September 22, 2018

নাজমা খানমের ঘাতক শনাক্ত হয়নি; প্রবাসীরা ভীত-সন্ত্রস্ত

ছুরিকাঘাতে নিহত নাজমা খানম (বামে)। সিসিটিভির ফুটেজ (ডানে)।

হাকিকুল ইসলাম খোকনঃ কর্মস্থল থেকে পায়ে হেঁটে বাসায় ফেরার পথে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নিহত বাংলাদেশী নাজমা খানম (৬০) এর নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হচ্ছে শুক্রবার বাদ জুমআ (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর রাত ১টায়) জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে। এরপর রাতে আমিরাতের ফ্লাইটে তার লাশ শরিয়তপুরের উদ্দেশ্যে পাঠানো হবে। নিহত নাজমার স্বামী শামসুল আলম খান (৭৫) এনআরবি নিউজকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি তার স্ত্রী হত্যার বিচার চেয়েছেন। একইসাথে সকলের দোয়া চেয়েছেন নাজমার আত্মার মাগফেরাত কামনায়।

নিউইয়র্ক সিটির জ্যামাইকায় ৩১ আগস্ট রাত ৯টার পর নাজমা খানমকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় প্রবাসীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার ঘটেছে। উদ্বেগ-উৎকন্ঠা চরম আকার ধারণ করেছে। নিরাপত্তাহীনতা গ্রাস করেছে গোটা কম্যুনিটিকে। ১ সেপ্টেম্বর দিনভর শতশত প্রবাসী নাজমা খানমের বাসায় গিয়ে শোকার্ত পরিবারকে শান্তনা দেন। অপরদিকে, নিউইয়র্কের পুলিশ অকুস্থলের আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করছে। ১ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের হেইট ক্রাইম টাস্ক ফোর্স সক্রিয় হয়েছে ঘাতকের সন্ধান এবং খুনের মোটিভ উদঘাটনে। নাজমা খানমের স্বজন এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর কর্মকর্তারাও মনে করছেন যে, এটি ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক হামলা। তবে কেউই নিশ্চিত হতে পারছেন না।

১১ বছর যাবত নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কর্মরত পুলিশ অফিসার হুমায়ূন কবীর (নাজমা খানমের ভাগ্নে) এ সংবাদদাতাকে বলেন, ‘খালার কাছে থেকে কিছুই নেয়নি দুর্বৃত্তরা। তার কাছে নগদ অর্থ, সেলফোন, ঘড়ি, স্বর্ণের অলংকার-সবকিছুই অক্ষত রয়েছে। তাহলে এটি যে হেইট ক্রাইম-তাকে সন্দেহের অবকাশ নেই।’ পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ডিটেকটিভরা অবশ্য বলেছেন, ‘তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা মোটিভ সম্পর্কে কিছুই বলতে পারবো না।’ ঘাতক গ্রেফতারে সর্বসাধারণে আন্তরিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

শরিয়তপুর সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাজমা খানম ২০০৯ সালে ডিভি লটারিতে জয়ী হয়ে স্বামী ও কনিষ্ঠ পুত্র নিয়ে নিউইয়র্কে এসেছেন। গত জুন মাসে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ নিয়েছেন। আসছে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে গিয়ে কনিষ্ঠ পুত্রকে বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল। এমনি অবস্থায় এমন করুণ পরিস্থিতির শিকার হওয়ায় শামসুল আলম একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছেন।

নাজমা খানমের আরেক ভাগ্নে শরিয়তপুর জেলা সমিতির সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান সেলিম কান্নাজড়িত কন্ঠে এনআরবি নিউজের এ সংবাদদাতাকে বলেন, ‘পাশাপাশি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ করতেন খালা ও খালু। ৯টায় কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার পথে জ্যামাইকার হিলসাইড এভিনিউতে অবস্থিত দোকান থেকে কিছু কেনাকাটা করে সেই ব্যাগ হাতে ফিরছিলেন বাসায়। বাসা থেকে দুই শত গজ দূরে দুর্বৃত্ত কর্তৃক আক্রান্ত হন খালা। খালু অসুস্থবোধ করায় ধীরে হাঁটছিলেন বিধায় এক শত গজের মত পেছনে ছিলেন। খালা আক্রান্ত হবার সাথে সাথে আর্ত চিৎকার করলে খালু জীবন বাজি রেখে খুব দ্রুত তার কাছে আসেন। ততক্ষণে দুর্বৃত্তটি/রা ঐ স্থান থেকে পলায়নে সক্ষম হয়। ওদেরকে খালু দেখেনওনি।’

‘খালার বুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয় বলে চিকিৎসকরা জানান’-বলেন সেলিম।
এ ঘটনায় নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশীরা উদ্বেগ-উৎকন্ঠা এবং ভীতির মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। এর ১৭ দিন আগে অর্থাৎ ১৩ আগস্ট ভর দুপুরে কুইন্সের এই এলাকা থেকে ৫/৬ মাইল দূর ওজনপার্কে মাওলানা আলাউদ্দিন আকঞ্জি (৫৫) এবং তার সাথী মুসল্লী তারা মিয়াকে গুলি করে হত্যার পর সৃষ্ট ভীতিকর অবস্থা চলার মধ্যেই নাজমা খানম খুনের ঘটনায় সকলেই নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন।

এদিকে ইমামসহ দুই বাংলাদেশী হত্যার মামলায় আটক অস্কার মরেল (৩৫)কে ১ সেপ্টেম্বর কুইন্স ক্রিমিনাল কোর্টে হাজির করা হয়। সে সময় তিনি আবারো নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তার আইনজীবী এই মামলা থেকে অস্কারকে অব্যাহতি প্রদানের জন্যে মাননীয় আদালতে দরখাস্ত করেছেন। এ ব্যাপারে পরবর্তী শুনানীর তারিখ ধার্য করা হয়েছে ১৮ অক্টোবর।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলমানদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কর্মরত ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স’ (কেয়ার) এর নিউইয়র্ক চ্যাপ্টারের নির্বাহী পরিচালক আফাফ নাসের প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে বলেছেন, ‘ঘটনার পারিফার্শ্বিকর্তায় মনে হচ্ছে এটিও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক হামলা। এহেন অবস্থার অবসানে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধ প্রশ্নের সম্মুখীন হবে।

এশিয়ান-আমেরিকান ডেমক্র্যাটিক ক্লাবের প্রেসিডেন্ট আকতার হোসেন বাদল এবং বাংলাদেশী-আমেরিকান ডেমক্র্যাটিক লীগের সভাপতি খোরশেদ খন্দকার পৃথক পৃথকভাবে এ সংবাদদাতাকে বলেন, ‘রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পার্টির সাম্প্রতিক বক্তব্য/মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইমিগ্র্যান্ট এবং মুসলমানদের ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মসজিদ থেকে বাসায় ফেরার পথে গুলি করে ইমামসহ দুই মুসল্লীকে হত’যার পর নাজমা খানমকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা একটি সূত্রে বাধা। ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক হামলা বন্ধে কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সামাজিক সম্প্রীতি আরো হুমকির মধ্যে পড়তে বাধ্য। এটি কারো জন্যেই মঙ্গলের হবে না।’

Related posts