September 19, 2018

নির্বাচনে গেল ৯৬ প্রাণ, দায় নেই কারো!

ঢাকাঃ  প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে চলছে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। এরই মধ্যে পাঁচ ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত পাঁচ ধাপে অন্তত ৯৬ জনের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। এছাড়া নির্বাচনে ভোট কারচুপি, জালভোট, ভোটের আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিলমারা, প্রার্থীদের বাড়িঘর ভাংচুর, প্রচারণায় বাধাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনের এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য রাজনৈতিক দলসহ সুশীল সমাজ সবাই নির্বাচন কমিশনকেই (ইসি) দায়ী করছেন। কিন্তু কমিশন সেই দায় নিতে নারাজ। প্রধান দুই দল পরস্পরকে দুষছেন, আর নির্বাচন কমিশন বলছে সমস্যাটা মানসিকতার।

প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য থেকে জানা যায়, ২২ মার্চ প্রথম ধাপের ভোটের দিন ১০, ৩১ মার্চ দ্বিতীয় ধাপের ভোটের দিন ৮, ২৩ এপ্রিল তৃতীয় ধাপের ভোটের দিন ১, ৭ মে চতুর্থ ধাপের ভোটের দিন ৬ ও ২৮ মে পঞ্চম ধাপের ভোটের দিন ১১ জন এবং তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের আগে ও পরে ৬০ জনসহ নির্বাচনী সহিংসতায় মোট ৯৬ জনের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে।

তবে ২৬ মে এক সংবাদ সম্মেলনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চার ধাপের নির্বাচনের আগে ও পরে ১০১ জনের প্রাণহানী এবং আহতের সংখ্যা আট হাজারের উপরে বলে সাংবাদিকদের জানায়।

সংবাদ সম্মেলনে অতীতের রেকর্ড তুলে ধরে বলা হয়, ‘অতীতের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোর প্রাণহানির তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা যায় যে, ১৯৭৩, ১৯৭৭, ১৯৮৩ ও ১৯৯২-এ প্রাণহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি। ১৯৮৮ সালে ৮০ জন, ১৯৯৭ সালে ৩১ জন, ২০০৩ সালে ২৩ জন এবং ২০১১ সালে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। অতীতের নির্বাচনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ১৯৮৮ সালে। সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনের তকমাও জুটেছিল ঐ নির্বাচনের নামের পাশে। প্রাণহানির ক্ষেত্রে অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছে এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং তা চলছে দীর্ঘমেয়াদিভাবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বিভাগভিত্তিক প্রাণহানির তথ্যও প্রকাশ করে সুজন। সেখানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ২২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯ জন, বরিশাল বিভাগে ১৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৬ জন, খুলনা বিভাগে ১৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯ জন, রংপুর বিভাগে ৫ জন এবং সিলেট বিভাগে ১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

দলগত পরিচয়ের দিক থেকে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী বা সমর্থক ৪০ জন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ১২ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ২ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি’র ১ জন, জনসংহতি সমিতির ১ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ২ জন, মেম্বার প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ৩১ জন এবং ১২ জন সাধারণ মানুষ রয়েছেন প্রাণহানির তালিকায়। মৃতদের মধ্যে ৪ জন নারী ও ৩ জন শিশুসহ একজন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ৩ জন মেম্বার প্রার্থীও রয়েছেন। চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে ৪২টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ পর্যন্ত নিহত ১০১ জনের মধ্যে নির্বাচন-পূর্ব সংঘর্ষে ৪৫ জন, নির্বাচনকালীন সংঘর্ষে ৩৬ জন এবং নির্বাচনোত্তর সংঘর্ষে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।’

দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ জানান, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে কোনো ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখতে চান না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে- নির্বাচনে কোনো ধরনের অনিয়ম, ত্রুটি, বিচ্যুতি তিনি দেখতে চান না। সে নির্দেশনা নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছি। অনিয়ম হলেই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।’

পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদেরও এ বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদেরও নির্দেশনা দিয়ে রাখব। কোথাও কোনো অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হানিফ সহিংসতার জন্য বিএনপিকে দায়ী করে বলেন, বিএনপি ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দিতে না পেরে বিশৃঙ্খলা করার অপচেষ্টা করছে। এ নির্বাচনকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

নির্বাচনী সহিংসতার দায় কার এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে.জে. (অ.) মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন যে সম্ভব নয় নিজেরাই বারবার তার প্রমাণ দিয়েছেন। নির্বাচনের দিক থেকে নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর চাইতেও বেশি শক্তিশালী। তারা ইচ্ছা করলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু তারা তা না করে অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে। তাই এর সকল দায় দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে।

নির্বাচনের সকল দায়দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উল্লেখ করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বলেন, দেশে নির্বাচন কমিশন আছে কিন্তু কাজের না। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন যথাযথভাবে হচ্ছে না।

এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কঠোর সমালোচনাও করছে বিভিন্ন মহল।

সাম্প্রতিক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘সারা দেশে এখন সহিংসতার আবহ বিদ্যমান। একটু কিছু হলেই আপনারা(গণমাধ্যম) অন্য জায়গাতেও দেখছেন, জমিজমা নিয়ে হলেও লোকজন খুন করে ফেলছে। নির্বাচন নিয়েও এটা অনেক বেশি বাড়ছে। আমি তো মনে করি, এ রকম অসহিষ্ণু হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

ভোট নিয়ে সহিসংতার কারণ খুঁজতে গিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে সমাধানের পথও বাতলে দিয়ে সিইসি বলেন, ‘আমি বারবার বলে আসছি, আমি আশ্চর্যও হচ্ছি- কেন উনারা তা করেন? প্রত্যেকটি অভিযোগের কিন্তু একটা আইনানুগ ব্যবস্থা রয়েছে। ফলাফলের কোনো পর্যায়ে অভিযোগ থাকলে তারা ট্রাইব্যুনালে যেতে পারে। অনেকে অহরহ যাচ্ছেন হাই কোর্টে। কোনো জায়গায় কারও মাথায় লাঠি মারার দরকার নেই। বিএনপিসহ যারা দেখা করতে আসেন তাদের বলি, আপনাদের অভিযোগ পুলিশকে দিন, থানা মামলা না নিলে ম্যাজিস্ট্রেটকে দিন। মামলা হলেই এটার পরিসংখ্যান হবে। এর বিচার হবে।’

সিইসি আরো বলেন, ‘এই নির্বাচন সামনকে রেখে অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার অভিযান ভালোভাবে হলে এ ধরনের সহিংসতা হতো না।’

সহিংসতা ঠেকাতে মানসিকতা পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘কঠোর থেকে কঠোর ব্যবস্থা কিন্তু আমরা নিচ্ছি। আপনারা বলছেন কেন ব্যবস্থা নিতে পারছেন না এটা বন্ধ করার জন্য! এটাকে বন্ধ করতে হবে অন্যভাবে। মন-মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।’

এত নির্দেশনার পরও কেন অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার অভিযান ভালো হয়নি- জানতে চাইলে কাজী রকিব বলেন, ‘এটা আইনশৃঙ্খলা

বাহিনী করে। তারা কিন্তু অনেক উদ্ধার করছে, অনেকে ধরা পড়ছে। কিন্তু সেটা নর্মাল নিউজ। ওইটা ওইভাবে আসে না। যখন বেকায়দা হয় তখন আসে।’

নির্বাচনে সহিংসতার দায় কার এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, ‘কার উপর দায় পড়ে এটা খোঁজ নিলেই পাবেন। পাশাপাশি দুই বাড়ির কেউ মারামারি করলে তার দায় নির্বাচন কমিশনের নেওয়ার কোনো কারণ আমি দেখিনা। আমরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছি, কোনো সংহিসতা হলে যেন শক্তভাবে ভূমিকা গ্রহণ করে। কেউ সহিংসতা করলে সে যেন ছাড় না পায়, যেন গ্রেফতার হয়, যেন চরম ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কার্পণ্য না করে।’

তিনি বলেন, ‘এখন দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে সবাই আচরণবিধি মেনে চলবে এটাই স্বাভাবিক ছিলো। কিছুকিছু ব্যক্তির অতি উৎসাহের কারণে কিছু সন্ত্রাসী কার্যক্রম হচ্ছে। আমরা ব্যবস্থাও নিচ্ছি এবং ভবিষতে আরো নেব। কেউ নিজস্ব এলাকায় মারামারি করলে, দেশের স্বাভাবিক অবস্থায় যখন মারামারি হয়, এর অর্থ এই নয় যে, নির্বাচন এলেই খুন হয়। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যে কিছু লোক বাড়াবাড়ি করবে, কিছু লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। আমরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছি যে, নির্বাচনের কোনো বিষয়ে কেউ যেন বাড়াবাড়ি না করতে পারে। করলেই মামলাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ কেউ গালিফতি করলে বা ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা নিতে আমরা পিছপা হব না।

আরেক নির্বাচন কমিশনার মো. আবু হাফিজ বলেন, ‘যারা ভোট করছেন, নির্বাচিত হচ্ছেন সহিংসতার দায় তাদেরকেই নিতে হবে। কারণ দুইপক্ষে মারামারি করে তারাই খুনোখুনিতে জড়াচ্ছেন। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আর পরবর্তী ধাপে যাতে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোরভাবে নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনে সহিংসতার দায় নির্বাচন কমিশন কিছুতেই এড়াতে পারে না। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি এটা তাদের ব্যর্থতা। তারা যদি দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে না পারে তাহলে পদে থেকে লাভ কী? রান্না ঘরে গিয়ে রান্না করতে গেলে তাপ সহ্য করতে হয়। আর তা না পারলে রান্না ঘরে থাকার দরকারটা কী?’

সরকারের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনে সরকারেরও ভূমিকা রয়েছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি ঠিকমতো দায়িত্বপালন করতো তাহলে সহিংসতার পরিমাণ আরো অনেক কমে আসতো।

এরই মধ্যে পাঁচ ধাপের ভোট শেষ হয়েছে। ষষ্ঠ ও শেষ ধাপে ৪ জুন ৭২৪ ইউপির ভোটের মাধ্যমে শেষ হবে এবারের ইউপি নির্বাচন। আর এই নির্বাচনে প্রাণহানির এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকে তা নিয়েই এখন শঙ্কিত সবাই।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ২৯ মে ২০১৬

Related posts