March 23, 2019

নীরবতায় খালেদা জিয়া: অস্থিরতায় সরকার!

নীরবতায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া

চরম অস্থিরতায় সরকার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পূর্বনির্ধারিত কয়েকটি দেশ সফর বাতিল করেছেন।  মন্ত্রী-এমপি এমনকি সিনিয়র নেতারাও এলাকায় যাচ্ছেন না। সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন খোদ দলীয় প্রধান। কণ্ঠে-বর্ণে না বললেও কর্মে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। পরিস্থিতি সামলাতে নানামুখী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ফেসবুক, হোয়াটস আপ ও ভাইবারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধ করা হয়েছে। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান এবং দেশে ফেরার পর নীরবতা অস্থিরতার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখে কী বার্তা নিয়ে এলেন তিনি? ভেতরে-বাইরে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে অঙ্ক কষছেন ক্ষমতাসীনরা। রাজপথে বিরোধী শক্তির ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমন-পীড়ন, আন্তর্জাতিক অঙ্গন, দেশের ভূমিকা এবং দেশের চলমান ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণকারী রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলেছেন, একটি গুমোট অবস্থার মধ্যে চলছে দেশ। এ অবস্থাকে বোদ্ধারা ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ার কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা ও বিরাজমান পরিস্থিতি সৃষ্টির আগের প্রাথমিক পরিবেশের সাথে তুলনা করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর নুরুল আমিন বেপারীর মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা গণতন্ত্রের জন্য বড় ধরনের হুমকি। গণতন্ত্র নির্বাসনে যাওয়ার আগে ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ার অবস্থা ঠিক এমনটি ছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, দেশে রাজনৈতিক অসহিষ্ণু অবস্থা বিরাজ করছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা সঙ্কট চলছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য না হলে পরিস্থিতির উন্নতি মোটেই সম্ভব নয় বলে তার অভিমত। সূত্রমতে, গত ১৫ সেপ্টেস্বর খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। সেখানে বড় ছেলে তারেক রহমান ও তার পরিবারের সঙ্গেই ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এবারের ঈদুল আজহা পালন করেছেন সেখাইনেই। লন্ডনে বিএনপির আয়োজনে দুটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। তার লন্ডনে অবস্থানের মধ্যেই বাংলাদেশে দুই বিদেশি নাগরিক খুন হয়েছেন এবং তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে দুই পুলিশ সদস্যকে, সর্বশেষ জোটের শরিক দলের শীর্ষ নেতা এবং নিজ দলের সর্বোচ্চ ফোরাম নেতার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে। হত্যাকান্ডের ঘটনায় বিএনপি  চেয়ারপারসনের হাত আবিষ্কার করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরিই বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ‘বানচালের উদ্দেশ্যে’ বিদেশে বসে খালেদা জিয়া বাংলাদেশকে  অস্থিতিশীল করার ‘ষড়যন্ত্র’ করছেন।

দলের নেতাকর্মীদের কারাবন্দি, মামলা-হামলা ও বিদেশী হত্যাকান্ডের বিষয়ে বিদেশে বসেই কথা বলেছেন, সমুচিত জবাব দিয়েছেন খালেদা জিয়া। কিন্তু গত শনিবার লন্ডন থেকে দেশে ফিরে খালেদা জিয়া কোনো কথাই বলেননি। তার অতীত ঘাঁটলে দেখা যায়, এমনটি কোনো কালেই ঘটেনি। বিশেষ করে অস্থির পরিস্থিতিতে তিনি নীরবতা পালন করেননি। কথা বলেছেন বিমানবন্দরেই। সূত্রমতে, দীর্ঘ ৬৬ দিন লন্ডনে অবস্থানকালে খালেদা জিয়া চিকিৎসার পাশাপাশি প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের সাথে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়েছেন। সেটা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান  এই দু’জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অতীতের অনেক তথ্য বিএনপিতে বিচরণ করা চর থেকে জানতে পেলেও এবার তা হয়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে শুরু করে মানবতাবিরোধী  অপরাধের চলমান বিচার পর্যন্ত অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে সরকার। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ প্রত্যক্ষভাবে সরকারের কর্মকান্ডের বিরোধিতা করছে। বিনিয়োগ প্রত্যাহার করছে।

সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকিও দিচ্ছে অনেক রাষ্ট্র। বিদেশের মাটিতে প্রতিপক্ষের ধাওয়ার শিকার হয়েছেন দুই মন্ত্রী। দেশেও দলীয় কয়েক এমপি শিশুখুন থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। নিজদলীয় নেতাদের নিত্যদিনের প্রতিটি কর্মকান্ডই বিতর্কের সৃষ্টি করছে। গত দুই মাস ধরেই প্রতিটি মহল্লা-গ্রাম থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার করা হচ্ছে। মহিলা-শিশুও বাদ যাচ্ছে না। বাতিল করা হচ্ছে পুরনো মামলার প্রাপ্ত জামিন। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের মহাসচিবের বিরুদ্ধে মামলার ইতিহাস গড়া হয়েছে। বাগেরহাটের বাসিন্দা মতিঝিলের ফুটপাতে শীতের পোশাক বিক্রেতা হোসেন আলীর প্রশ্ন রাজনীতিকরা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, হতেই পারেন; কিন্তু অরাজনৈতিক ব্যক্তি, সাধারণ মানুষ ও শিশুদের অপরাধ কী? বোঝাই যায়, সরকারের মধ্যে ভীতি কাজ করছে, যা সরকারই ভালো জানে। আলাপকালে তিনিও জানতে চান  বিদেশে দুই মাস খালেদা জিয়া কী করলেন? নিশ্চয়ই কোনো জব্বর বাতাস (গ্রিন সিগন্যাল) পেয়েই তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে এসেছেন।

ক্ষমতাসীনদের ধারণা, খালেদা জিয়া এবার এমন কিছু করতে পারেন যাতে বাধা দেয়ার কিছুই থাকবে না। সামনে ৫ জানুয়ারি। বিএনপি এ দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ আখ্যায়িত করেছে। গত বছর এ দিবসটিকে ঘিরে খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৯৩ দিন নিজ কার্যালয়ে ছিলেন। এর মধ্যে কিছুদিন অবরুদ্ধ ছিলেন এবং কিছু দিন অবস্থান নেন। এবার তার গতি-প্রকৃতি কী হবে  এমন ধারণা দিতে পারছেন না খোদ দলের নীতিনির্ধারকরাও। না বলা কথাই সরকারকে অস্থির করে তুলেছে বলে মনে করেন অনেকেই, যে কারণে হঠাৎ নামে-বেনামের অভিযান।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts