September 24, 2018

নির্বাচনী জ্বরে আক্রান্ত সাতক্ষীরা

উৎসবের আমেজ না থাকলেও রয়েছে কালো টাকার ছড়াছড়ি। চলছে হামলা, মামলাসহ প্রশাসন ও সরকার দলীয় লোকজনের নানা হয়রানী। সরকার দলীয় প্রার্থীরা নির্বাচনে পরাজিত হলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হবে প্রতিপক্ষের বাড়ি ঘরে এমন হুমকীও দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পঞ্চাশ থেকে একশ টাকার বিনিময়ে নারী কর্মীদের প্রচারণায় নামানো হয়েছে। নারী কর্মী সবচেয়ে বেশি নামিয়েছে সরকার দলীয় প্রার্থীরা। শাড়ি, কাপড়, কম্বল সহ বিভিন্ন ধরণের উপহার ভোটারদের দেয়া হচ্ছে।

প্রতিদিন জেলা ব্যাপী গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের বেশিরভাগ নেতাকর্মী ঘরবাড়ি ছাড়া। ফলে নির্বাচনী আচারণ বিধি না মানায় সরকার দলীয় প্রার্থীরা অনেক বেশি সুবিধা পাচ্ছে। পৌরসভা দুটিতে জয়ের ব্যাপারে জামায়াতের সমর্থনের উপর নির্ভর করছে অনেকটা। যে প্রার্থীর উপর জামায়াতের সমর্থন থাকবে সেই প্রার্থী পৌর মেওয়ার হবেন অনেটা নিশ্চিত। তাই জয়-পরাজয়ের ভোট ব্যাংক এখন জামায়াতের কাছে।

সাতক্ষীরা পৌরসভায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাছিম ফারুক খান মিঠু নারিকেল গাছ প্রতীক নিয়ে ও কলারোয়া পৌরসভায় আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম লাল্টু প্রচারণায় অনেকটা এগিয়ে বলে ভোটারদের দাবী। প্রচারণায় সবধরণের সুবিধা নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে আছেন এ’দুজন প্রার্থী। রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কালো টাকা ছড়াছড়ির অভিযোগ। তবে এই দু’প্রার্থীর দাবী, তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মিথ্যা। কলারোয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম লাল্টুর বিরুদ্ধে রয়েছে নির্বাচনী আচারণ বিধি ভঙ্গের হাজারো অভিযোগ।

সাতক্ষীরা পৌর সভার মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন প্রার্থী। এরা হলেন, পৌর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামীলীগ দলীয় প্রার্থী শাহাদাত হোসেন (নৌকা প্রতীক), জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ আজহার হোসেন (লাঙ্গল প্রতীক), জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিএনপি দলীয় প্রার্থী তাছকিন আহমেদ চিশতি (ধানের শীষ) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাছিম ফারুক খান মিঠু (নারকেল গাছ প্রতীক)। এ পৌরসভায় আ’লীগের একক প্রার্থী থাকায় একটু সুবিধা জনক অবস্থানে রয়েছে দলীয় নৌকা প্রতীক। প্রচারণায় পিছিয়ে নেই জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ আজহার হোসেন এর লাঙ্গল প্রতীক।

তবে জাতীয় পাটির চেয়ারম্যান হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের উপর ভোটারদের আস্থা কম থাকায় লাঙ্গল প্রতীক বিজয়ের সম্ভবনা কম দেখছেন ভোটাররা। প্রচার-প্রচারণায় অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিএনপি দলীয় প্রার্থী তাছকিন আহমেদ চিশতির ধানের শীষ প্রতীক। তার দাবী, প্রচার-প্রচারণা কম থাকলেও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের রয়েছে গভীর আস্থা। এছাড়া জামায়াতের ভোট পেলে ধানের শীষের বিজয় ছাড়া তিনি কিছুই দেখছেন না তিনি। এ পৌরসভায় জামায়াতের উপর অনেকটা নির্ভর করছে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী।

তিনি জামায়াতের অনেক নেতাকর্মীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। এ পৌরসভাতে জামায়াত যে প্রার্থীর উপর ঝুঁকবে নির্বাচনের জয় সেই প্রাথীর ঘরে উঠবে বলে অনেকের ধারণা। আ’লীগের প্রার্থীরা বলছেন, ২০১৩ সালে সাতক্ষীরাতে জামায়াত যে ভাবে নাশকতামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করে ছিল তাতে ভোটাররা তাদের উপর আস্থা রাখতে পারবে না।

কলারোয়া পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে চারজন প্রার্থী ভোটের মাঠে লড়ছেন। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা নিয়ে লড়ছেন কলারোয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম লাল্টু, বিএনপির মনোনীত দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আক্তারুল ইসলাম। এছাড়া, জাতীয় পার্টির দলীয় প্রতীক লাঙ্গল নিয়ে উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মুনসুর আলী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য ও বিদ্রোহী প্রার্থী আরাফাত হোসেন মোবাইল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ধানের শীষের অবস্থা অনেকটা ভাল। এছাড়া বিএনপির এ প্রার্থী আক্তারুল ইসলাম গতবারের নিবাচনে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হন। যদি ভোটাররা স্বাভাবিক ভাবে তাদের ভোট প্রয়োগ করতে পারে তা হলে এ পৌরসভাতে ধানের শীষের বিজয় ঠেকানো সম্ভব হবে না।

ভোটে জিততে মরিয়া প্রার্থীরা। পৌরসভা দুটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মোড়ে নির্মাণ করা হয়েছে তোরণ। রয়েছে ব্যানারও। আর নির্বাচনের ‘প্রতিশ্রুতি’ তো রয়েছেই। শীতের কন কনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে কাক ডাকা ভোরে বেরিয়ে পড়ছেন প্রার্থীরা। চষে বেড়াচ্ছেন গভীর রাত পর্যন্ত। ভোটারদের বাড়িতে, দোকানে, হাটে-বাজারে সব খানেই চাওয়া হচ্ছে ভোট। ভোটারদের কাছে নানান ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের প্রতীক মনে রাখার আহবান জানানো হচ্ছে। তবে ভোটাররা এবার সতর্কতার সাথে প্রার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিসহ সব কিছু পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। দিনভর প্রচার মাইক ও প্রার্থী সমর্থকদের প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়লেও ভোটাররা সহজে মুখ খুলতে চাইছেন না।

সরেজমিনে খোঁজ খবর নিয়ে ও বেশ কয়েকজন ভোটারের সাথে কথা বলে আরো জানা গেছে, ভোট যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় তাহলে এবারের ভোটে নিরব বিল্পবের মতো সাতক্ষীরা ও কলারোয়ার দুটি পৌরসভায় ২০ দলীয় জোট তথা বিএনপি’র ধানের শীষ প্রতীক জয়লাভ করবে বিপুল ভোটে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাতক্ষীরা ও কলারোয়ার একাধিক বর্ষিয়ান ভোটার জানিয়েছেন, সরকার দলীয় অনেক নেতার আধিপত্য বিস্তার ও তাদের দ্বারা মিথ্যা মামলাসহ বিভিন্ন হয়রানির ভয়ে সাধারণ ভোটাররা মুখ খুলছেন না। বিশেষ করে ধানের শীষ প্রতীকের দুই মেয়র প্রার্থী সাধারণ ভোটারদের মতোই যেনো নিরব বিপ্লব ঘটাতে চাইছেন। সাতক্ষীরা পৌর সভায় ভোটার রয়েছেন ৭৯ হাজার এবং কলারোয়া পৌরসভায় ১৮ হাজার ৫২৫ জন। এখন অপেক্ষা ৩০ ডিসেম্বর, ভোট গ্রহণের দিন। সাতক্ষীরা ও কলারোয়া পৌরসভায় কারা হচ্ছেন আগামী দিনের পৌর পিতা ।

সাতক্ষীরা পৌরসভার ৯ টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৩৮ জন ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ৯ জন প্রার্থী তাদের বিভিন্ন প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কলারোয়া পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে চারজন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৫ জন এবং সংরক্ষিত আসনে ৫ জন মহিলা কাউন্সিলর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডে একজন মহিলা ও ২ নং ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে একজন পুরুষ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইতোমধ্যে নির্বাচিত হয়েছেন। এদিকে, ৩০ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণের জন্য সাতক্ষীরা পৌরসভার ৩১ টি এবং কলারোয়া পৌরসভার ৯ টি কেন্দ্রের তালিকা চুড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন।

সাতক্ষীরার ৩১ টির মধ্যে ১৪ টি কেন্দ্র অধিক গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) এবং ১৭ টি কেন্দ্র সাধারণ গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে ধরেছে পুলিশ প্রশাসন। কলারোয়া পৌরসভার ৯ টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৫টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) ও ৪টি কেন্দ্রকে সাধারণ গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে ধরা হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক এনামুল হক জানান, অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে একজন পুলিশের এসআই এর নেতৃত্বে পাঁচজন কনস্টেবল এবং সাধারণ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে একজন এসআইয়ের নেতৃত্বে চারজন কনস্টেবল নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে।

এছাড়া, প্রতিটি কেন্দ্রে ১৪ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। একই সাথে সাতক্ষীরা ও কলারোয়া পৌরসভার নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেট এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের একাধিক টিম দায়িত্ব পালন করবেন। সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী মঞ্জুরুল হক পিপিএম বলছেন, নির্বাচন সুষ্ঠ হবে। ভোটাররা নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। ‘ক্ষমতার অপপ্রয়োগ’ করায় সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌর ভোটের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার পর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে সাতক্ষীরা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে।

বিগত নির্বাচনে পৌরসভা দু’টিতে বিএনপি সমথিত প্রার্থিরা পৌর মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভোটাররা নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে এবারও ধানের শীর্ষ বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে এমনটাই আশা করছেন পৌরসভা দু’টির সাধারণ ভোটাররা।

এদিকে, সাতক্ষীরায় পুলিশের অভিযানে জামায়াত বিএনপির কর্মীসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে নাশকতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে থানায় মামলা রয়েছে বলে পুলিশের দাবী।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সন্ধা পর্যন্ত জেলার বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে জামায়াতের ১০ জন, বিএনপির একজন, অন্যান্য মামলার ১৭ জন রয়েছে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts