September 25, 2018

নূপুর (গল্প)

391

 

ঘড়িতে তখন দশটার কাঁটা ছুঁই ছুঁই । বাংলোতে পৌঁছা মাত্র’ই পঞ্চাশার্ধো এক লোক ছুটে এলো
ছ্যার, আপনি নিশ্চয়ই জনাব শাহেদ রহমান ..?

শাহেদ মাতা নাড়াতেই লোকটি খুব হাসি মাখা মুখে ছালাম জানালো ।

আইয়্যুন ছ্যার আইয়্যুন..আমি এতোক্ষন আপনের অপেক্ষা’ই করতাছিলাম । আমি এই বাংলোর দারোয়ান মতি মিয়া ।

মতি মিয়া শাহেদ রহমানের বেডিংপত্র ভেতরে নিয়ে গেলো । শাহেদ হাত মুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টালো । খুব গরম লাগছে আজ । তবে ঝির ঝির বাতাস আর হাসনাহেনার মিষ্টি গন্ধে মুখরিত করে রেখেছে বাংলোটা

জীবনের এই প্রথম কর্মক্ষেত্রে পদার্পন  করলো শাহেদ । প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভ’মি সিলেটের একটি চা বাগানে এসিসট্যান্ট ম্যানেজার – ভাবতেই কেমন যেনো অবাক লাগে ! মাঝে মাঝে ওর বিশ্বাস’ই হয় না যে- চাকরি নামক সোনার হরিনটা তার হাতে ধরা দিয়েছে । ওর কেবলি মনে হয়- ও এখানে বেড়াতে এসেছে ।

রাতের খাবার খেয়ে বারান্দায় কিছুক্ষন পায়চারি করে একটার দিকে ঘুমাতে গেলো শাহেদ । এতো লম্বা জার্নি- ক্লান্তি ভর করে আছে সমস্ত শরীর । বিছানায় শোয়ার সাথে সাথে চোখের পাতা দু’টো আত্বসমর্পন জানাচ্ছে । ঠিক এসময় মুঠোফোনের রিং টোনের শব্দে কিছুটা কেঁপে উঠে শাহেদ । হ্যালো,শাহেদ স্পিকিং …

ও পাশ থেকে ভেসে এলো অপরাধের সুর । দুঃখিত, আমি ভুল করে আপনার নাম্বারে কল দিয়ে ফেলেছি কিছু মনে করবেন না প্লিজ ।
শাহেদ কিছুটা রাগ¦ত কন্ঠে বললো,কিছু একদম মনে না করে পারছি না । আপনি আশি বছরের কেউ হলে গভীর রাতের এই ভুল মেনে নিতাম । কিন্তু ইয়ং একটা মেয়ে হয়ে…

মেয়েটি এবার আরো বিনয়ের সুরে বললো, অনীচ্ছাকৃত ভাবে আপনাকে ডিষ্ট্রাব করার জন্য আমি আবারো দুঃখ প্রকাশ করছি ।

হু , বলে শাহেদ মুঠোফোন সেটটি রেখে দেবে-এ মূহুর্তে মেয়েটি বললো, এবার ইচ্ছাকৃত একটি ডিষ্ট্রাব করতে চাই , প্লিজ…

মহাযন্ত্রণায় পড়লামতো দেখছি ! ঘোষণা দিয়ে আবার কি ডিষ্ট্রাব করতে চান বলুন তো..?
না, মানে মোবাইল সেটটি একটু ওপেন রাখুন না দয়া করে…
২। কেন ?
আপনার ওখানে কে যেনো বাঁশি বাজাচ্ছে.. শুনতে চাচ্ছি একটু ।

শাহেদ লক্ষ্য করলো- সত্যি’ইতো কি পাগল করা সুর..! মুঠোফোনটি টেবিলে রেখে শাহেদ বাইরে গেলো । মতি মিয়া বারন্দার এক কোনায় বসে কি করুণ সুরে’ই না বাঁশি বাজাচ্ছে ! এতো কাছে থেকেও এতোক্ষন তার কানে এই সুর কেনো পৌঁছলো না সে বুঝে উঠে পারছে না । অথচ রং নাম্বারের মেয়েটির কাছে দিব্যি বাঁশির শব্দ পৌঁছে গেলো । শাহেদ মতি মিয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো । কি অদ্ভুত সুর.. বুকে কেমন তীরের মতো বিদ্ব করছে । ও লক্ষ্য করলো, মতি মিয়ার দু’চোখে শ্রাবনের বৃষ্টির ধারা । তার চোখে চোখ পড়তে’ই মতি মিয়া থেমে গেলো ।

ছ্যার আফনি অহনো ঘুমাইছ্ইুন না ?

না । আপনি থামলেন কেন ? বাজান । আসুন মতি চাচা আমার রুমে এসে বাজান । আজ রাতটা না হয় বাঁশি শুনে’ই কাটিয়ে দেবো ।

স্যারের বাঁশি শোনার আগ্রহ দেখে মতি মিয়া ভীষণ খুশি হলো । শাহেদ টেবিলে রাখা মুঠোফোনটি কানে নিয়ে ক’বার হ্যালো বললো.. ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসছে না । লাইন কেটে গেছে ।

ঃ জানেন মতি চাচা এতোক্ষন একটা মেয়ে ফোনে আপনার বাঁশি শুনছিলো ।

ঃ উনি কি আমডার মেডাম ?

ঃ না, তা না । মৃদু হাসলো শাহেদ ।

ঃ তাইলে উনি ক্যাডা, পরিচয় কি ?

ঃ তাতো জিঞ্জেস করা হয়নি । রং নাম্বারে ফোন করেছিলো মেয়েটি ।

ঃ ও আইচ্ছা , যাক কি আর করা .. আরেকদিন ফোন দিলে আমারে একটু খবর দিয়েন। ওনারে বাঁশি শোনাইবাম ইনশ্ল্লাহ ।

ঃ অবশ্য’ই খবর দেবো।

ঃ আমি যাই ছ্যার । আফনে ঘুমাইন।

ঃ একটু বসুন মতি চাচা।

মতি মিয়া টুলে বসলো ।

ঃ আচ্ছা মতি চাচা, আপনার মনে বুঝি খুব কষ্ট ?

মতি মিয়া একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, না ছ্যার অহন আর তেমুন কোনো কষ্ট নাই । তবে একটা সময় আছিন…

ঃ কি সেই কষ্ট..? বলুন না শুনি ।

মতি মিয়া কিছুক্ষন নীরব হয়ে রইলো । তারপর বলতে শুরু করলো- আমি ছিলাম ৭১’এর মুক্তিযোদ্দা এই খবর পাক ক্যাম্পো কইয়া দেয় রেজাকার কুত্তার বাচ্চারা । পাকবাহিনী একদিন মাইজ রাইতে আমার বাড়ি ঘেরাও করে । কুত্তার বাচ্চারা আমার পোয়াতি বউডারে ইজ্জত নষ্ট করে । অপমান সইতে না পাইরা জুলেখা গলায় দড়ি লাগাইয়া মরছে । পিচাশরার ডরে আমার একমাত্র

৩। মাইয়াডা পলাইয়া যায় । আইজও তারে খুঁইজ্জা পাই নাই । সেই থেইক্কা নলের বাঁশি অইলো আমার একমাত্র সাথী । রেজাকাররার ফাঁসি অইছে , অহন আর কোনো কষ্ট নাই । আফনে ঘুমাইন ছ্যার, আমি যাই ।

ঃ ওকে মতি চাচা,গুড নাইট ।এক গ্লাস পানি পান করে শুয়ে গড়লো শাহেদ । রাত পোহালে জীবনের প্রথম অফিস । কাজেই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে । ঘুম ঘুম চোখে শাহেদ শুনতে পেলো- মতি মিয়া আবারো বাঁশি বাজাচ্ছে । রাতের নিস্তব্দতায় বাঁশির সুর এখন আরো মায়াবী লাগছে । শাহেদ মনে মনে ভাবছে- মেয়েটি এখন ফোন করলে ভালো করে  বাঁশি শুনতে পেতো ।

বেশ ভালো’ই লাগছে চাকুারটা । চারদিকে সবুজের বিশাল সমারোহ.. হু হু বাতাসে চা গাছের কচি পাতার নৃত্যের শব্দ .. শ’ শ’ নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের কোলাহল আর হাজারো পাখির কিচির মিচির ডাক ..প্রতিদিন মতি মিয়ার বাঁশির সুরে নিদ্রাদেবীর কোলে আরোহন করছে শাহেদ । তবে একটা অপেক্ষা মনের অজান্তেই কেনো যেনো তাড়িয়ে ফিরছে তাকে । সেই রং নাম্বারের মেয়েটির জন্যে । অপূর্ব তার কন্ঠ । ঠিক যেনো মতি চাচার বাঁশির মতো’ই । রাত বারটার পর মাঝে মাঝে ফোন বাজলেই মনে হয় – এই বুঝি সেই মেয়েটির ফোন , কিন্তু না ।

একদিন সত্যি সত্যি মাঝ রাতে হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো মেয়েটির । শাহেদের সাথে সামান্য সৌজন্যতার পর মতি মিয়ার বাঁশি শুনতে চায়লো সে । সেদিন মতি মিয়া ছিলো অসু¯হ । জ¦রে কাতরাচ্ছিলো । শাহেদ বিষয়টি জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বললো, মতি চাচা সু¯হ হয়ে উঠলে আমি’ই আপনাকে ফোন দেবো ।

ঃ আমাকে বাঁশি শোনানোয় আপনার আগ্রহ দেখে খুশি হয়েছি খুব । অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে ।
ঃ অয়েলকাম । আচ্ছা, আজও কি ভুল করে ফোন দিয়ে  ছিলেন ?
ঃ না, আজ ভুল করিনি । জানেন, নলের বাঁশির সুর আমার ভীষণ প্রিয় ।
ঃ তাই ? আমারও । এক্সিউজ মি-আপনি কি গান করেন ?
ঃ না, কেন বলুন তো ?
ঃ আপনার কন্ঠটা খুব সুন্দর !
ঃ আমি অসুন্দরতো তাই বোধহয়..
ঃ আর আমি যদি বলি আপনি সুন্দর, তাই আপনার কন্ঠও সুন্দর ।
ঃ হ্যাঁ তা বলতে পারেন । তো বাস্তবতা হচ্ছে, কোকিল কালো তাই তার কন্ঠ এতো মিষ্টি । আর সাগর দেখতে খুব সুন্দর, সাগরের কন্ঠ.. আই মিন ঢেউয়ের শব্দ দারুণ ভয়ংকর । আসলে সৃষ্টিকর্তা সব কিছুতেই ক্ষতচিহ্ন এঁেক দিয়েছেন । এই দেখুন না আপনার ওখানে যিনি বাঁশি বাজান- কি মধুর’ই না সেই সুর । খোঁজ নিলে জানতে পারবেন সুরটা আসছে কত’ই না কষ্টের দহন থেকে ।
ঃ মানুষতো মনের সুখেও বাঁশি বাজায় ।

ঃ তা বাজায় । সুখের সুর ক্ষণ¯হায়ী । আর কষ্টের সুর অনেক দীর্ঘ¯হায়ী এবং হ্নদয়স্পর্শী ।
ঃ তাহলেতো বলতে পারি ক্ষতচিহ্নও এক প্রকার অলংকার । আপনার নামটা জানতে পারি ?
ঃ নূপুর.. বলা মাত্র’ই লাইন কেটে গেলো ।
শাহেদ অনেক বার ট্রাই করলো.. ওপাশ থেকে বলা হচ্ছে- দুঃখিত, এই মূহুর্তে আপনার কাংখিত নাম্বারে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না …

নূপুর এখন আর ভুল করে নয় ; ইচ্ছে করেই শাহেদের কাছে মধ্যরাতে ফোন দেয় প্রতিদিন । কথায় কথায় রাত কেটে যায় ওদের । কখন যে ভোর আসে বুঝতে পারে না ওরা । কখনো মতি চাচার বাঁশি শোনা আবার কথা আর কথা .. এই ভাবে কখন যে ওরা হারিয়ে যায় ভালোবাসার গহীনে, কেউ জানে না । এভাবে কেটে যায় আরো বেশ কিছুটা দিন । অথচ আজো কেউ কাউকে দেখেনি । শাহেদ কতবার বলেছে, মুখোমুখি হতে । আজ নয় কাল নয় পরশু করে করে দিন অতিবাহিত করে যাচ্ছে নূপুর ।

শাহেদ এখন নাছোড়বান্ধা । এক দফার এক দাবি- নূপুরকে সামনের শুক্রবার সকাল এগারটায় জাফলং’এ আসতেই হবে । অদৃশ্য হয়ে আর নয়; এবার কথা হবে সামনা সামনি । হাত ধরে দু’জনে ঝর্নার বয়ে চলা স্বচ্ছ জলে হেঁটে বেড়াবে । হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে দূরে অনেক দূরে.. কথায় কথায় কেটে যাবে সকাল দুপুর বিকাল গোধূলী । আসবে সন্ধ্যা । সন্ধ্যার আলো আঁধারীতে ওরা হারিয়ে যাবে ভালোবাসার রাত্রিতে ।

কথানুযায়ী নূপুর নীল শাড়ি পড়ে গন্তব্য¯হলে পৌঁছলো যথাসময়ে’ই । নূপুর সামান্য দূর থেকে লক্ষ্য করলো- কথামতো শাহেদও ধূসর রংয়ের পাঞ্জাবী পড়ে অপেক্ষারত । শাহেদ ঝর্নার সামনে বসে সিগারেট টানছে । দৃশ্যটি দেখে নূপুরের খুব রাগ হলো ।এতো নিষ্পাপ মুখে জ্বলন্ত সিগারেট কিছুতেই মানাচ্ছে না । নূপুর ভীরু ভীরু পায় এগুচ্ছে আর ভাবছে , কাছে গিয়ে সিগারেটটা ছুঁ মেরে কেঁড়ে নিয়ে তা ঝর্নার জলে ফেলে দিবে । বেশ কিছুটা কাছে গিয়ে দেখা গেলো- ও সিগারেট পুরো না টেনেই ফেলে দিলো । প্যান্টের পকেট থেকে একটা লাল রংয়ের ছোট বক্স বের করলো । কি আছে ঐ বক্সে .. ? কৌতুহলের অবসান ঘটলো সাথে সাথে’ই । শাহেদ বক্স থেকে এক জোড়া সোনার নূপুর বের করে নাড়াচাড়া করতে লাগলো ।

সোনার নূপুর দেখে থমকে যায় নূপুর । নূপুরটি নিশ্চয়’ই তাকে প্রেজেন্ট করার জন্য.. পা আর  একটুও নড়ছে না । অবশেষে পিছু ফিরে যেতে বাধ্য হয় নূপুর ।  নূপুর জানে, তার এই ফিরে যাওয়ায় শাহেদ কষ্ট পাবে । ভীষণ কষ্ট । অপেক্ষা করতে করতে শাহেদ এক পর্যায়ে তাকে ছলনাময়ী প্রতারক ভেবে সোনার নূপুরটি ঝর্নার জলে ছুঁড়ে ফেলে দিবে । নূপুর চাপা একটা কান্না নিয়ে মনে মনে বললো, শাহেদ তাই করুক । ক্র্যাচে নির্ভর করে চলা তার এক পায়ে সোনার নূপুর শোভা পাবে না ।

শাহেদ নূপুরের দেরী দেখে একটা রিং করলো ওর নাম্বারে । নূপুরের মুঠোফোনে বেজে উঠলো রিং টোন রবিন্দ্র সংগীত- ”ভালোবাসি ভালোবাসি…” ।শাহেদ বেশ স্পষ্ট শুনতে পারছে টোনটি । ও পিছন ফিরে তাকায় । নীল শাড়ি পড়া অপূর্ব এক সুন্দরী মেয়ে ক্র্যাচে ভর করে দ্রত চলে যাচ্ছে । শাহেদ হন হন পায়ে তার পথ আগলে দাঁড়ায় । দু’জন দু’জনকে চিনে নিতে এতোটুকু ভুল হয়নি কারো । নূপুরের দু’চোখে টপ টপ করে পানি পড়ছে । শাহেদ হাত দিয়ে ওর পানি মুছতে মুছতে বললো, এসো তোমার ঐ পায়ে আমি নিজের হাতে নূপুর পড়াবো ।

ঃ সরি শাহেদ , তা হয় না । এক পায়ে পৃথিবীর কাউকে দেখেছো কখনো নূপুর পড়তে ?
ঃ না, দেখেনি । তবে আজ তোমার পায়ে  পড়িয়ে তা দেখতে চাই ।
রিং টোন এখনো বেজে চলছে- ভালোবাসি- ভালোবাসি…
রুহুল আমীন রাজু
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts