November 16, 2018

সাক্ষীদের নুর হোসেনের হুমকির অভিযোগ

রফিকুল ইসলাম,নারায়ণগঞ্জঃ   নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলার আসামীদের উপস্থিতিতে ৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহন ও ১ জনের জেরা সম্পন্ন হয়েছে। জেরা শেষে আদালত আগামী ২ মে পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহনের দিন ধার্য্য করেছে। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনসহ ২৩ আসামীকে হাজির করা হয়।

সকাল ১০টায় জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে নিহত আইনজীবি চন্দন সরকারের গাড়ীচালক নিহত ইব্রাহীমের বড় ভাই মোঃ ইউসুফ কে আসামী পক্ষের আইনজীবিরা অসমাপ্ত জেরা সম্পন্ন করেন। এরপর নিহত সিরাজুল ইসলাম লিটন ও জাহাঙ্গীরের লাশের সুরতহাল রির্পোট প্রনয়নকারী বন্দর থানার এসআই আবু তালেব সাক্ষ্য দেন। নিহত সিরাজুল ইসলাম লিটনের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম সাক্ষ্য দেন। নিহতদের লাশের সাথে বেধে রাখা ইটের বস্তা ও রশি জব্ধ তালিকার সাক্ষি ইব্রাহীম, ফকির চাঁন ও ইবনে হাসান সাক্ষ্য দেন।আসামী পক্ষের আইনজীবিরা তাদের জেরা করেন।

এরপর নিহত প্যানেল মেয়র ও ওর্য়াড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের ছোট ভাই আব্দুস সালাম তার সাক্ষ্যে বলেন, নুর হোসেনের পরিকল্পনায় র‌্যাব সদস্যরা ৭ জন কে অপহরণ করে খুন করে লাশ শীতলক্ষা নদীতে ফেলে দিয়েছিল। সেদিনের ঘটনা বর্ননা করে তার সাক্ষ্যে বলেন, ২০১৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারী ২ নম্বর ওর্য়াডের মিজমিজি চৌধুরী পাড়ায় সিটি কর্পোরেশনের রাস্তা বড় করা নিয়ে নুর হোসেনের খালাতো ভাই মোবারকের পক্ষে নুর হোসেন, ইয়াসিন মিঞা, আবুল হাসেম হাসু, আমিনুল ইসলাম রাজুসহ সন্ত্রাসীরা নজরুলের উপর হামলা চালায়। এই ঘটনায় মোবারক হোসেন বাদী হয়ে নজরুলকে প্রধান আসামী করে মিথ্যা অভিযোগ করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরদিন ২ ফেব্রুয়ারী নুর হোসেন তার কাডার বাহিনী নিয়ে এলাকায় এসে প্রকাশ্যে ঘোষনা দেয় নজরুলকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই হত্যা করা হবে।

খুন হবার আশংকায় আমি আমার ভাই নজরুল কে এলাকা থেকে সরিয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়িতে আমার বাড়িতে এনে রাখি। নুর হোসেন মেরে ফেলবে এই আশংকায় আমি আমার ভাইকে শুক্রবার মসজিদে জুম্মার নামায পড়তে যেতে দিতাম না। তাকে ঘরেই জুম্মার নামায পড়তে বলতাম। নুর হোসেনের খালাতো ভাই মোবারকের দায়েরকৃত মামলায় নজরুল ও তার সহকর্মীরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন পায়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে নিম্ম আদালতে হাজির হবার জন্য নজরুল ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সকালে আমার বাসা থেকে নারায়ণগঞ্জের আদালতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পরে আমি জানতে পারি আদালত প্রাঙ্গনে পায়জামা পাঞ্জাবী পরিহিত র‌্যাবের এক সদস্য নজরুল কে অনুসরন করার সময় পুলিশ তাকে আটক করে। পরে পোশাক পরিহিত র‌্যাব সদস্যরা পরিচয় দিয়ে পুলিশের কাছ থেকে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।

দুপুর দেড়টায় নজরুল আমাকে মুঠোফোনে জানায় সে আদালত থেকে ঢাকার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। বাসায় এসে আমার সাথে ভাত খাবে। আমি নজরুলের সাথে ভাত খাবার জন্য বাসায় অপেক্ষা করছিলাম। ১৫ মিনিট পরে আমি নজরুলের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তা বন্ধ পাই। নজরুলের সহকর্মীদের মুঠোফোনও বন্ধ পাই।বিষয়টি আমি তাৎক্ষনিক ভাবে সিদ্ধিরগহ্জ বাসায় অবস্থানকারী আমার ভাবী(নজরুলের স্ত্রী) সেলিনা ইসলামকে জানাই। পরে আমি, আমার ভাবি ও অন্যান্য আত্বীয় স্বজন নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপারের কাছে যাই। পুলিশ সুপার আমাদেরকে জানান, পুলিশ নজরুলকে ধরেনি,আপনারা র‌্যাবের সাথে যোগাযোগ করেন। পরে পুরাতন কোর্ট এলাকায় র‌্যাব-১১ এর ক্যাম্প অফিস ও আদমজীতে অবস্থিত অফিসে যোগাযোগ করি।কিন্তু র‌্যাব আমাদের কোন সহযোগীতা করেনি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অপহরনস্থলে লোকজনের সাথে কথা বলে জানতে পারি র‌্যাব সদস্যরা একটি প্রাইভেট কার থেকে ৫জনকে অপহরন কওে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গেছে।

এই অপহরন দৃশ্য দেখে ফেলায় অপর একটি প্রাইভেট কার তেকে ২ জনকে অপহরন করে নিয়ে গেছে। মোট ৭জনকে ৩টি মাইক্রোবাসে করে অপহরন করে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৮ এপ্রিল আমার ভাবি বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় নুর হোসেন, ইয়াসিন মিঞাকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। ৩০ এপ্রিল দুপুর ২টা বাজে খবর পাই আমার ভাইয়ের লাশ শীতলক্ষা নদীতে ভেসে উঠেছে। আমি লাশ শনাক্ত করি। লাশের গায়ে ১০টি ইট রশি দিয়ে বাধা ছিল। পেট ফুটো করা ছিল। এই সময়ে তিনি আসামীর কাঠগড়ায় দাড়িয়ে থাকা আসামী নুর হোসেন, তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেন, এম এম রানা, মর্তুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদকে তার ভাইয়ের হত্যাকারী হিসাবে শনাক্ত করেন। পরে আইনজীবিরা তাকে জেরা করেন।

এরপর নিহত আইনজিবী চন্দন সরকারের ভাতিজা অরুণাভ সরকার তার সাক্ষে বলেন, চন্দন সরকার অপহরনের ঘটনায় ২৭ এপ্রিল রাতেই তিনি ফতুল্লা মডেল থানায় একটি জিডি করেছিলেন। এরপর নজরুলকে বহনকারী প্রাইভেট কারের চালক জাহাঙ্গীর হোসেনর ভাই আলমগীর হোসেন সাক্ষ্য দেন। আসামী পক্ষের আইনজীবিরা তাদেরও জেরা করেন।
মোঃ হাসেম নামের অপর এক সাক্ষী অনুপস্থিত ছিলেন।

একটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটির আইনজিবী, জেলা বারের সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, সাক্ষিরা যখন আদালতে সাক্ষি দেয়, তখন বিপরীত দিকে আসামীর কাঠগড়ায় দাড়ানো আসামী নুর হোসেন তার ঠোটে আঙ্গুল তুলে সাক্ষীদের চুপ থাকার নির্দেশ দেয়।এছাড়া আসামী মেজর আরিফ হোসেন চিৎকার করে বলেন সাক্ষীরা শেখানো সাক্ষী দিচ্ছেন, তখন আদালত তাকে চুপ থাকার নির্দেশ দেন।

পাবলিক প্রসিকিউটর ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, দুটি মামলায় আদালতে ৮ জন সাক্ষী এবং একজন সাক্ষীর অসমাপ্ত জেরা সম্পন্ন করা হয়েছে। আসামীপক্ষের আইনজীবীরা জেরা সম্পন্ন করেছেন। আদালতে ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ডাকা হলেও ৯ জন উপস্থিত হলে তাদের সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে। জবানবন্দী ও জেরায় মামলার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে-যা মামলা প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষের সহায়কা হবে। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট সাখাওয়াত হোসনকে হুমকি দেয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন, এরকরম কোন ঘটনা আদালতে ঘটেনি। এরকম কোন ঘটনা ঘটলে আমাদের বা আদালতের নজরে আসতো। তবুও আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। আদালতের কার্যক্রম অত্যন্ত সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আদালত সাক্ষ্য ও জেরা শেষে আগামী ২ মে মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য্য করেছেন।

এদিকে আসামী র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর আরিফ হোসেনের আইনজীবী এডভোকেট আব্দুর রশিদ জানান, আদালতে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন হুমকি দেয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। যদি এরকম কোন ঘটনা ঘটে থাকলে নিয়ম হচ্ছে বিজ্ঞ আদালতের জুডিশিয়াল নোটিশে নেয়া। কিন্তু মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী আদালতে এমন কোন অভিযোগ করেনি।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাসহ ৭ জনকে অপহরণের তিন দিন পর তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার ৪ সহযোগী হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে একটি এবং সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ির চালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে একটি মোট ফতুল্লা মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে মামলার তদন্তকারী সংস্থা নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তবে একটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি তার দায়েরকৃত মামলায় এজাহারভুক্ত ৫ আসামীকে বাদ দেয়ায় এবং প্রধান আসামী নূর হোসেনের জবানবন্দী ছাড়া অভিযোগপত্র দেয়ায় তা প্রত্যাক্ষাণ করে না রাজী পিটিশন দাখিল করলে প্রথমে বিচারিক হাকিম আদালত ও পরে জেলা ও দায়রা জজ আদালত তা খারিজ করে দেন।

পরে সেলিনা ইসলাম বিউটি অধিকতর তদন্ত চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করলে আদালত শুনানী শেষে আদেশে বলেন, পুলিশ চাইলে মামলাটি অধিকতর তদন্ত করতে পারে। তবে মামলাটিতে হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার ধারা যুক্ত করে বিচার করার জন্য জেলা ও দায়রা জজকে নির্দেশ দেন। গত  ৮ ফেব্রুয়ারী ৭ খুনের দুটি মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৩ আসামীর উপস্থিতিতে আদালত অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন নির্ধারন করেন। তবে র‌্যাবের ৮ সদস্যসহ পলাতক ১২ আসামীর অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্য শুরু  হয়েছে। পলাতক ১২ আসামীর পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের খরচে ৫ আইনজীবীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর আগে গত বছরের ৮ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ওই মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/২৫ এপ্রিল ২০১৬

Related posts