November 17, 2018

নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাচ্ছি, পরকালে দেখা হবে’


ঢাকাঃ  “আমি নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাচ্ছি। পরকালে দেখা হবে।”-একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার ছেলে এভাবেই তার বাবাকে মোবাইল ফোনে মেসেজ দিয়ে হারিয়ে গেছে। অনেক খোজাখুজির পরে ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত হন তার ছেলে দেশ ছেড়ে গেছে। সে কোথায় আছে কেমন আছে, কিছুই জানেন না তিনি। গুলশানে নিহত জঙ্গিদের মধ্যে পরিবারের কাছ থেকে এভাবেই বিদায় নেওয়া সন্তানও রয়েছে। এই পরিস্থিতি ভাবিয়ে তুলেছে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোকে।

শুধু এই দুটি পরিবারই নয়, এমন শতাধিক পরিবারের সন্তানেরা স্বেচ্ছায় নিখোজ হয়েছেন। তাদের খোঁজ পাচ্ছেন না স্বজনরা। গোয়েন্দাদের ধারণা এদের অধিকাংশই ঢুকে পড়েছে জঙ্গি কার্যক্রমে। তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা এই সন্তানদের খোজ নিতে মাঠে নেমেছে। কিন্তু কিভাবে এই ছেলেরা জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হলো, কিভাবে তারা বিপদগামী হলো, তার কোন উত্তর মিলছে না।

গুলশান কূটনৈতিক এলাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ছয় জঙ্গির পরিচয় নিয়ে উচ্চ বিত্ত পরিবারের মধ্যে তোলপাড়। ভাবিয়ে তুলেছে শিক্ষিত পরিবারের সদস্যদেরকে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়াম পড়ূয়া সন্তানদের নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। ওই নৃশংস হামলার পর বেরিয়ে আসে উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত তরুণদের ঘাপ্পি মাছের মত জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার তথ্য। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় উচ্চবিত্ত পরিবারের শতাধিক তরুণ স্বেচ্ছায় বেশ কিছুদিন ধরে নিখোজ রয়েছে। গুলশানের ওই ঘটনার পর ওইসকল নিখোজ তরুণদের অনুসন্ধানে তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নেমেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে এই নিখোজ সন্তানরা জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত বলে তাদের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তাদের পিতা-মাতা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ পদে চাকরিরত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত।

কারো কারো পিতা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং তাদের কেউ কেউ অবসরে রয়েছেন। গুলশানে নিহত নিব্রাস ইসলামের এক চাচা উপ-সচিব, আরেক চাচা পুলিশের কর্মকর্তা এবং অপর চাচা একজন বিজ্ঞানী। গুলশানের রেস্টুরেন্টে সংঘবদ্ধভাবে সন্ত্রাসী হামলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টনক নাড়িয়ে দিয়েছে। কোন কোন সংস্থা এই ধরনের জঙ্গি হামলা হতে পারে বলে আশংকা করেছিলো এবং কোন কোন বিদেশী মহল এ ধরনের হামলার কথা বলে আসছিলো। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এ ধরনের হামলার পরিকল্পনা নস্যাত্ করতে যে ধরনের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার ছিলো তা নিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এদিকে অভিযোগ উঠেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছাত্রবস্থায় শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ওই অবস্থায় তিনি হামলারও শিকার হন। পরবর্তীকালে তিনি পুলিশে এসে এই সংস্থার জঙ্গিবিরোধী টিমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তার মত এরকম আরো কয়েক কর্মকর্তাও বিভিন্ন সংস্থায় গুরুতত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তারা গোয়েন্দা তথ্য অনুসন্ধানের নামে জঙ্গিদের সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রবিবার পুলিশ সদরদপ্তরের আইজি একেএম শহীদুল হকের সভাপতিত্বে শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগীয় প্রধান এবং রেঞ্জের ডিআইজিগণ উপস্থিত ছিলেন। জঙ্গি দমনে সক্রিয়ভাবে দেশব্যাপী কার্যক্রম নতুনভাবে আরো জোরালো করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যন্ত জঙ্গি তত্পরতা প্রতিরোধে সকল পেশার লোকজনকে সম্পৃক্ত করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিগত দিনে উচ্চবিত্ত পরিবারের বিপুল সংখ্যক তরুণ স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের অনুসন্ধান করে তারা কে কোথায় কি কাজে জড়িত তার প্রোফাইল তৈরীর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। র্যাবের পক্ষ থেকেও জানা যায়, ইতপূর্বে উচ্চবিত্ত পরিবারের ১০ শিক্ষিত তরুণ স্বেচ্ছায় নিখোজ হয়। তাদের অনুসন্ধান চালিয়ে সন্ধান মিলেনি। তাদের জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ারও তথ্য প্রমাণ পেয়েছে র্যাব। র্যাবের ইন্টিলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্ণেল আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, নিখোজ তরুণদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। তাদের মধ্যে ইংলিশ মিডিয়াম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রয়েছেন।

গুলশান রেস্টুরেন্টে হামলায় নিহত ছয় জঙ্গি রোহান ইমতিয়াজ, নিব্রাস ইসলাম ও মীর সাবিহ মোবাশ্বের ও তাসিন রওনক আন্দালিবসহ তারা ৭/৮ মাস আগে স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হন। দুটি শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা গত দেড় বছরে উচ্চবিত্ত পরিবারের শতাধিক তরুণ স্বেচ্ছায় নিখোজ হয় । কেউ কেউ তাদের পিতামাতাকে এসএমএস বা টেলিফোনে বলেছে যে আমার আশা আর কর না। তোমাদের সাথে পরকালে দেখা হবে। নিখোজ সন্তানদের জন্য ব্যাকুল পিতামাতা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেন, বাবা তুমি ফিরে আস। উত্তরে সন্তান জানিয়ে দেয়, আমি যেই রাস্তায় এসেছি এখান থেকে ফেরার কোন সুযোগ নেই। আমার জন্য তোমরা সকলে বেহেশতে যাবে। তবে নিখোজ আট তরুণের পিতা-মাতা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা দুই হাত জোড় করে বলেন আমার নাম এবং ছেলের নাম প্রকাশ করবেন না। আমরা জীবিত থেকেও এখন মৃত। দুটি গোয়েন্দা সংস্থা এই নিখোজ তরুণদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে তথ্য প্রমাণ পায় যে গুলশান এলাকার তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তরার এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বিদেশি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের সংখ্যাই বেশি। এই নিখোঁজদের অধিকাংশই হিযবুত তাহরীর সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।

জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে হিযবুত তাহরীর সদস্যরা সুশিক্ষিত এবং টেকনোলজিতে দেশ-বিদেশে উচ্চ ডিগ্রীধারী। এই সংগঠনের নেতারা ফেসবুকের মাধ্যমে কিংবা নানা কৌশলে মেধাবী এই তরুণ ছাত্রদেরকে ভেড়াতে সক্ষম হন। তাদেরকে বিদেশে নিয়ে জঙ্গি হামলারও প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। গোয়েন্দাদের তদন্তে এই তথ্য বেরিয়ে আসে।

পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক বলেন, নিখোজ তরুণদের অনুসন্ধানে একাধিক সংস্থা মাঠে কাজ করছে। এছাড়াও জঙ্গি তত্পরতা রোধে দেশব্যাপী জোরালে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। নিয়মিত পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। ইত্তেফাক

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ৪ জুন ২০১৬

Related posts