September 23, 2018

নেপথ্যে ৩ কারণ ,তালেবানের পুনরুত্থান ?

154

সাবেক সোভিয়েত সম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক সময় আফগানিস্তানে উত্থান ঘটেছিল তালেবানদের। আর তাদের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় এক দশকব্যাপী সোভিয়েত-বিরোধী যুদ্ধের পর ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও যায় তারা। তবে সে ক্ষমতা স্থায়ী হয়নি।

এক সময় তাদের অর্থ, অস্ত্র আর প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র মূলত নিজেদের সম্রাজ্যবাদ প্রসারে তালেবানদের ব্যবহার করেছিল সোভিয়েত সম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও তালেবানরা একদিকে চিরশত্রু হয়ে থেকেছে রাশিয়ার অপরদিকে মার্কিনিদের।

তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আজকের বিশ্বের হিসেব আলাদা। ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর হামলায় ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়া তালেবানরা ২০১৫ সালে এসে আবার তাদের প্রভাব বিস্তার করছে আফগানিস্তানে। দখল করে নিচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তালেবানদের এই পুনরাত্থান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আফগান সরকার, যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো বাহিনীর জন্য। তালেবানদের কার্যক্রমের বিস্তৃতি এবং নতুন ভূখণ্ড দখলের পেছনে কাজ করছে তাদের বহুমুখী কৌশল।

আফগানিস্তানে নিজেদের একটি কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্থায়ী ঘাটি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তারা। ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৬ সালে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনায় নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে তারা দেশটির বড় একটি অংশ দখলে নিতে চাইছে।

চলতি বছরের বসন্তে নতুন করে তালেবানদের শুরু করা বিভিন্ন কার্যক্রম দেশটির আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ করে দিচ্ছে। গত ১৪ বছরের মধ্যেও আইন শৃঙ্খলার এতোটা নাজুক পরিস্থিতি ছিল না সেখানে। ২০০১ সালের পর সবচেয়ে বেশি আফগান নাগরিক নিহত হয়েছে ২০১৫ সালে।

তিনটি কারণে আফগানিস্তানে তালেবানদের পুনরুত্থান ঘটতে যাচ্ছে বলে আল জাজিরার বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।

১. ২০১৪ সালে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো বাহিনীর যুদ্ধ অভিযান শেষ করা এবং তালেবান-বিরোধী লড়াইয়ে অন্য দেশগুলোর সেনা প্রত্যাহার করে নেয়া। বিদেশি সেনা প্রত্যাহার করে নেয়ার পর থেকে দেশটিতে তালেবানদের বিরুদ্ধে বোমা হামলা এবং অভিযান অনেক কমে যাওয়ায় তারা এখন অনেকটা হুমকিমুক্ত।

২০১৫ সালের ১ জানুয়রি থেকে আফগানিস্তানে বিদেশি সেনা আছে ১২ হাজার ৫০০। যাদের কাজ মূলত আফগান সেনাদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং সহায়তা দেয়া।

২. ২০১৪ সালের জুনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তালেবান-বিরোধী অভিযান ‘অপারেশন জার্ব-ই-আজাব’ শুরু করার পর থেকে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে থাকা সংগঠনটির উজবেক, আরব এবং পাকিস্তানের যোদ্ধারা আফগানিস্তানে চলে যায়। এতে তাদের বিদেশি যোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যা আফগান সরকারের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধকে আরো তীব্র করে তোলে।

৩. মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কাছ থেকে নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব বুঝে নেয়ার পর থেকে আফগান নিরাপত্তা বাহিনী যথেষ্ট সাহসিকতা দেখলেও, তাদের রয়ে গেছে নানা সমস্যা। তারা এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অন্য দেশ থেকে দেয়া অস্ত্র আর যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিমান বাহিনীর ব্যাপারে তাদের এখনো রয়েছে সক্ষমতার দারুণ অভাব।

ইতিমধ্যে, আফগান বাহিনীকে নানামুখী চাপে রাখার চেষ্টা করছে তালেবানরা। যুদ্ধের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে তারা। সারা দেশে হামলার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। দেশটির সরকারকে তারা অস্থিতিশীল করে রেখেছে।

আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি বিদেশি যোদ্ধা আছে তালবানদের। সরকারি তথ্য অনুসারে, তাদের বিদেশি যোদ্ধার সংখ্যা বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি। এদের বেশিরভাগই এসেছে, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং পাকিস্তান থেকে। বর্তমানে দেশটির ৩৪টি প্রদেশের প্রায় সবগুলোতেই কার্যক্রম আছে তালেবানদের।

এছাড়া আফগানিস্তানে আছে তালেবানদের একাধিক উপদল, আল কায়েদা, আইএসসহ আরো ১০টির বেশি সংগঠন, যারা আফগান সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। আফগানিস্তানের মাটিতে লড়াই করা বিদেশি যোদ্ধাদের রয়েছে আবার নিজস্ব আঞ্চলিক এজেন্ডা। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে তালেবানরা লড়াই করে যাচ্ছে আইএসের বিরুদ্ধে।

২০১৫ সালের জুনে তাদের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান মোল্লা ওমর নিহত হওয়ার পর থেকে অবশ্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে তারা। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এত বড় চ্যালেঞ্জ আর মোকবেলা করতে হয়নি তাদের।

তবে এসব সত্ত্বেও ভূখণ্ড বাড়িয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। সম্প্রতি তারা দখল করে নিয়েছে আফগান যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হেলমান্দ প্রদেশ। পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলো দখলেরও ঘোষণা দিয়েছে তারা।

এছাড়া আইএস দমনে এখন রাশিয়াও সখ্য বাড়াতে চাইছে তালেবানদের সাথে। শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারভ জানিয়েছেন, শুধু আইএসের ব্যাপারে তথ্য আদান প্রদান করতেই তালেবানদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করবে মস্কো।

তবে রাশিয়াকে আইএসের ব্যাপারে তথ্য দিতে অস্বীকার করলেও তালেবানের এক মুখপাত্র শনিবার জানিয়েছেন, বিদেশি শত্রু তাড়াতে রাশিয়ার সাথে তাদের আলোচনা চলছে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছে, তবে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে নয়। আমরা চাই, বিদেশি সেনারা আমাদের দেশ থেকে চলে যাক। আর এ বিষয়েই এখন আমরা আলোচনা করছি।’

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে বিভিন্ন স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আফগান সমস্যার সমাধানের জন্য দরকার একটি সমন্বিত পদক্ষেপ। সেই সাথে দেশটির দরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহায়তা।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদী/ডেরি

Related posts