November 18, 2018

‘নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ নয়, গুলিবিদ্ধও’

ঢাকাঃ  মাগুরায় নির্বাচনী সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ লিয়াকতপুরো নির্বাচন ব্যবস্থার ওপরই জন অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এটা অব্যাহত থাকলে মানুষের মধ্যে আরও হতাশা তৈরি হবে, সহিংসতা আরও বাড়বে। বিপজ্জনক হবে ভবিষ্যৎ। ইউনিয়ন পরিষদ নামে মাত্র প্রতিষ্ঠান থাকবে, হারাবে কার্যকারিতা। ইউপি নির্বাচন এখন শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং গুলিবিদ্ধও। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ইসিকে দায়ী করলে চলবে না। সরকারের দায়দায়িত্বও রয়েছে। গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় কথাগুলো বলেছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও দেশের বিশিষ্টজনরা।

‘চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন: প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে গভর্নেন্স এডভোকেসি ফোরাম। এতে অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, ইউপি নির্বাচন আবহমান কাল ধরে মানুষের কাছে একটা উৎসব হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসলেও বর্তমানে মানুষ এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় অন্যায়ের প্রবণতা বাড়ছে। সবাই অন্যায় মেনে নিচ্ছে। ফলে জাতি একটি মুখচোরা সমাজের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সভায় অংশ নিয়ে অনেকেই মত দেন, ইউপি নির্বাচন অপ্রস্তুতভাবে দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে সংকট তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এখন শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং গুলিবিদ্ধও। প্রথম তিন ধাপে প্রাণনাশের সংখ্যা হাফ সেঞ্চুরি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেকর্ড তৈরি হয়েছে। হতাহতের সংখ্যা চার হাজার অতিক্রম করেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের মধ্যে ন্যায়-অন্যায় বোধ শেষ হয়ে গেছে। যারা অপরাধ করছেন, তারা ধরেই নিয়েছেন তাদের কোনো বিচার হবে না। ধারাবাহিকভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থার যে অবনতি, তা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, পোষমানার মতো অবস্থা। মানুষ অভিযোগ করেছে। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া, প্রতিকার নেই। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে কি, হচ্ছে না- তা নিয়ে কেউ অভিযোগ করারও আগ্রহ প্রকাশ করছে না আর। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনে গঠিত ট্রাইব্যুনালেও কেউ যাবে না। অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এমন যে, ভোটাররা ভোট কেন্দ্রেই যাবে না। ড. তোফায়েল বলেন, কমিশন ও প্রশাসনকে শক্তিশালী করেও কোনো কাজ হবে না। শক্তির তো কোনো ব্যবহার নেই। শক্তির কোনো প্রদর্শন নেই। শক্তি প্রয়োগের কোনো নজির নেই। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করলে চলবে না। এখানে সরকারেরও দায়দায়িত্ব আছে।

সরকার ইসিকে সহায়তা না করলে সুষ্ঠু নির্বাচন কখনই সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, আমরা কোন্‌ দিকে ধাবিত হচ্ছি? একটা সুবিধাবাদি, লুকিয়ে থাকা ও মুখচোরা সমাজের দিকে যাচ্ছি আমরা। অবস্থাটা হচ্ছে, আপনি যদি বুদ্ধিমান হোন- বোকা হয়ে যান। কিছু দেখেননি, কিছু শোনেননি। তিনি বলেন, বলা হয়- বোবার শত্রু নেই। কিন্তু দেখে-শুনে বোবা হওয়াটাও একটা শয়তানি। এটা একটা বেইমানি। আমরা এখন সব বোবা-শয়তান হয়ে যাচ্ছি। ড. তোফায়েল বলেন, অনেকেই মনোনয়ন বাণিজ্যের প্রশ্ন তুলছেন। এখানে তো পুরো রাজনীতিটাই বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। শুধু ইউপি নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কার বিষয় নয়। এটা নিয়ে আলোচনাটাই অপ্রাসঙ্গিক। অনেকগুলো নির্বাচনের মধ্যে এটা একটা অংশ। জাতীয়ভাবে নির্বাচন হোক বা না হোক। কিন্তু ইউপি নির্বাচন আবহমান কাল ধরে মানুষের কাছে একটা উৎসব হিসেবে হয়ে আসছিল। গ্রামের মানুষের কাছে এটা ভীষণ আরাধ্য বস্তু ছিল। এটা এখন আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের কাছ থেকে। নতুন প্রজন্মের তো এ নির্বাচনে কোনো আগ্রহই নেই। আগের প্রজন্ম আগ্রহ হারাচ্ছে। তাহলে কি ইউপি নামক প্রতিষ্ঠানটা থাকবে? থাকবে। তবে কার্যকারিতা হারাবে। কারণ, যেই নেতৃত্ব ওখানে যাওয়ার দরকার, সেটা তো যাচ্ছে না। তাহলে থাকা না থাকা তো একই বিষয়। সুতরাং নির্বাচনের দরকারটা কি। আমাদের যেমন জেলা পরিষদ আছে, চলছে প্রশাসনের লোক দিয়ে। এখানে আর পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়নে এটা করার দরকারটা কি। খুবই বেদনা থেকে কথাটা বলছি। যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে এখনও সময় আছে, গণতন্ত্রকে ট্র্যাকে নিয়ে আসা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, বাস্তবসম্মত কারণেই আমরা সবাই হতাশ। নির্বাচনের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে বলা যায়- এটা কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই হয়নি। নির্বাচনের তাৎক্ষণিক প্রভাবটা হলো- সবাই মোটামুটি নিশ্চিত যে, এই কমিশন দিয়ে আর সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জন অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এটা অব্যাহত থাকলে মানুষের মধ্যে আরও হতাশা তৈরি হবে। সহিংসতা আরও বাড়বে। এবং আমরা একটি বিপজ্জনক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএম আকাশ বলেন, নির্বাচনী গেজেটে যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইসি, সেটা তারা রাখতে পারেনি। ইসি বলছে, যাদের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়, তাদের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। এটা হতাশাজনক।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ব্রতী’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমীন মুরশিদ বলেন, ’৫৪ সালের নির্বাচনেও সহিংসতা হয়েছিল। কিন্তু সেসময় যেটুকু নৈতিকতা ছিল, এখন আর সেটুকুও বাকি নেই। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া কি এগুচ্ছে? ২০০৩ সালের নির্বাচনে সব ধরনের অনিয়ম হয়েছিল। তারপর জল অনেক দূর গড়িয়েছে। আমরা ২০০৭ দেখিছি। ২০০৮-এর নির্বাচন দেখেছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আমাদের ভোটার তালিকা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। চমৎকার একটা ভোটার তালিকা আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন সেই ভোটার তালিকা নিয়েও আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। তাহলে কি আমরা বলবো- দলীয় সরকারের কারণেই এর মানটা নিচে নেমে এসেছে? নির্বাচন কমিশন কেন এটা করলো? তিনি বলেন, ২০০৮-এর নির্বাচন কমিশনের অনেকগুলো দৃশ্যমান পদক্ষেপ ছিল। তাতে মানুষ আস্থা পাচ্ছিল। এখন সেটা নেই। আগে পর্যবেক্ষকরা কোনো কেন্দ্রে গেলে সবাই সতর্ক হয়ে যেতো। আর এখন সামনাসামনি সব অপকর্ম হচ্ছে। আমরা যখনই একটু উন্নতির দিকে এসেছিলাম, তখন আবারও খারাপের দিকে পড়েছি। সবকিছু এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শারমীন মুরশিদ বলেন, এবারের ইউপি নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ইসি কোনো ব্যবস্থা নিলো না। তৃতীয় ধাপে কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে তারা। তাহলে কি বলবো তারা প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সেই নির্দেশনার অপেক্ষা করেছিলেন? প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে কেন ব্যবস্থা নিলো না তারা। তিনি আরও বলেন, ইউপি নির্বাচনটা দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠান অনেকটা অপ্রস্তুতভাবে করা হয়েছে। এটা অনেক বড় সংকটের কারণ। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে চেইন অব কমান্ড ভেঙে গেছে। ওপর থেকে যা বলা হচ্ছে, তৃণমূলে সেটা মানা হচ্ছে না। এটা অনেক বড় শঙ্কার জায়গা। এক্ষেত্রে আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে আগে। দলের ভেতরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের পরিচালক ড. আব্দুল আলিম বলেন, নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে অংশীজনদের মতামত গ্রহণ, যেটি সরকার বা নির্বাচন কমিশন করেনি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের ব্যাপারেও কমিশন যথাযথ ভূমিকা রাখেনি। নির্বাচন যদি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, প্রাণহানি ঘটে, তা কাম্য হতে পারে না। নির্বাচন কমিশন কাঠামোগতভাবে স্বাধীন হলেও কার্যক্ষেত্রে নানারকম সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারছে না। নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় ও উইংয়ের ওপর নির্বাচন কমিশনের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রয়োজন। মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, অর্চিতার নির্বাহী পরিচালক মো. নাজমুল হাসান, ভার্কের সহ-সমন্বয়কারী আখতার হোসেন, ব্র্যাকের সিনিয়র ম্যানেজার মো. জাকির হোসেন প্রমুখ।

উৎসঃ   মানব জমিন

Related posts