September 20, 2018

নিউইয়র্কে পুলিশী আচরণবিধি সংস্কার দাবিতে বিক্ষোভ

হাকিকুল ইসলাম খোকন,বিশেষ সংবাদদাতাঃ  নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের আচরণবিধি সংস্কারের দাবিতে আবারো রাজপথ উত্তপ্ত হলো। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশীসহ শতশত আমেরিকানের অংশগ্রহণে ২১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুপুরে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় সিটি কাউন্সিলের সামনে। ‘কম্যুনিটি ইউনাইটেড ফর পুলিশ রিফর্ম’ নামক একটি মোর্চার ব্যানারে এই সমাবেশে শতাধিক নাগরিক ও মানবাধিকার সংস্থা ছাড়াও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। দু’বছর যাবত চলছে এই আন্দোলন। দাবির পরিপূরক দুটি বিল উঠেছে সিটি কাউন্সিলে।

‘রাইট টু নো এ্যাক্ট’ অর্থাৎ ‘জানার অধিকার’ শীর্ষক এ বিল পাশ হলে চলতি পথে কাউকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ অথবা তল্লাশীর সময় অবশ্যই সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারের পরিচিতি সংবলিত কার্ড প্রদর্শনের তা ঐ ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করতে হবে। শুধু তাই নয়, কেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা তল্লাশী করা হচ্ছে তা সবিস্তারে জানাতে হবে। একইভাবে কারো বাসায় প্রবেশের সময়েও একই পন্থা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ পুলিশী আচরণকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এ প্রক্রিয়া চালু হলে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার যাকে খুশী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না। পোশাক পরলেই পুলিশ নিজেকে গডফাদার কিংবা আইনের উর্দ্ধে মনে করেন বলে প্রচলিত যে ধারণা রয়েছে, তারও অবসান ঘটবে অর্থাৎ নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার যে বিধি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান নিশ্চিত করেছে, সেটি সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে ‘রাইট টু নো এ্যাক্ট’ মন্ত্রের মত কাজ করবে বলে এ সমাবেশের বক্তারা দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন।

‘কম্যুনিটি ইউনাইটেড ফর পুলিশ রিফর্ম’ এর মুখপাত্র মনিফা ব্যান্ডিলে বলেন, ‘ন্যায় বিচারের জন্যে পুলিশী আচরণ সংস্কার দাবি আদায়ে আমরা রাজপথে রয়েছি। কিন্তু প্রতিক্ষার প্রহর কাটছে না। আমরা আশা করছি, খুব দ্রত সিটি কাউন্সিল ‘রাইট টু নো এ্যাক্ট’ বিলটি পাশ করবে।’ ‘সিটি কাউন্সিলের অধিকাংশ মেম্বারই এ বিধির পক্ষে অবস্থান করছেন। তাই তা পাশ হতে কালক্ষেপণের কোন অবকাশ থাকতে পারে না’-উল্লেখ করেন ব্যান্ডিলে।

টহল পুলিশ কর্তৃক অযথা হয়রানি এবং পুলিশী বর্বরতার শিকার হয়ে অকালে মৃত্যুবরণকারি কয়েকজনের স্বজনও এসেছিলেন এ কর্মসূচিতে। কুইন্সের ডাক পিয়ন গ্লেন গ্রেসকে বছরখানেক আগে দুই পুলিশ অফিসার মারধোর করে। পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের পোশাক করেই গ্রেস চিঠি বিলির পর নিজ গাড়িতে বসেছিলেন। সে সময় পেছনে পার্ক করা গাড়ি থেকে দুই পুলিশ এসে তার সাথে অকথ্য আচরণ করে এবং এক পর্যায়ে তাকে গ্রেফতার করে কোর্টে চালান দেয়। কুইন্স ক্রিমিনাল কোর্টে মামলাটি বিচারাধীন থাকাবস্থায় ঐ রাস্তার পার্শ্ববর্তী এলাকার সার্ভিলেন্স ভিডিও মাননীয় আদালতে প্রদর্শনের পর পুলিশের অযথা দুর্ব্যবহারের তথ্য উদঘাটিত হয়। দুই অফিসারের বিরুদ্ধেই উল্টো চার্জশিট হয়েছে। এ ধরনের বর্বর আচরণের অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। কর্তব্যরত অবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধের ক্ষেত্রে ‘রাইট টু নো এ্যাক্ট’ বিল পাশের বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন ।

‘চলতি পথে ইমিগ্র্যান্ট এবং কৃষ্ণাঙ্গদের হরদম হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। এহেন অবস্থার অবসান ঘটাকে প্রস্তাবিত বিধি পাশ করতে হবে। সিটি কাউন্সিলম্যানদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিপ্রায়ে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।’

এই বিলের উত্থাপনকারি সিটি কাউন্সিলম্যান রিচি টরেস বলেন, ‘বিলটি পাশের অপেক্ষায় রয়েছে সিটির অধিবাসিরা। একইসাথে পুলিশের বর্বর আচরণও অব্যাহত রয়েছে। এভাবে আইনের শাসনের ক্ষেত্র প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এখন সময় হচ্ছে বিলটি পাশ করার। পুলিশী আচরণকে স্বচ্ছ্বতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনার অর্থ হবে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক অস্থিরতার অবসান ঘটানো। শুধু তাই নয়, দায়িত্ব পালনেও নাগরিকেরা স্বচ্ছন্দে পুলিশের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করবে না।’

কাউন্সিলম্যান এন্টনিয়ো রিনোজ বলেন, ‘নিউইয়র্ক পুলিশের আচরণ সংশোধনের ক্ষেত্রে এ বিধি জরুরী হয়ে পড়েছে। এটি আইনে পরিণত হলে সিটির নাগরিকেরা স্বস্তিবোধ করবেন।’
কাউন্সিলম্যান ব্র্যাড ল্যান্ডার বলেন, ‘২০১৩ সালে আমরা ‘কম্যুনিটি সেইফটি এ্যাক্ট বিল’ পাশ করেছি। সে ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে নাগরিকের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার সুসংহত করার মধ্য দিয়ে। আর এজন্যেই ‘রাইট টু নো এ্যাক্ট’ বিল পাশের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।’

নিউইয়র্ক সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের নির্বাহী পরিচালক ডোনা লিবারম্যান বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা পুলিশের বর্ণবিদ্বেষমূলক আচরণের অবসান ঘটাতে এই বিধির গুরুত্ব অপরিসীম। অতি সম্প্রতি সিটি পুলিশের অসভ্য আচরণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এরিক গারনার এবং আকাই গারলে। এভাবেই, ক্ষমতার অপব্যবহারকারি পুলিশ অফিসারের সমাজের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। যাদের নিরাপত্তা সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করার কথা, সে সব নাগরিকের সাথে পুলিশের দুর্ব্যবহার রোধে এই আইন জরুরী হয়ে পড়েছে। অবিলম্বে এটি পাশের অনুরোধ জানাচ্ছি সিটি কাউন্সিলের প্রতি।’

সিটি কাউন্সিলম্যান মার্গারেচ চীন বলেন, ‘নিজের আশপাশেও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন ইমিগ্র্যান্টরা। টহল পুলিশের বর্ণ ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক আচরণে সদা সন্ত্রস্ত থাকতে হচ্ছে ইমিগ্র্যান্টদের। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে।’

প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, পুলিশী আচরণকে ঢেলে সাজাতে আরো কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে দেন-দরবার চলছে। নিউইয়র্ক সিটির এই বিল পাশ হলে অন্য এলাকার জন্যে তা পাথেয় হবে বলে আন্দোলনকারিরা মনে করছেন।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/২৪ এপ্রিল ২০১৬

Related posts