November 15, 2018

নিরপেক্ষ নির্বাচন থেকে বাংলাদেশ অনেক দূরে!

কেউ সংবিধান লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন আইনগতভাবে বাধ্য। কিন্তু অকার্যকর নেতৃত্ব আর নির্বাহী বিভাগের চাপে কার্যত এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো নজির নির্বাচন কমিশনের প্রায় নেই। ফলে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন বাংলাদেশে বহু দূরের লক্ষ্য হিসাবেই রয়ে গেছে।

আবার রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব খাটানো, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও নির্বাচন বর্জন নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

‘বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি ২০১৪-১৫’-সংক্রান্ত বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এবারের প্রতিবেদনের বিষয় প্রতিষ্ঠান, ফলাফল ও জবাবদিহি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অসম বলপ্রয়োগ এখনো বাংলাদেশের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির কারণে বাংলাদেশে সংসদীয় কার্যক্রম চলছে ধুঁকে ধুঁকে। গড়ে উঠেছে সংসদীয় কার্যাবলি বয়কটের মতো অগ্রহণযোগ্য অভ্যাস। আবার জাতীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়ীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

গতকাল রোববার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক ইন সেন্টারে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের অধীনে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সৈয়দা সেলিনা আজিজ এবং রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. সুলতান হাফিজ রহমান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এবারের গবেষণায় নির্বাচন, সংসদ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের শাসন (বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী), অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গবেষণায় মূলত সরকারি উৎস থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে পর্যায়ক্রমে হালনাগাদ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নির্বাচন-সংক্রান্ত গবেষণায় কেবল পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নেওয়া হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও জনসংখ্যার তুলনায় এখনো তা কম। সংসদে কার্যকর নজরদারিও কম। ফলে সংসদে গঠনমূলক, বিষয়ভিত্তিক বিতর্ক ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতিফলন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে অসমর্থ হয়েছে, যা বাংলাদেশে একটি উদার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সংসদে ব্যবসায়ী ছিলেন প্রায় ৪০ শতাংশ। ’৯৬ সালের নির্বাচনে তা বেড়ে ৫০ শতাংশের কিছুটা বেশি দাঁড়িয়েছে। ২০০১ সালে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি এবং ২০০৯ সালে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংসদে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে। তবে সংসদ বর্জনের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। পঞ্চম সংসদে বর্জনের হার ছিল ৩৪ শতাংশ, অথচ নবম সংসদে বর্জনের হার বেড়ে হয়েছে ৮৫ শতাংশ। আবার পঞ্চম সংসদে বিরোধী দলের নেত্রীর সংসদ বর্জনের হার ছিল ৬৬ শতাংশ, নবম সংসদে তা বেড়ে হয় ৯৮ শতাংশ। আবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশগ্রহণের হার সন্তোষজনক নয়। গড়ে ছয়-সাতজনের বেশি সাংসদ উপস্থিত থাকেন না।

নির্বাচনী ব্যয়: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রমাণ ও সঠিক হিসাব দেওয়া হয় না। বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী খরচের যথাযথ ও পর্যাপ্ত প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে খুব কমই দেখা যায়। প্রার্থীরাও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসরণ করে না। নির্বাচনী প্রচারের খরচের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো আইন ও বিধি মেনে চলে না। নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ব্যয়ের যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তাতে দেখা যায় যে দলটির ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আর বিএনপির নির্বাচনী ব্যয় ছিল ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর জমা দেওয়া ব্যয়ের হিসাবের সত্যতা পরীক্ষা করে দেখেনি।

অর্থনৈতিক শাসন পরিস্থিতি: গবেষণা প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অপেক্ষাকৃত দুর্বল কার্য সম্পাদন দেশের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঋণখেলাপি সংস্কৃতি সন্তোষজনকভাবে কমানো সম্ভব হয়নি। বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বাড়লেও তা পরিমাণে কম। রাজস্ব আহরণ বাড়লেও তা-ও পরিমাণে কম। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ১০ শতাংশ বাজেট অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ দেশের অর্থনীতির ভিতকে দুর্বল করেছে।

কমেছে শিক্ষার মান: প্রতিবেদন অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের শিক্ষার গুণগত মান কমেছে। ২০০৩ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন মাত্র ২০ জন। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ২৩৭৬ গুণ বেড়ে ৪৭ হাজার ৫৩০ হয়েছে। অথচ একই সময়ে পাসের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৩ গুণ। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে জিপিএ-৫ পাওয়া ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পাস নম্বর পাননি। গত তিন বছরে ৫১ শতাংশ, ৫২ শতাংশ ও ৫৫ শতাংশ হারে শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন।

স্বাস্থ্য পরিস্থিতি: গবেষণায় বলা হয়, প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলোর টিউশন ফি ব্যয়বহুল। তা ছাড়া বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব মেডিকেলের প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষার মানও একটি বড় সমস্যা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ বছরে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। প্রতিবছর এই কমার হার সাড়ে ৫ শতাংশ। তবে এখনো বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ মেয়ে মাত্র ১৫ থেকে ১৯ বছরে মা হচ্ছেন। গর্ভনিরোধক ব্যবহারের ক্ষেত্রে মেয়েদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কম। ১৫ ভাগ শিশুর বয়সের তুলনায় শারীরিক বৃদ্ধি হচ্ছে না। চিকিৎসক ও নার্সের পরিমাণ বাড়লেও এখনো অপ্রতুলতা আছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. সুলতান হাফিজ রহমান বলেন, বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা। কিন্তু এটা প্রমাণ করা কঠিন। এ বিষয়ে গবেষণার বিষয়টি ভবিষ্যতে ভেবে দেখা হবে।

এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে সূচনা বক্তব্যে সুলতান হাফিজ রহমান বলেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে অগ্রগতি লাভ করেছে। এ নিয়ে দেশ-বিদেশেও বেশ আলোচনা হয়েছে। উন্নয়নের এ গতি হয়তো আগামী বছরও অব্যাহত থাকবে, কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্রগতি সেভাবে হয়নি। এটা করা না গেলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি একটা সময় থেমে যেতে পারে। এমনকি উল্টোও হতে পারে।

উৎসঃ   প্রথমআলো
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts