November 18, 2018

নিজেরা কাঁদলেন অন্যদেরও কাঁদালেন!

ছবিঃ কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহলের ৩০টি পরিবার ভারতে 

স্টাফ রিপোর্টারঃ দ্বিতীয় দফায় ভারতের নাগরিকত্ব নেয়া কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহলের ৩০টি পরিবারের ১৫৮ জন ভারতে গেছেন। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা চোখের জলে ভারতগামীদের শেষ বিদায় জানান। সৃষ্টি হয় এক বেদনাঘন পরিবেশ। বিদায় বেলা তারা নিজেরা কাঁদলেন অন্যদেরও কাঁদালেন। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় বাগভাণ্ডর বিজিবি ক্যাম্পের নিকট আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ৯৬২ এর ১এস এর পাশ দিয়ে নতুন এ নাগরিকদের ফুলেল শুভেচ্ছায় স্বাগত জানায়।

সকাল সোয়া ৯টার দিকে ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজারের পাশে শেখ ফজিলাতুননেছা দাখিল মাদরাসা প্রাঙ্গণ হতে ২৯টি পরিবারের ১৫৭ জনের দলটি ২৪টি পিকাপে মালামাল এবং ৫টি মিনিবাসে ভারতীয় সীমান্তের দিকে রওনা দেন। পথে ভূরুঙ্গামারীর বিলুপ্ত ছিট গাড়লঝোড়া থেকে একটি পরিবারের আরও একজন যোগ দেন তাদের সঙ্গে। এ সময় তাদের তদারকি করেন ভারতীয় দূতাবাসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অভিজিৎ রায়, ফারুক আজম ও অরুপ চক্রবর্তী। ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বাগভাণ্ডার সীমান্ত চেক পোস্টে ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা ভারতীয় ভূ-খণ্ডে প্রবেশ করেন। ভারতীয় অংশে তাদের স্বাগত জানান- কুচবিহার জেলার ডিএম শ্রী পিউল গানাথন, ১০১ সাহেবগঞ্জ কোম্পানি কমান্ডার অনিন্দ ঘোষসহ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভারতের সাহেবগঞ্জ সীমান্তের অভ্যন্তরে তাদের এই নতুন নাগরিকদের বরণ করতে প্যান্ডেল সাজানো হয়।

বাগভাণ্ডার সীমান্তে এসব ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশের পক্ষে বিদায় অভ্যর্থনা জানান-অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) রফিকুল ইসলাম সেলিম, ৪৫ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল জাকির হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাব উদ্দিন, ভূরুঙ্গামারী ইউএনও মামুন ভূঁইয়া, ফুলবাড়ীর ইউএনও নাসির উদ্দিন মাহমুদ, নাগেশ্বরীর ইউএনও আবু হায়াত মো. রহমত উল্লাহ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোলেহ মারফ, নবি নেওয়াজ, ওসি জিয়া লতিফ, সাবেক ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা প্রমুখ। তারা মিষ্টি খাইয়ে এবং ফুল ও বিভিন্ন উপহার সামগ্রী দিয়ে ১৫৮ জন ভারতীয় নাগরিককে বিদায় জানান।

এর আগে গত রোববার কুড়িগ্রামের দুটি বিলুপ্ত ছিটমহলের ১৫টি পরিবারের ৭২ জন ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চলে যান। এ নিয়ে দু’দফায় কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল থেকে ভারতে গেছেন ২৩০ জন। এর মধ্যে দাশিয়ার ছড়ার ২০৬ জন এবং ভূরুঙ্গামারীর গাড়লঝোড়ার ২৪ জন রয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলার এমএলএ রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বরণ অনুষ্ঠানে বলেন, বঞ্চিত ৬৮বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া এসব মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য আমাদের সরকার কাজ করে যাচ্ছে। আমরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা সাবেক ছিটমহল হতে যারা ভারতে আসছে তাদেরকে গ্রহণ করা শেষে আমরা তাদের জন্য ফ্লাট নির্মাণের উদ্যোগ নেব। এ ছাড়াও ইতিমধ্যে যারা ভারতে প্রবেশ করেছে তাদের সন্তানদের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়েছে। দু’দেশের সরকার প্রধানদের আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছি তারা এই অর্ধলক্ষাধিকের বেশি মানুষের ৬৮ বছরের গ্লানি দূর করেছেন। তারা মুক্তি পেয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম সেলিম জানান, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়া ও ছোট গাড়লঝোড়ার ভারতীয় নাগরিকদের গতকাল দুপুরে ওই দেশে প্রবেশ করোনো হয়। পরে তাদের কুচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জের অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে যান ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এ সময় দু’দেশের প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসক কন্ট্রোল রুমের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল মারুফ জানান, চলতি বছরের গত ৩১শে জুলাই মধ্যরাতে কুড়িগ্রামের অভ্যন্তরে ১২টিসহ বাংলাদেশে ১১১টি ছিটমহল একীভূত হয়। গত ৬-১৬ জুলাই এ জনপদগুলোতে দুই দেশের যৌথ সমীক্ষা পরিচালিত হয়। যৌথ সমীক্ষায় হেড কাউন্টিং হালনাগাদ এবং অধিবাসীদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মতামত গ্রহণ করা হয়। এ সময় কুড়িগ্রাম জেলায় অন্তর্ভুক্ত ১২টি ছিটমহলের ৩০৫ জন, লালমনিরহাট জেলায় অন্তর্ভুক্ত ৫৯টি ছিটমহলের ১৯৭ জন এবং পঞ্চগড় জেলার ৩৬টি ছিটমহলের ৪৮৭ জন নিয়ে মোট ৯৮৯ জন ভারতের নাগরিকত্ব বহাল রেখে সেদেশে যাওয়ার জন্য মতামত প্রদান করেন। এগার দিন ব্যাপী যৌথ জনগণনা জরিপ চলাকালীন ভারত যেতে কুড়িগ্রামের ৩টি ছিটমহলের ৩০৫ জন মতামত প্রদান করেন।

এদের মধ্যে ফুলবাড়ির দাশিয়ারছড়া থেকে ৫৮টি পরিবারের ২৮১ জন এবং ভূরুঙ্গামারীর ২টি ছিটের ৬ পরিবারের ২৪ জন সদস্য। ভারতের নাগরিকত্ব বহাল রাখার জন্য ৩০৫ জনের মধ্যে ২৮১ জন ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করেছেন। এদের মধ্য থেকে দাশিয়ারছড়ার ১৯টি পরিবারের ৭০ জন নাগরিক তাদের মত পাল্টিয়ে এদেশে থাকতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বরাবর আবেদন করেছেন।

তিনি আরও বলেন, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত ১২টি সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহলের জনসংখ্যা ১ হাজার ৬৩০টি পরিবারে ৮ হাজার ১৩২ জন। এর মধ্যে ৭৩ পরিবারের ১৪৭ জন মুসলমান এবং ১৫৮ জন হিন্দুসহ মোট ৩০৫ জন ভারতে যাওয়ার মতামত দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১৯ পরিবারের ৭০ জন এখন আর ভারতে যেতে চাচ্ছেন না। এদের অধিকাংশই হিন্দু পরিবার।

পঞ্চগড়, ডিমলা, ডোমার (নীলফামারী) প্রতিনিধি জানান, ৩য় দফায় গতকাল পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত দহলা খাগবাড়ি ছিটমহলের ৩০টি পরিবারের ১৫২ জন নতুন ভারতীয় নাগরিক স্থায়ীভাবে ভারতে চলে গেলেন। ১৫০ জন যাওয়ার কথা থাকলেও ২ নবজাতকসহ এ সংখ্যা হয়েছে ১৫২। এর মধ্যে ৬৩ জন পুরুষ, ৫০ জন মহিলা এবং ২ নবজাতকসহ শিশু ৪৯ জন। গত সোমবার বিকালে প্রয়োজনীয় মালামালসহ তারা দেবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে স্থাপিত চেকিং ও লোডিং পয়েন্টে উপস্থিত হয়। কাস্টমস ও বিজিবি কর্তৃপক্ষের চেকিং কার্যক্রমের পর সেখানে তাদের রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা করা হয়। গতকাল সকালে দেবীগঞ্জ চেকিং ও লোডিং পয়েন্ট থেকে ৪টি বাস ও ৮টি ট্রাকে মালামালসহ তদের নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি ডাঙ্গাপাড়া সীমান্তে রওনা দেন তারা।

এ সময় পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ গোলাম আযম, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের ১ম সচিব রমা কান্ত গুপ্ত, দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। শেষ বিদায়ের ক্ষণে আত্মীয়স্বজন এবং বিদায়ী ভারতীয়রা কান্নায় ভেঙ্গে পরেন। এ সময় ওই এলাকায় বেদনাবিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিকালে চিলাহাটির ডাঙ্গাপাড়া সীমান্তে আব্দুর রউফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকালে হলদিবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন তারা। ৪র্থ দফায় বৃহস্পতিবার দগলা খাগড়াবাড়ী ও দইখাতা ছিটমহলের ২৩টি পরিবারের ১০৮ জন সদস্য ভারতে যাবেন। চার দফায় যারা ভারতে যেতে পারবেন না তাদেরকে ৩০শে নভেম্বর পাঠানো হবে বলে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts