September 24, 2018

ত্বকি হত্যার ৩বছরেও অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়ার নেপথ্যে

toki

রফিকুল ইসলাম রফিকঃ নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি হত্যাকা-ের তিন বছর অতিবাহিত হয়েছে। এ হত্যাকা-ের বিচারকাজ দূরের কথা মামলার অভিযোগপত্রই এখনও দাখিল হয়নি। হত্যাকা-ে ওসমান পরিবার জড়িত হওয়ায় অভিযোগপত্র দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের। ত্বকি হত্যার পর দেশে শিশু হত্যার ঘটনা বেড়ে গেছে উলেখ করে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, দেশ ও দেশের বাইরে আলোড়ন তোলা এমন একটি হত্যকা-ের বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হয়েছে।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেল। নগরীর পুরাতন কোর্ট এলাকার বাসা থেকে চাষাঢ়া বালুর মাঠে অবস্থিত সুধীজন পাঠাগারের উদ্দেশে বের হয় এ লেভেলের পরীক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি। পাঠাগারে উল্টোদিকে সায়াম পাজার সামনে থেকে তাকে অপহরণ করা হয় ওই দিনই। নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনি খাল থেকে ত্বকির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ত্বকির নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। হত্যার প্রতিবাদে নজিরবিহীন সর্বাত্মক হরতাল, মানববন্ধন ও সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয় নারায়ণগঞ্জে। নিউইয়র্ক, জার্মানিতে, কলকাতা, ফ্লোরিডা, কানাডা, মালয়শিয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মীরা হত্যাকা-ের প্রতিবাদে একাধিকবার বিক্ষোভ করেন।

ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় নিহতের পিতা নারয়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি রফিউর রাব্বি কারো নাম উলেখ করেননি। কিন্তু পরে পুলিশ সুপার বরাবরে দেয়া এক অবগতিপত্রে রফিউর রাব্বি ত্বকির খুনি হিসেবে তৎকালীন সাবেক এমপি শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া পারভেজ, জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রাজীব দাস, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন, সালেহ রহমান সীমান্ত এবং রিফাত বিন ওসমান ও তাদের অজ্ঞাত পরিচয় সহযোগীদের কথা উলেখ করেন।

জেলা পুলিশের তদন্তে অগ্রগতি না হলে ত্বকির পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশে মামলা তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করে র‌্যাব। পরে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারকৃত শওকত সুলতান ভ্রমর আদালতে স্বীকরোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে বলেন শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকিকে হত্যা করা হয়। স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আজমেরী ওসমানের আলামা ইকবাল রোডস্থিত টর্চার সেলে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব হত্যাকা-ের বহু আলামত উদ্ধার করে।

২০১৪ সালে ৮ মার্চ তৎকালীন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান হত্যাকা-ে আজমেরী ওসমানের পরিকল্পনায় ও অংশগ্রহণে হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে উলেখ করে ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিটের খসড়া সাংবাদিকদের প্রদান করেন। তিনি ঐদিন বলেন শীঘ্রই চার্জশিট আদালতে দাখিল করবেন। কিন্তু এরপর প্রায় দুই বছর চলে গেলেও এখনও অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়নি।

আদালতে আত্মস্বীকৃত খুনিরা জামিনে বেরিয়ে প্রকাশ্যে থাকায় শঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ নিহতের পরিবারের সদস্যরা। নিহত ত্বকির পিতা ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকি মে র আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি এ প্রসঙ্গে বলেন, ত্বকির এক ঘাতক সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বলেছে যে আজমেরী ওসমানের উপস্থিতিতে তার টর্চার সেলে ত্বকিকে হত্যা করা হয়। র‌্যাব হত্যাকা-ের এক বছরের মাথায় সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছে। একটা খসরা অভিযোগপত্রও তারা সংবাদমাধ্যমে সরবরাহ করে। এরপর আরও দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও সে চার্জশিট আদালতে তো দেয়া হলোই না উল্টো আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়া আসামি ভ্রমর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে দেশ থেকে পালিয়ে গেলো। নিজস্ব টর্চার সেলে যে ত্বকিকে হত্যা করলো সেই আজমেরী ওসমান এখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটি কিভাবে সম্ভব? ১৬৪ ধারায়, খসরা চার্জশিটে যার নাম এলো খুনের নির্দেশদাতা হিসেবে, যার টর্চার সেলে ত্বকিকে হত্যা করা হলো সে প্রকাশ্যে কিভাবে ঘুরে বেড়ায়? তাকে না ধরার কারণটা কী? সে ওসমান পরিবারের সদস্য বলে? শামীম ওসমানের নির্দেশে আজমেরী ওসমান এ হত্যাকা- ঘটিয়েছে। আজমেরী ওসমানকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তা বের হয়ে যাবে।

ত্বকির হত্যাকারীরা উচ্চমহল থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ। তিনি বলেন, এই খুনিদের রক্ষা করার জন্য যা যা দীর্ঘসূত্রতা করার দরকার তা করা হচ্ছে। তদন্তকারি প্রতিষ্ঠান ও আইনী ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিন। যাতে খুনি, গডফাদার, সন্ত্রাসীরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে এমন ঘটনা না ঘটে।
ত্বকি হত্যার অভিযোগে র‌্যাব এ পর্যন্ত আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগি লিটন, ভ্রমর, সীমান্ত, রিফাত ও সাইফুদ্দিন জ্যাকিকে গ্রেফতার করে। হত্যকান্ডের ব্যাপারে ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই আসামী ইউসুফ আহমেদ লিটন ও ১২ নভেম্বর সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সুলতান শওকত ভ্রমর জামিনে মুক্তি পেয়ে দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে।
মামলা তদন্তকারি সংস্থা র‌্যাবের দাবি ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। স্পশকাতর এই মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে খুটিনাটি বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। খসড়া চার্জশীটের বিষয়ে বলনে, খসড়া তো খসড়াই। খসড়া চার্জশীটের খুটিনাটি বিষয় বিশ্লেষন করে , একটি সুন্দর ও গ্রহনযোগ অভিযোগ পত্র তৈরির চেষ্টা অব্যহত আছে।

এদিকে ত্বকী হত্যার বিচার ও হত্যাকরিদেরআইনের আওতায় আনার দাবিতে তিন দিন ব্যাপি কর্মসুচী গ্রহন করেছে সন্ত্রাস নিমূল ত্বকী মঞ্চ । কর্মসুচীর মধ্যে রয়েছে সমাবেশ, ত্বকীর কবরে পুস্পস্তবক অর্পন, এবং গোলটেবিল বৈঠক ।

নারায়ণগঞ্জ বাসির দাবি দ্রুত ত্বকী হত্যাকারিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শান্তি দেয়া হোক। ##
রফিকুল ইসলাম রফিক
সিনিয়র রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ।

Related posts