November 20, 2018

নারীরা হলো নন্দ ঘোষ!

সেই নারীকে সমাজচুত্য করা হলো

ডাঃ রুখসানা আমিন সুরমা

দোষ না করে দোষী অর্থাৎ “প্রচলিত বাংলায় একটি কথা আছে যত দোষ নন্দ ঘোষ”। যার উপর সব দোষ চাপানো যায় বা চাপানো হয় সেই যেন নন্দ ঘোষ বিষয়টা এমন- তা আমরা সবাই কম বেশী জানি। আর সেই নন্দ ঘোষ হলো আমাদের সমাজের নারী- দোষ না করেও দোষী। সব দোষ তার উপর চাপানো হয় এবং তাকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
যেমন কিছু দিন আগেও আমরা পত্রিকায় দেখলাম, এক নারীর ঘরে পুরুষ ঢুকেছে। এই অপরাধে নারীকে মারধর করা হলো, সেই নারীকে সমাজচুত্য করা হলো অথচ পুরুষটিকে কিছুই করা হলো না অপরাধ দুজনেরই ছিল- শাস্তি কেন একা নারী টাকেই দেওয়া হলো? সে নারী বলেই কি? এটা অবিচার নারীদের উপর এই অবিচার আর এতো চলতে পারেনা। গত দুই দিন আগে দেখলাম সাভার রাস্তা থেকে একটি মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। নারীরা কি রাস্তায় চলাফেরাও করতে পারবে না। অথচ নির্দোষ মেয়েটিকে সবাই ঘৃণা করবে, এক ঘরে করবে, লাঞ্ছিত করবে, তাকে বাকী জীবন লজ্জায় লজ্জায় কাটাতে হবে। কেন এটা কি তার অপরাধ?

একটি মেয়ের যদি কোন কারণে দেরীতে বিয়ে হয় তাহলে আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী সমাজের সবাই কম বেশী কানা-ঘোষা শুরু করে, না জানি মেয়েটির কি দোষ আছে, কেন জানি বিয়ে হচ্ছেনা। এটাকি আসলেই তার দোষ?
বিয়ের পর যদি সংসারে কোন অশান্তি বা কোন ধরণের দূর্ঘটনা ঘটে তাহলে, সবাই বলে বউ অলক্ষ্মী তাই সংসারে অশান্তি শুরু হইছে বা এই ঘটনা গুলো ঘটছে। আসলে কি তাই? স্বামীর ও যদি ভালো চাকুরী ব্যবসা না হয় বা কোন লস হয় বলে সব তোমার জন্য হইছে তোমার কোন ভাগ্যই নাই। বাড়ির কেউ যদি মারাও যায় তাও মেয়েটিকেই শুনতে হয় তোমার জন্যই হইছে। তুমি অলক্ষ্মী। বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে যদি সন্তান না হয় তাহলেও সবাই সেই নারীর দিকেই আঙ্গুল তুলে বলে, বউয়ের কোন দোষ আছে নাকি এখনও সন্তান হয় না কেন অথচ পুরুষটিকে কেউ কিছুই বলেনা।

এবং সন্তান যদি কন্যা হয় তাও নারীকেই দোষারোপ করা হয় বলা হয় পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ায় যোগ্যতাও তোমার নাই। আসলে কি এটা তার দোষ? এবং সন্তান না হবার কারণে স্বামী আবার বিয়ে করে, বার বার কন্যা সন্তান হবার কারণে স্বামী আবার বিয়ে করে, একবারও ভাবেও না তার নিজের কোন দোষ আছে কি না। সন্তানের কোন অসুখ বা বিপদ হলে ও বলা হয় তোমার জন্যই এসব হইছে। তুমি ঠিকমত যত্ন  নিতে পারো না। সারাদিন কি করো এগুলাও ঠিকমত করতে পারো না অথচ নারী বেচারী সারাদিন নিজের কথা না ভেবে না খেয়ে সবার জন্য করে যাচ্ছে যারা চাকুরী করে চাকুরী করে এসেও সংসারের রান্না থেকে শুরু করে সবটাই আবার সামলায় তার পরেও তাকেই শুনতে হয় কি করো এই কাজটুকুও কি পারোনা। অর্থাৎ সমস্ত দোষের দোষী যেন নারী অর্থাৎ নন্দ ঘোষ। পুরুষ তাহলে কি?

আমার দেখা এবং জানা মতে একটি সত্যি ঘটনার খুব সংক্ষিপ্ত একটু বর্ণনা আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে লিখবো যাতে আপনারা পরিস্কার হতে পারেন দোষ না করে নারীরা দোষী এবং তাদের দোষ খোঁজা হয়। দোষী জোর করে বানানো হয় কিভাবে।

একটি লোক একটি মেয়েকে ভালবেসে তার পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গোপনে বিয়ে করলো। পরে মেয়েটির পরিবার মানতে পারলো না মেয়ে খুব সহজ সরল এবং বেশ বোকাই ছিল। সে অনেক কিছুই বুঝতে পারেনি, পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে গেল। মেয়েটি শুধু স্বামীর জন্য পরিবারের বিরুদ্ধে যেয়ে পরিবার সমাজ সংসার সব ত্যাগ করে এক কাপড়ে সেই স্বামীর কাছেই চলে গেল। মাত্র এক বছর পরে তাদের একটি পুত্র সন্তান হলো। অনেক কষ্টে তারা দিন পার করছে। তার মধ্যে হঠাৎ লোকটি আরেকটি মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পরলো আর এ দিকে এই মেয়েটির সাথে অনিয়ম-অন্যায়-অত্যাচার শুরু করলো। সে তার কোলের বাচ্চাটাকে নিয়ে সীমাহীন কষ্টের জীবনের যুদ্ধ শুরু করলো, তার আর কেউ থাকলো না। এক পর্যায়ে বছর খানেকের মধ্যেই লোকটি আরেকটি বিয়ে করে এই মেয়েটিকে বাচ্চা সহ ফেলে চলে গেল।

মেয়েটি কোথায় যাবে, কি করবে, যুদ্ধের জীবন শুরু করলো। তার সন্তানের কথা ভেবে সে আর কিছু করতেও পারছে না। তার স্বামীর ঐ প্রতারণার সে অভিজ্ঞতা পেল যে, আর কোন পুরুষকে বিশ্বাস করা যাবে না। জীবনে দ্বিতীয় বার কোন পুরুষ গ্রহণ করাও যাবে না। সে চাকুরী করে সন্তানটাকে নিয়ে ঢাকা শহরে খেয়ে না খেয়ে সততা এবং ঈমানদারিত্বের সাথে জীবন কাটাচ্ছে। এর মধ্যে তার পরিবারও তাকে ফিরানোর চেষ্টা করেছে। বিয়ে দেওয়ারও অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে তার জায়গা থেকে এক চুলও নড়েনি এবং সমাজে একা চলতে যেয়ে সে পদে পদে অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছে। অনেকে তাকে ভালবাসতে চেয়েছে, বিয়েও করতে চেয়েছে, অনেকে জোরও করেছে, কোন ভাবেই সে নড়েনি। ঐ ভাবেই থাকতো, বাসা ভাড়াও ঠিকমত দিতে পারতো না। সেখানেও অনেক অপমান সহ্য করতে হতো। তার স্বামী দিব্যি আরেক সংসার করছে এবং ভালোই আছে। মেয়েটি প্রথমে স্বামীকে ফিরানোর অনেক চেষ্টা করেছে। এক পর্যায়ে সে বিফল হয়ে সেটা বাদ দিয়ে নিজের মত নিজে চলতে শিখলো এবং চলতে থাকলো। তখন সমাজের অনেকেই তাকে বলতো, আপনার কি সমস্যা আছে, আপনি কি খুব খারাপ, আপনার স্বামী আপনাকে রেখে আরেকটি বিয়ে করলো কেন?

অনেকেই সেটা বিশ্বাস করতো না। যারা মেয়েটির আসে পাশে থাকতো, তারা তখন দেখতো- না তাদের ভাবনা ভূল। মেয়েটি অনেক ভালো, দেখতে সুন্দর, শিক্ষিতা, যোগ্যতা সব দিকেই আছে। চাকুরী করেই সন্তানকে নিয়ে সততার সাথে দিন পার করছে। তখনও অনেকে জিজ্ঞেস করতো, সত্যি বলবেন- আসলে আপনার কি সমস্যা, আপনাকে রেখে সে কেন অন্য জায়গায় থাকে? তাহলে কি আপনার শারীরিক সমস্যা আছে, যেটা দেখা যায় না? মেয়েটি যদি বলতো, ‘না’ কেউ বিশ্বাস করতো না। মেয়েটির বয়সও তখন মাত্র ঊনিশ বা বিশ। বলতো সবাই, তাহলে এ বয়সে আপনি কিভাবে এতো কষ্ট সহ্য করে থাকেন? এটা বিশ্বাসের নয়। মেয়েটি ভালো, তার সব কষ্ট সে সহ্য করতো। উপর ওয়ালার উপর তাকিয়ে সব মেনে নিয়েছে। সে বুঝে ছিল ভোগে নয়, ত্যাগেই মানুষের প্রকৃত জীবন। অথচ কেউ বিশ্বাস করতোনা, মানতেও চাইতোনা। মেয়েটিকে নানা ভাবে নানা জনে নানা আজে-বাজে কথা বলে খোটা দিতো। মেয়েটি সহ্য করতে না পেরে নিরবে শুধু কাঁদতো আর আল্লার কাছে ধৈর্য্য প্রার্থনা করতো। পুরো ঘটনা লিখা অসম্ভব এ থেকেই কি বোঝা যায় না, কোন দোষ না করেই মেয়েরা দোষী। দোষ করলো একটি পুরুষ আর সব দোষ এবং বদনাম সমাজের আজে-বাজে অপবাধ, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সবটাই এসে পরলো মেয়েটির উপর। কি দোষ ছিল? আসলেই মেয়েটির কোন দোষই ছিল না। তারপরও সে দোষী হলো কেন? কেন তার দোষ খোঁজা হলো বার বার, সে মেয়ে বলে?

একটি মেয়ে ভালো এটা কি তার দোষ? একটি মেয়ে কারো ভালোবাসার সম্মান দেখালো এটা কি তার দোষ? একটি মেয়ে তার স্বামীকে অন্ধের মত বিশ্বাস করলো, ভালবাসলো, এটা কি তার দোষ? সবাইকে ছেড়ে এক কাপড়ে স্বামীর সাথে খালি পায়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো এটা কি তার দোষ? একটি মেয়ে খুব সহজ সরল বোকা, এটা কি তার দোষ? একটি মেয়ে নিজের কথা না ভেবে সন্তানের কথাই ভাবলো আর নিজের জীবন সততার সাথে ত্যাগ করে দিল, এটা কি তার দোষ? যখন কোন দোষ দেখা যায় না তখন শারীরিক দোষ খোঁজার চেষ্টা করা হয়। সেটাও ছিল মিথ্যা, আসলে কার দোষ? উত্তর কে দিতে পারবো। সে বোকা বলে তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করলো, তাকে ঠকালো অথচ দোষ হলো তার। এটা কি আসলেই তার দোষ? অর্থাৎ যত দোষ নন্দ ঘোষ হলো নারী। কোন দোষ না থাকলেও জোর করে দোষী বানানো হয়। পুরুষের সব দোষ নারীর ঘারে চাপানো হয়। এ অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন এই মানসিকতা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। নির্দোষী কে জোড় করে আর কেউ দোষী বানিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে জীবনটা জর্জরিত করে দিবেন না। একটা মানুষ কত সহ্য করতে পারে, কত পারবে, কেনই বা করবে। কে বা কারা এ বিষয়ে ভাববে, কবে ভাববে তাদের কথা?

আসুন, আমরা সবাই ভাবি তাদের পাশে দাঁড়াই। বিনা অপরাধে তাদের আর মিথ্যা অপরাধী না বানাই। তাদের সরলতার সুযোগ না নিই। তাদেরকে অন্যায় ভাবে না ঠকাই। ভালবাসার অভিনয় না করি। তাদের সাথে এমন প্রতারণা না করি বিনা দোষে এমন নিষ্ঠুর শাস্তি না দিই। তারাও মানুষ, তাদেরও চাওয়া পাওয়া আছে, অনুভূতি আছে, কষ্ট আছে। ভালো থাকার, সুখে থাকার অধিকার আছে। সমস্ত নারী ভালো থাকুক আমি তাই চাই। আমি চাই সবাই এ বিষয়ে একমত হবেন।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts