে লাগিয়ে নিজ দেশের মাওবাদী বিদ্রোহীদের হাতে আনার কথা ভেবে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। এমনকি সাত দলীয় জোটের সঙ্গে প্রচণ্ডের ১২ দফা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয় নেপালে। অনেকে এই চুক্তিকে রাজতন্ত্র থেকে নেপালের বহুদলীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের ভিত্তি মনে করেন।

২. ২০০৭ সালের শান্তি চুক্তি অনুসারে ১২ দফার আলোকে একটি নির্বাচন হয় নেপালে। এই সময়ে দেশের সবচে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে মাওবাদীরা। ২০০৮-০৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন প্রচণ্ড। ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং কূটনীতিবিদদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি।

তবে নেপালের চিরাচরিত প্রথা ভঙ্গ করে প্রথম ভারত সফর না করে প্রচণ্ড যান চীনে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ভারত। এরপরে প্রচণ্ডের আরো কিছু পদক্ষেপও ভালোভাবে নেয়নি ভারত সরকার। ভারতের সঙ্গে সব ধরনের চুক্তি বাতিল অথবা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভারত-নেপাল সম্পর্ক সবচে নিচুস্তরে নেমে আসে। এরপর দেশটির সেনাপ্রধানকে বরখান্ত করতে প্রচণ্ডের সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে ভারত। সম্পর্ক জটিল রূপ ধারণ করে। এক পর্যায়ে পদত্যাগ করেন প্রচণ্ড। এজন্য তিনি দোষারোপ করেন ভারতকে।

৩. প্রচণ্ডের জায়গায় আসেন আরেক বাম নেতা মাধব নেপাল। এই ঘটনার পেছেনে ভারতের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে দাবি করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রচণ্ড। তখন ‘আমরা মালিকের সঙ্গে কথা বলবো, চাকরদের সঙ্গে নয়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরো খারাপ হয় প্রচণ্ডের। জাতীয় সার্বভৌমত্বের ইস্যু তুলে প্রচণ্ড জানান, তিনি কখনোই ভারতের সামনে তার মাথা নত করবেন না।

৪. এরপর প্রতিবারই চীনের দিকে ঝুঁকেছেন প্রচণ্ড। ধারণা করা হয়, গোপনে তিনি একাধিকবার চীন সফর করেন এবং নেপালের অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করতে চীনা বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধ করেন।

৫. এদিকে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় নেপালে একটি নতুন সংবিধান আনতে ব্যর্থ হন নতুন প্রধানমন্ত্রী। এই সময়ে ভারতের সঙ্গে আবার সম্পর্ক শুরু করেন প্রচণ্ড। প্রধান বিচারপতি খিলরাজ রেগমির নেতৃত্বে নতুন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে কাজ করতে থাকেন এই মাওবাদী নেতা। এই নির্বাচনে হেরে যায় প্রচণ্ডের দল। এর পেছনে ভারতসহ আরো কিছু বিদেশি শক্তিকে দায়ী করতে থাকেন তিনি।

৬. ২০১৫ সালে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করে তোলেন প্রচণ্ড। এ সময় একটি বাম মহাজোট গড়ে তোলার প্রতি জোর দেন তিনি। তখনই আরেক বাম নেতা লেনিনপন্থী কেপি অলির সঙ্গে একজোট হন মাওবাদী প্রচণ্ড। এদিকে নতুন সংবিধানকে কেন্দ্র করে ভারতের সীমান্তবর্তী নেপালের মাধেস প্রদেশের লোকজন আন্দোলন শুরু করে। এতে নেপালের সঙ্গে ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক অঘোষিতভাবে বন্ধ করে দেয়। অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন প্রচণ্ড। ভারতের সমালোচনা করেন তিনি। নেপাল ভারতের গোলাম হতে চায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অনেকে মনে করেন, নিজের স্বার্থে প্রচণ্ড সব সময় ভারতকে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। আবার অনেকের ধারণা, ভারত সব সময়ই নেপালের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে, যা মেনে নেয়নি প্রচণ্ডের মাওবাদী দল। তাছাড়া এই অঞ্চলে ভারতের প্রধান প্রতিযোগী চীন। দেশটির সঙ্গে মাওবাদীদের সম্পর্ক বরাবরই ভালো। তাই প্রচণ্ডকে মেনে নিতে চায়নি ভারত। তাছাড়া নেপালে মাওবাদীরা সফল হয়ে গেলে ভারতের মাওবাদী আন্দোলন দমিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

Related posts