November 14, 2018

নান্দাইলে খুন হওয়া রবিনকে জীবিত উদ্ধারের পর আদালতে চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

6

মোঃ আজিজুর রহমান ভূঞা বাবুল,ময়মনসিংহ ব্যুরো ঃ

ময়মনসিংহের নান্দাইলে নিজের ছেলে রবিন (৯)কে হত্যার নাটক সাজিয়ে নিজের দেয়া জবানবন্দিতে নান্দাইল উপজেলার ভাটিবিলপাড় গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে রফিকুল ইসলাম ভুলু (৩৫) ফেঁসে গিয়ে প্রায় ১১মাস যাবৎ কারাভোগ করছেন।আর প্রায় এক বছর আগে খুন হওয়া রবিনকে ডিবি পুলিশ জীবিত উদ্ধারের পর মঙ্গলবার আদালতে তার জবানবন্দি গ্রহন করেছেন বিচারক।

আদালত সূত্রে জানা যায়,ঘটনার প্রায় এক বছর পর খুন হওয়া (পিতার দাবীকৃত) ছেলে রবিন ময়মনসিংহের আদালতে তাকে লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে পিতা ভুলুকে জড়িয়ে আদ্যপান্ত জবানবন্দি দেয়। এর আগে রবিনকে জেলা ডিবি পুলিশের এসআই মলয় চক্রবর্তী নান্দাইল থেকে মঙ্গলবার উদ্ধার করে। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে নিহত ছেলেটি আসলে কে এবং কি তার পরিচয় ?

ডিবি পুলিশ জানান, নান্দাইলের ভাটি বিলপাড় এলাকার রফিকুল ইসলাম ভুলু’র সাথে বনিবনা না হওয়ায় তার প্রথম স্ত্রী চার সন্তান রেখে অন্যত্র চলে যায়। পরে রফিকুল ইসলাম ভুলু কিশোরগঞ্জের রাহিমা আক্তার সাথী নামের অপর এক নারীকে বিয়ে করেন। সাথীর সাথে তাঁর বনিবনা না হওয়ায় সেও তার পিত্রালয়ে চলে যান। এদিকে ভুলু তার ২য় স্ত্রীকে তার পিতার বাড়ী থেকে আনতে গেলে স্ত্রী সাথী, তার ভাই কামাল ও মঞ্জিলসহ অন্যরা তাকে মারধর করে। এ আক্রোশে স্ত্রী সাথী ও তার ভাইদের শায়েস্তা করতে মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনা করে ভুলু।

এক পর্যায়ে নিজ ছেলে রবিন (৯) কে লুকিয়ে রেখে (ঢাকায় বাসায় কাজে দিয়ে) ছেলেকে অপহরণ ও পরে হত্যা করার অপরাধে মামলার পরিকল্পনা করে। খুনের পরিকল্পনায় এর আগে ছেলে রবিনকে দিয়ে একাধিক লোকজনকে জড়িত করে চিরকুট লিখে রাখে। পরে নান্দাইল রোড স্টেশন থেকে তার ছেলের বয়সী অজ্ঞাতনামা এক ছেলেকে ফুসলিয়ে এনে অপর একজনের সহায়তায় নান্দাইলের ডাংরীবন্দ গ্রামের কাজল মিয়ার পরিত্যক্ত ইটভাটায় ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার অজ্ঞাতনামা বালক (১১)কে হত্যা করে লাশ ইটভাটায় ফেলে রাখে। তার আগে নিহত ছেলের পড়নে নিজের ছেলের স্কুল ড্রেস ও লুঙ্গি পড়িয়ে তার পকেটে ছেলে রবিনের নিজ হাতের লেখা চিঠি রেখে আসে।

পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশের অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে। এ খবরে ভুলুর আত্বীয় স্বজন থানায় গিয়ে লাশ দেখে তাদের শিশু রবিন বলে সনাক্ত করে। এ ঘটনায় পুলিশ তদন্তকালে বাড়ীর লোকজনের কাছ থেকে জানতে পায় ভুলু তার ছেলে রবিনকে কয়েকদিন আগে ঢাকায় কাজে দিবে বলে বাড়ী থেকে নিয়ে গেছে। এতে বাবা ভুলু’র প্রতি সন্দেহ হলে পুলিশ তাকে আটক করে। এদিকে ছেলে রবিন ঢাকা থেকে অসুস্থ্য অবস্থায় নান্দাইলে নিজ বাড়ী ফিরে এসে আবারো চলে যায়। ফলে এ নিয়ে মামলায় জটিলতা দেখা দেয়।

পরে মামলাটি ডিবি পুলিশের কাছে এলে তদন্ত শুরু করে এসআই মলয় চক্রবর্তী। অজ্ঞাতনামা নিহত ছেলের লাশের সন্ধানে নামে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত ভুলুকে পুলিশ রিমান্ডে নিলে ভুলু তার ছেলে রবিন সম্পর্কে জানায়, অপহরণ মামলার পর তার ছেলেকে সে ফেরত পায়। অপহরণ মামলায় ২য় স্ত্রীসহ অন্যদের শাস্তি না হওয়ায় সে রবিনকে হত্যার মাধ্যমে স্ত্রী সাথীসহ অন্যদের ফাঁসানোর পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনায় নান্দাইল রোড স্টেশন এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা ভিক্ষুক এক ছেলেকে এনে রাতে হত্যা করে নিজের ছেলের কাপড় চোপড় ও লেখা চিঠি পকেটে রেখে পালিয়ে যান। তবে ছেলেটির বাড়ী কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া এলাকায় দাবী করলেও এ ঠিকানা সঠিক নয় বলে পুলিশ জানায়।

এদিকে বিজ্ঞ বিচারকের কাছে মঙ্গলবার জবানবন্দিতে রবিন বলে, আমরা চার ভাই-বোন। পিতার অত্যাচারে মা অন্যত্র চলে যায়। এরপর সাথীকে বাবা দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ঘরে আনে। বনিবনা না হওয়ায় সৎ মা তার বাবার বাড়িতে চলে যায়। বাবা তাকে আনতে গেলে সৎ মা ও তার ভাইয়েরা বাবাকে মারধর করে। অসুস্থ অবস্থায় বাবা বাড়িতে আসে। এরপর আমাকে দিয়ে একটি পত্র ও কয়েকটি মোবাইল নম্বর লেখিয়ে কাজের জন্য আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। এদিকে বাবা সবার কাছে বলে আমাকে মেরে ফেলেছে। তবে আমি সুস্থ আছি, বেঁচে আছি।

তবে গ্রেফতারকৃত ভুলু’র হাতে নিহত ভিক্ষুক ছেলে এবং তার নিজের ছেলে রবিনকে নিয়ে নানা তথ্য দিলেও পুলিশ মামলাটির কুলকিনারা করতে না পেরে মঙ্গলবার নান্দাইল থেকে জীবিত রবিনকে উদ্ধার করে জবানবন্দি প্রদানের জন্য নিয়ে এলে রবিন বিজ্ঞ বিচারকের কাছে ১৬৪ ধারায় দেয়।

রবিনকে জীবিত উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ময়মনসিংহ গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ ইমারত হোসেন গাজী বলেন, মঙ্গলবার বিজ্ঞ বিচারকের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে প্রায় এক বছর আগে খুন হওয়া জীবিত রবিন।##

Related posts