September 19, 2018

নিরাপত্তা ইস্যুঃ কর্মসূচি বাতিল করছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান

ঢাকাঃ নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে একের পর এক কর্মসূচি বাতিল করছে দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান। গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তরাঁ ও শোলাকিয়ায় হামলার ঘটনার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে পূর্ব ঘোষিত অর্ধডজনেরও বেশি বিদেশি কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে নতুন কোনো অনুষ্ঠান বা কর্মসূচির পরিকল্পনার বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। হলি আর্টিজানে হামলার পর ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ৩টি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। দেশীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েও পরবর্তীতে তা থেকে সরে আসছে। প্রায় প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটছে। দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে সোস্যাল বিজনেস ডে উপলক্ষে আগামী ২৮ থেকে ৩০শে জুলাই ঢাকায় বড় দুটি অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা ছিল। অনুষ্ঠানের আয়োজক ইউনূস সেন্টার গতকাল তা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। রাজধানীর কূটনৈতিক জোনে (গুলশান, বনানী ও বারিধারা) বিদেশি শিক্ষার্থীনির্ভর ইন্টারন্যাশনাল স্কুলগুলোও নিরাপত্তার কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে।

যদিও নিরাপত্তার অতিরিক্ত আয়োজনসহ সরকারের তরফে দেশি-বিদেশিদের উদ্বেগ নিরসনে বহুমুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কূটনৈতিক জোনে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। ওই এলাকায় জন ও যান চলাচলের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তারপরও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমছে না। কূটনৈতিক পল্লী থেকে সর্বশেষ যে খবরাখবর বেরিয়েছে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের কূটনীতিক ও স্টাফদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। আপাতত স্টাফদের পরিবারকে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার ‘অপশন’ দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। ঢাকা পরিস্থিতি সরজমিন পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি যাচাই এবং বাংলাদেশস্থ ইইউ দূতাবাস এবং তার স্টাফদের নিরাপত্তা জোরদারে আলোচনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ঢাকা আসছেন।

এখানে থাকা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেলিগেশন প্রধান রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়েদুন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ইইউ দূতাবাসের কর্মকর্তারা পরিবার নিয়ে এখন যেখানে থাকছেন, ভবিষ্যতেও তারা সেভাবে থাকবেন কি-না? ব্রাসেলসের ওই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আসার পর প্রশ্নটি অবধারিতভাবেই আসবে। এখানে ইইউ’র কর্মীদের কেউ কেউ স্কুলগামী সন্তানদের নিয়ে থাকছেন জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, অন্য অনেক কূটনীতিক মিশনের মতো আমাদেরও হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যেভাবেই আছি সেভাবেই থাকবো নাকি অন্যভাবে অবস্থান করবো। এই সিদ্ধান্ত রাতারাতি নেয়া যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কূটনৈতিক সূত্র মতে, বাস্তিল ডে উপলক্ষে ঢাকায় ফ্রান্স দূতাবাসে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই তারা সেই আয়োজন থেকে সরে আসে।

গত ২০শে জুলাই গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে ইমামত ডে উপলক্ষে একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (একেডিএন)। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ওই অনুষ্ঠানের দাওয়াত কার্ডও পৌঁছানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে ‘বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির’ কারণে তা বাতিল করা হয়। আজ থেকে ঢাকায় দ্য এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপের অর্থপাচার বিষয়ক বার্ষিক সভা শুরুর কথা ছিল। ওই সংস্থার বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে আগেই এটি সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা আসে। এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশের পরিবর্তে এখন বৈঠকটি আগামী সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে আয়োজকদের তরফে কোনো কারণ দেখানো না হলেও আয়োজন সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিনিয়র এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকায় সন্ত্রাসী হামলার কারণেই ভেন্যু পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি এসেছে।

অনুষ্ঠানে ৩৫০ জন বিদেশি প্রতিনিধির উপস্থিত থাকার কথা ছিল। ওদিকে, এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টার আয়োজিত টেলিকমিউনিকেশন্স বিষয়ক আরেকটি সম্মেলন ঢাকায় হওয়ার কথা ছিল আগামী ২৯শে সেপ্টেম্বর। আয়োজকরা জানিয়েছেন, সেটাও সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা বা থাইল্যান্ডে সম্মেলনটি হতে পারে। এতে আনুমানিক ৪৫০ জন বিদেশি প্রতিনিধির যোগ দেয়ার কথা ছিল। এদিকে গত সপ্তাহে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন জেট্রো’র আয়োজনে টোকিওতে বাংলাদেশ বিষয়ক একটি সেমিনারের আয়োজন ছিল। জেট্রো সদর দপ্তরে ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ উৎসাহ’ শীর্ষক এ সেমিনার হওয়ার কথা ছিল।

এতে দুই শতাধিক জাপানি শীর্ষ বিনিয়োগকারীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা অফিস মানবজমিনকে সেমিনার বাতিলের তথ্য নিশ্চিত করে। এক কর্মকর্তা বলেন, সেখানে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের দু’জন প্রতিনিধি যোগদানের কথা ছিল। এ সেমিনারের ধারাবাহিকতায় চলতি বছর শেষ নাগাদ বড় ধরনের একটি বিনিয়োগ সম্মেলন করার কথা ছিল। এই সেমিনার বাতিল করায় পরবর্তী আয়োজনটিও বাতিল করা হয়েছে বলে জেট্রো সূত্র জানায়। এদিকে গুলশান অ্যাটাকের পরপরই ঢাকায় জাপানিজ লেঙ্গুয়েজ প্রফিসিয়েন্সি টেস্ট (পরীক্ষা) বাতিল করে জাপান দূতাবাস।

ওদিকে নিরাপত্তার কারণে গুলশান বনানী এলাকার প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো ঈদের পর নির্ধারিত তারিখে কার্যক্রম শুরু করেনি। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এসব স্কুল শিক্ষা কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রেখেছে। স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুল স্কলাসটিকার ছুটি-পরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রম দুই দফা পিছানো হয়েছে। সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আরো ১০ দিনের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। একইভাবে আরো কয়েকটি স্কুলে এখনও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। আর্টিজানে হামলার পর পোশাক খাতের কয়েকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের নির্ধারিত সফর বাতিল করেছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে বৈঠক করার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। এদিকে দুই জঙ্গি হামলার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছিল। এ কর্মসূচি থেকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নারী ও অভিভাবক সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে এ দুটি কর্মসূচি স্থগিতের কথা জানানো হয়েছে ১৪ দলের পক্ষ থেকে। ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম জানিয়েছেন, স্থগিত কর্মসূচির পরবর্তী তারিখ শিগগিরই জানানো হবে। এছাড়া গুলশান অ্যাটাকে নিহত জাপানি নাগরিকদের স্মরণে গত সপ্তাহে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে তা বাতিল করা হয়।মানবজমিন

Related posts