September 22, 2018

নিজামীদের জন্য পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সম্মাননা!

ঢাকাঃ  নানা তৎপরতা চালিয়ে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে না পারলেও দমেনি পাকিস্তান। দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের পাকিস্তানের প্রতি অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এবার দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘নিশান-ই-পাকিস্তান’-এ ভূষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটির পাঞ্জাব প্রদেশের পার্লামেন্ট গতকাল মঙ্গলবার মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নিন্দা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বাংলাদেশের জামায়াত নেতাদের ‘নিশান-ই-পাকিস্তান’ সম্মাননা দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলোর অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঞ্জাবের পার্লামেন্ট গতকাল দুটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এর একটি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, অন্যটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানে লুকিয়ে থাকা আফগানিস্তানের তালেবান নেতা মোল্লা মোহাম্মদ মনসুরকে যুক্তরাষ্ট্র এ সপ্তাহে ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যা করায় দেশটি ক্ষুব্ধ। মোল্লা মনসুরের মতো আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র অভিযান চালিয়ে হত্যা করেছিল পাকিস্তানের মাটিতেই। বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হওয়া ওই ব্যক্তিরা পাকিস্তানের ভেতর কিভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছিলেন তাঁর ব্যাখ্যা না নিয়ে দেশটি বরাবরই এসব অভিযানের মাধ্যমে তার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। পাঞ্জাব পার্লামেন্টে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলার নিন্দা জানানো হয়। ওই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সদস্য ও পাঞ্জাব পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় নেতা মিয়া মেহমুদ-উর-রশিদ।

অন্যদিকে বাংলাদেশ নিয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) সদস্য আলাউদ্দিন শেখ। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশে মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করায় ক্ষুব্ধ ওই নেতা দাবি করেন, পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর ওই নেতাদের এমন পরিণতি হচ্ছে। তাই ‘নিশান-ই-পাকিস্তান’ সম্মাননায় ভূষিত করে তাঁদের প্রতি পাকিস্তানিদের শ্রদ্ধা জানাতে হবে।

মন্ত্রীর মুখেও নিজামী বন্দনা : এদিকে লাহোর হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনে গত সোমবার ‘ইসলামিক আইনজীবী ফোরাম’-এর এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী খাজা সাদ রফিক বলেন, বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কেবল দলীয় বিষয়ই নয়, জাতীয় মর্যাদা ও সম্মানেরও বিষয়। এ ইস্যুকে সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

খাজা সাদ রফিক বলেন, পাকিস্তানের জন্য ‘আত্মত্যাগকারী’ ওই ব্যক্তিদের তাঁরা ভুলে যাবেন না। তাঁর দাবি, পাকিস্তানকে ‘ভালোবাসা’র অপরাধেই নিজামীদের শাস্তি হচ্ছে।

ওই অনুষ্ঠানেই পিটিআই নেতা চৌধুরী সারওয়ার বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। তিনি বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে চাপ দিতে পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামের প্রধান সিরাজুল হক দাবি করেন, এর পেছনে ভারতীয় ইন্ধন রয়েছে। নিজামীর ফাঁসির পর রাষ্ট্রদূতকে আঙ্কারায় ডেকে নেওয়ায় তিনি তুরস্কের প্রশংসা করেন।

তুরস্কের কট্টরপন্থীরা নিজামীর প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসসংলগ্ন সড়কের নাম বদলে নিজামীর নামে রেখেছে।

প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা নতুন নয় : যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া দেখানো ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব নতুন কিছু নয়। এ মাসেই বাংলাদেশ ঢাকায় পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে দুই দফা তলব করে প্রতিবাদ জানায়। ঢাকা ইসলামাবাদকে স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধাপরাধের বিচার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বরং পাকিস্তান তার দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করে ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

পাকিস্তান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে যাওয়ার হুমকি দিলেও সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলেছেন, পাকিস্তান নিজেই এতে সমস্যায় পড়বে। কারণ জাতিসংঘের নীতি অনুযায়ী, এক দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে পারে না। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভয়াবহ গণহত্যার কথাও বাংলাদেশ বলতে চায়। আর পাকিস্তান চায়, তা আড়াল করতে। পাকিস্তান এ ইস্যু নিয়ে জাতিসংঘে যাওয়ার চেষ্টা করলে নিজের কুকীর্তিই বিশ্বের সামনে নতুন করে উঠে আসবে।

পাকিস্তানকে সংযত হওয়ার পরামর্শ নিউজউইক পাকিস্তানের : পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিবাদে জাতিসংঘে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর দেশটির সংবাদমাধ্যম নিউজউইক ইসলামাবাদকে সংযত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ‘পাকিস্তানের কি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত?’ শীর্ষক এক বিশ্লেষণে নিউজউইক পাকিস্তান বলেছে, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক। তাঁর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট। এখানে পাকিস্তানের কিছুই করার নেই। পাকিস্তান এ বিষয়টিতে জড়িয়ে প্রতিবেশী ভারত, আফগানিস্তান ও ইরান থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যেকোনো উদ্যোগ পাকিস্তানি জামায়াতে ইসলামীকে সন্তুষ্ট করা ছাড়া আর কোনো ফল বয়ে আনবে না।

এর আগে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আইনজীবী ও লেখক ইয়াসির লতিফ হামদানি তাঁর দেশের ট্রিবিউন পত্রিকার অনলাইনে এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার মাধ্যমে অতীতের ভুল শুধরানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর প্রক্রিয়া নিয়ে কেউ ভিন্নমত পোষণ করতে পারে। কিন্তু কেউ অস্বীকার করতে পারে না যে এটি এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ বিষয়ে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া কেবল দুই দেশের মধ্যে দূরত্বই বাড়াতে পারে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি একটি বার্তা যে আমরা অতীত থেকে এখনো শিক্ষা নেইনি।’

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তান সরকারের প্রতিক্রিয়া নাগরিক হিসেবে তাঁর জন্য লজ্জার বলেও তিনি জানান।

একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে গত নভেম্বর মাসে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর পাকিস্তান সরকারের প্রতিক্রিয়ায় অসন্তুষ্টি জানিয়ে দেশটির মানবাধিকার আইনজীবী আসমা জাহাঙ্গীর বলেছিলেন, পাকিস্তান সরকার নিজ দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে দৃষ্টি না দিয়ে অন্য দেশের বিষয়ে নাক গলাচ্ছে। তাঁর মতে, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মুজাহিদের ফাঁসি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে পাকিস্তান সরকার প্রমাণ করেছে যে তারা পাকিস্তানের ‘চর’ ছিল।কালেরকণ্ঠ

Related posts