November 15, 2018

নিউইয়র্কে বসন্তকালীন সাহিত্য আসর

হাকিকুল ইসলাম খোকনঃ নিউইয়র্কের সাটফিনে অনুষ্ঠিত হলো বসন্তকালীন মনোরম সাহিত্য আসর। ২১ আগস্ট রোববার বিকেলে। অর্ধশতাধিক কবি-লেখক সংস্কৃতিসেবী এতে অংশ নেন। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রখ্যাত আবৃত্তি শিল্পী স্থপতি কাজী আরিফ। উদ্বোধক ও সঞ্চালক ছিলেন কবি-কথাকার-কলামিস্ট সালেম সুলেরী। আসরের উদ্যোগ-আয়োজনে ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য কবি লিয়াকত আলী। সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত টিভি ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ। ধন্যবাদ জ্ঞাপনে ছিলেন প্রাবন্ধিক ও কবি এবিএম সালেহউদ্দিন।খবর বাপসনিঊজ।সাহিত্য আসরে কবি ও আবৃত্তি শিল্পীদের কবিতা, আলোচনা, সঙ্গীত ও নাটকের একাংশ পরিবেশিত হয়।

সম্মানিত অতিথি ছিলেন লেখক-সংস্কৃতিসেবী কেন কাদের,সাংবাদিক তাসের মাহমুদ, কবি ফকির ইলিয়াস, ‘স্বপ্নশিকারী সাহিত্য উদ্যোগে’র কর্ণধার কবি কাজী জহিরুল ইসলাম, রাজনীতিক-সমাজসেবক আবু তালেব চৌধুরী চান্দু, বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি-কণ্ঠশিল্পী বিলকিস আরা ও মামুন টিউটোরিয়ালের পরিচালক, চিকিৎসক-সংস্কৃতিসেবী ডা. নাহিদ খান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আগস্ট মাসে দেহত্যাগকারী প্রখ্যাত বাঙালি ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করা হয়। উদ্বোধক-সঞ্চালক কবি সালেম সুলেরী শোক-স্মারক নিবেদন করেন। এক্ষেত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নেতাজী সুভাষ বোস, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল, স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান, প্রথাবিরোধী লেখক ড. হুমায়ূন আজাদ প্রমুখকে স্মরণ করা হয়। ২০০৪-এর ২১ আগস্ট ঢাকায় গ্রেনেড হামলায় নিহতদের প্রতিও জানানো হয় সম্মাননা। দুই রাজনীতিক-সংস্কৃতিসেবী আইভি রহমান ও আমেরিকায় সদ্যপ্রয়াত নাজমা রহমান-এর আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। ১৩ আগস্ট নিউইয়র্কের ওজন পার্কে ‘হেইট ক্রাইমে’ নিহত হন ইমাম আলাউদ্দিন আকুঞ্জি ও তারা মিয়া। সাহিত্য আসরে এই হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়।

স্বরচিত সাহিত্য পাঠে অধিকাংশজনই দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সর্বকবি মিশুক সেলিম, মোহাম্মদ আলী বাবুল, মনিজা রহমান, ইশতিয়াক রুপু, লুবনা কাইজার, কানিজ আয়শা, মাকসুদা আহমেদ, আনোয়ার সেলিম, শাম্মী আখতার, লুৎফর রহমান, সহুল আহমেদ, আব্দুস শহীদ, রিমি রুম্মান, মুনিয়া মাহমুদ, এবিএম সালেহউদ্দিন প্রমুখ ছিলেন সপ্রতিভ। কবি-দম্পতি হিসেবে আলোচনা ও কবিতা পাঠে নিবেদিত হন কবি ফকির ইলিয়াস ও ফারহানা ইলিয়াস তুলি।

কবিতা দীর্ঘ হলেও দর্শককে মোহিত করেন সর্বকবি হাজী জহিরুল, স্বপ্ন কুমার, ছন্দা সুলতানা, শামস চৌধুরী প্রমুখ। জনপ্রিয় পদ্যকার-সংগঠক শাহ আলম দুলাল গান দিয়ে পরিবেশকে করে তোলেন মনোমুগ্ধকর। কথায় ও কবিতায় চমক দেখান তাসের মাহমুদ। অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে লেখা কবিতা পাঠ করেন কবি, কণ্ঠশিল্পী, অনুবাদক রওশন হাসান। চিত্রা সিংহের জনপ্রিয় গান দিয়েও তিনি প্রশংসিত হয়ে ওঠেন। কবিতা ও গানের যৌথ পরিবেশনা ছিলো বিলকিস আরার কণ্ঠে। কবিতার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু নাটকের একাংশ পরিবেশন করেন খন শওকত।

আসরে কবিগন বলেন, আমাদের প্রবাস জীবনে অনেক অনুষ্ঠান আয়োজন দেখেছি। কিন্তু আজকের সাহিত্য আসরটি আমাদের চোখে সর্বধিক প্রাণবন্ত, উপভোগ্য ও অনুসরণীয়। এ সময়ে উদ্বোধক-সঞ্চালক কবি সালেম সুলেরী অনেক প্রসঙ্গ টানেনএবং বলেন, বাংলাদেশে এর বিস্তার ব্যাপক। ২০১২ সালে খুলনা-সাতক্ষিরা-সুন্দরবনে তিন দিনের সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলাম। দেখেছি সারাদেশের তৃণমুলের লেখক-সংস্কৃতিসেবীরা ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে এতে অংশ নিচ্ছে। প্রবাসেও লেখক-সংস্কৃতিসেবীরা সক্রিয়তা আমাদের আশাবাদী করে তোলে। বসন্তকালীন সাহিত্য আসরের অন্যতম পরিবেশনা ছিলো গুণী কণ্ঠশিল্পীদের আবৃত্তি। কাব্য-বাক্য উচ্চারণে কৃতিত্ব দেখান গোপন সাহা, ক্লারা রোজারিও, শুক্লা রায়, তাহসিনা পারভিন প্রমুখ।

অনুষ্ঠান আয়োজন বিষয়ে খোলামেলা ব্যাখ্যা দেন উদ্যোক্তা কবি লিয়াকত আলী। বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাবেক এমপি তিনি। সাহিত্য চর্চার শুরু তারুণ্যেই। বললেন, রাজনীতি এখন চাঁদা, লেনদেন আর পেশীশক্তিমুখী। বরং সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় শুদ্ধতা ও প্রশান্তি অনেক বেশি। চলমান আয়োজন বিষয়ে বলেন, পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সবার জন্যে তৃপ্তিকর মধ্যাহ্ন ভোজের ব্যবস্থা করেছে। স্ত্রী সানোয়ারা সাহিত্য ভালোবাসে, সাহিত্যিকদেরও।

সন্তান সজনী-রজনী-যামিনী বা জামাতারাও সংস্কৃতিসেবী। স্বরচিত কবিতা পাঠের আগে লিয়াকত আলী বললেন, আমার লেখা আমি লিখছি। কিন্তু লেখককে একা থাকলে চলবে না। দলবদ্ধ হতে হবে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনার ফাঁকে ফাঁকে চার দশকের সাহিত্য চর্চার নানাদিক মেলে ধরেন কবি-কথাকার সালেম সুলেরী। দর্শক নন্দিত কবিতা-ছড়া এবং নিজের লেখা গানও পরিবেশন করেন। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে যৌথগ্রন্থের একমাত্র লেখক তিনি। জানালেন ১৩ নভেম্বর হুমায়ূন জন্মতিথিতে বেরুচ্ছে নতুন বই। থাকছে হুমায়ূন স্মৃতিমালার অজানা অনেক তথ্য।

সাহিত্য আসরে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রখ্যাত আবৃত্তি শিল্পী স্থপতি কাজী আরিফ। বললেন, সাহিত্য সংস্কৃতির একটি শাখা হচ্ছে আবৃত্তি বা বাচিক শিল্প। এই শিল্পের হাত ধরে আমি অনেক পরিচিতি, সম্মান বা মর্যাদা পেয়েছি। ব্যক্তিজীবনে আমার লেখাপড়া প্রকৌশল বিদ্যায়। সাহিত্য বিষয়ে আমি কবি সালেম সুলেরী বা ফকির ইলিয়াসদের মতো পড়াশোনা করতে পারিনি। তবে কাজটুকু শিখেছি। বিজ্ঞ বেলাল বেগদের মতো গুরুদের দীক্ষা পেয়েছি। লেখকদের ভালোবাসা আর দর্শক-শ্রোতাদের আগ্রহ আমার অন্যতম পুঁজি। এখনও উত্তরণ ঘটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। তিনি আবৃত্তি জীবনে নানা অভিজ্ঞতার স্মৃতিচিত্র মেলে ধরেন।

অনুষ্ঠান সমাপণীতে প্রাণবন্ত বক্তব্য রাখেন টিভির কুশলী ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ। বলেন, হাজার বছর ধরে ‘বেঙ্গল’ ছিলো পৃথিবীর সচেতন মানুষের কাছে এক বিস্ময়। ইউরোপ তাই বেঙ্গল দর্শনে উদ্যোগী ছিলো। কলম্বাসও চেয়েছিলেন বেঙ্গলকে দেখতে। ভুলে আমেরিকায় চলে এসেছিলেন। প্রখ্যাত পরিব্রাজক ফা ইয়েন বলেছেন, বেঙ্গলের ভাষা পাখির ডাকের মতো শোনায়।

চুরি কাকে বলে জানে না। ঘরের দরোজা খোলাই থাকে। মুক্তবুদ্ধির প্রবীণ ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ আরও বলেন, ধর্ম ও রাজনীতি বেঙ্গলকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। উম্মাদনা উল্লাসিকতা বেড়েছে। নতুন নতুন রাষ্ট্র পেলেও প্রশান্তি পাইনি। অদূরদর্শী রাজনীতিতে ক্ষতির মাত্রা বেশি। একাত্তরের ২৫ মার্চের কালো রাতে ১০ হাজার ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা। অথচ সংস্কৃতি প্রধান রেনেসাঁর যুগ কি চেয়েছে। ১৪০৮-এর পর নতুন ধারার কবিতায় চন্ডিদাশ কী লিখেছিলেন? সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতি চর্চাই বাঙালির জীবনের প্রধান অঙ্গ।

বসন্তকালীন সাহিত্য আসরে অনুষ্ঠান সভাপতি বেলাল বেগও পদ্য পাঠ করেন। উদ্বোধক-সঞ্চালক কবি সালেম সুলেরীও ‘অনুষ্ঠান-মন্ত্র’ শোনান নিজস্ব পদ্যে : ‘বসুধা আমার বহু সন্তানে, বহু মত, বহু না পৃথিবীটা হোক সংস্কৃতির বিশুদ্ধ এক মা’। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে এখানেই।

Related posts