September 26, 2018

নিউইয়র্কে বাংলাদেশীদের বিক্ষোভ

হাকিকুল ইসলাম খোকন,বিশেষ সংবাদদাতাঃ  ২৭ জনের পর আরো ১৬৭ বাংলাদেশীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার দাবিতে ৮ এপ্রিল শুক্রবার অপরাহ্নে নিউইয়র্কে বহুজাতিক একটি বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। বাংলা, ইংরেজী, হিন্দি, নেপালি, উর্দূ, আরবী, সিংহলী ইত্যাদি ভাষায় লেখা প্লেকার্ড হাতে অংশগ্রহণকারিরা সমস্বরে শ্লোগান ধরেন ‘ঐক্যবদ্ধ জনতার পরাজয় কখনো ঘটেনা’, ‘ওরা বলে চলে যাও-আমরা বলি ফাইট ব্যাক’, ‘ওরা বলে ডিপোর্টেশন-আমরা বলি লিবারেশন’, ‘অভিবাসীর অধিকার-মানবাধিকার’, ‘ওরা বলে জেলে রেখে মুনাফা গড়-আমরা বলি জাস্টিস এ্যান্ড ফ্রিডম’ ইত্যাদি। গগনবিদারি শ্লোগানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন দফতরের প্রতি ধিক্কার এবং নিন্দা জানানো হয়। এতে প্রবাসী বাংলাদেশী নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন  বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক রহিম হাওলাদার।

গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ, ভারত এবং নেপালের ৮৫জনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিস্কারের নিন্দা, প্রতিবাদ এবং এহেন অমানবিক প্রক্রিয়া থেকে বিরত হবার দাবিতে নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে ডাইভার্সিটি প্লাজায় এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ান অভিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা দিয়ে কর্মরত ‘দেশিজ রাইজিং আপ এ্যান্ড মুভিং’-ড্রাম এর উদ্যোগে এ কর্মসূচি স্থলে প্রতিকী লাশ রাখা হয় ৩টি। এ প্রসঙ্গে ড্রামের সংগঠক  উল্লেখ করেন, ‘নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে আসা লোকজনকে গ্রেফতার করে নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়ার পর অনেকেই নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। লাশগুলো তারই প্রতীক।’ বিভিন্ন দেশ ও ভাষার নারী-পুরুষের সাথে স্কুল-কলেজগামী ছেলে-মেয়েরাও অংশ নেন এতে। সকলেই সমস্বরে শ্লোগান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানবতা লংঘনের কঠোর সমালোচনা করেন।

দালালকে বিপুল অর্থ প্রদানের পর ১৭ দেশ অতিক্রম করে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্র অতিক্রমকালে ধরা পড়ার বছরখানেক পর জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলাদেশী যুবক সাইফুল  তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘আমি শুনেছিলাম যে, আমেরিকা মানবাধিকারের দেশ। তাহলে এটি কোন ধরনের মানবাধিকার। ইমিগ্রেশনের ডিটেনশন সেন্টারে প্রতিদিন ১৯ ঘন্টাই ছোট্ট একটি সেলে তালাবদ্ধ অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার অরেঞ্জ কাউন্টি ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয় আমাকে। এভাবে এক বছর অতিবাহিত হবার পরও আমার এসাইলাম মঞ্জুর করা হয়নি। বেঁচে থাকার আর কোন অবলম্বন নেই ভেবে অনশনের মত কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করি। এরপরই জামিনে মুক্তি দেয়া হয়েছে।’ ‘আর যারা মুক্তি পাননি, তাদেরকে এখন বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। যেখানে বিরাজ করছে ভয়াবহ অবস্থা। ফিরে গেলে হয় মরতে হবে, নয়তোবা গুম হতে হবে, অথবা ক্রস ফায়ারে পড়তে হবে’-বলেন সাইফুল।

জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত কামরান  বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এমন নিষ্ঠুর আচরণের বিরুদ্ধে সমগ্র মানবতার ঐক্য গড়ে উঠা উচিত।’

‘৫ এপ্রিল যে ২৭ জনকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে তারা নিরাপদে নিজ নিজ বাড়িতে গেছেন। কোথায়ও কোন সমস্যা হয়নি। কিংবা পুলিশও তাদের গ্রেফতার করেনি। এতদসত্ত্বেও বলা হচ্ছে কেন যে, বাংলাদেশে ফিরে গেলেই নির্ঘাত মৃত্যু হবে’-কর্মসূচির পর এ সংবাদদাতার এমন এক প্রশ্নের জবাবে ড্রামের সংগঠক  বলেন, ‘সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলোতে এমন বর্বরতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যাদেরকে বহিষ্কার করা হয়, সকলকেই ক্ষমতাসীন দলের মাস্তানেরা মেরে ফেলেছে। আমরা সে ঘটনারই নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালাম।’

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন বিভাগের একজন কর্মকর্তা ৮ এপ্রিল এনআরবি নিউজ24কে জানিয়েছে, ‘বেআইনীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় সীমান্ত রক্ষীদের হাতে ধরা পড়া বাংলাদেশীদের মধ্যে আরো ১৬৭ জনকে শীঘ্রই বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিজস্ব বিমানে তাদেরকে ঢাকায় নেয়া হবে। তারা এসাইলামের আবেদন করেছিলেন। ইমিগ্রেশন জজ তা নাকচ করেছেন। এরপর তারা প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আপিলও করেছিলেন। কিন্তু মাননীয় জজের কাছে তাদের বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।’

ইমিগ্রেশন বিভাগের কর্মকর্তারা আরো উল্লেখ করেছেন যে, ‘বিএনপির কর্মী হিসেবে তারা ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃক ভয়ংকর নির্যাতনের ভয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে এসাইলামের আবেদনে উল্লেখ করা হলেও সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে তার বাস্তবতা পাওয়া যায়নি।’

এদিকে, বহিস্কারের অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশীদের পক্ষে ড্রামের লোকজন মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশ ককাসের চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান যোসেফ ক্রাউলির কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ মার্চ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরী এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী জেহ জনসনকে চিঠি দিয়েছেন কংগ্রেসম্যান ক্রাউলি। ক্রাউলি তার চিঠিতে দুই মন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছেন, ১. বহিস্কারের পর বাংলাদেশে তারা এবং তাদের স্বজনেরা মারাত্মক পরিস্থিতির সম্মুখীন হবার কোন আশংকা রয়েছে কিনা, ২. তারা সকলেই কি রাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন নাকি ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হন, ৩. ইতিপূর্বে যাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে কেউ কি ক্ষমতাসীন সরকারের রোষানলে পড়ার নজির রয়েছে কিনা এবং ৪. ডিটেনশন সেন্টারে অবস্থানরতদের তালিকা মিডিয়ায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান রীতি লংঘিত হয়েছে কিনা।

একইভাবে কংগ্রেসনাল এশিয়ান প্যাসিফিক আমেরিকান ককাসের চেয়ার এমিরিটাস ও ইমিগ্রেশন টাস্ক ফোর্সের চেয়ার মাইক হুন্ডা এবং কংগ্রেসনাল এশিয়ান প্যাসিফিক আমেরিকান ককাসের চেয়ার জুডি চু চিঠি দিয়েছেন ২ এপ্রিল। অভিবাসন বিভাগের অভিভাবক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রীকে লেখা এ চিঠিতে বাংলাদেশীদের বহিস্কারাদেশ অন্তত: দু’মাসের জন্যে স্থগিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এসাইলামের আবেদনগুলো আরো ব্যাপকভাবে পর্যালোচনার স্বার্থে এ সময় দেয়া যেতে পারে বলেও দুই কংগ্রেসম্যান উল্লেখ করেছেন তাদের চিঠিতে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/১০ এপ্রিল ২০১৬/রিপন ডেরি

Related posts