September 20, 2018

না’গঞ্জে হেফাজত ৮ মামলার চার্জশীট

রফিকুল ইসলাম রফিক, নারায়ণগঞ্জঃ   ২০১৩ সালের ৫মে ঢাকাতে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ও রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিবর্ষণের পরদিন ৬মে উত্তপ্ত ছিল রাজধানীর পাশের নারায়ণগঞ্জ জেলা। এদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের শিমরাইলে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে হেফাজতে ইসলাম, স্থানীয় লোকজন ও হেফাজত লেবাসে থাকা জামায়াত শিবিরের ক্যাডারদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে টানা সাড়ে ৫ঘণ্টার ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত সেদিন ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর একজন সদস্য ও পুলিশের ২জন সদস্য ছিল। পরে অবশ্য আরো একজন বিজিবি সদস্যের মৃত্যু ঘটে।

ওইসব ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে ১৭টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৭টি মামলার মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জে ১১টি ও সোনারগাঁও থানায় ৬টি মামলা হয়। এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জের ৫টি মামলা ও সোনারগাঁয়ের ৩টি মামলার চার্জশীট আদালতে দেওয়া হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতের সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান জানান, ৫মে ঢাকাতে নারায়ণগঞ্জের ৫জন হেফাজতকর্মীর মৃত্যু ঘটে। তাদের লাশ পরে প্রত্যেকের গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়।

তিনি আরো জানান, আমাদের জানা মতে দুই থানায় ১৮টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি মামলার চার্জশীট দেওয়া হয়েছে।

সংঘর্ষের সময়ে রাস্তার উপর পড়ে থাকে লাশগুলো : জানা গেছে, ৬মে সকাল সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় মাদানী নগর মাদ্রাসায় অভিযান চালাতে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে মাদ্রাসার ছাত্র, হেফাজতের কর্মী ও এলাকাবাসী। সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলা বিরামহীন এ সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় অনেকে। তাদের লাশ দীর্ঘক্ষণ পড়ে ছিল মহাসড়কের উপরেই। এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনেরা বলছেন, নিহত কেউ হেফাজতের কর্মী না। তারা নিছক নিরীহ। কাজের উদ্দেশ্যেই তারা বাসা থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু বুলেট কেড়ে নিল তাদের প্রাণ।

নিহতদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম সিদ্ধিরগঞ্জের হিরাঝিল এলাকার মৃত হাশেম কন্ট্রাকদারের ছেলে। সে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় ফাহিমা ফ্যাশন এর সেলসম্যান। সকালে দোকানে যাওয়ার পথে সে সংঘর্ষে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে সিদ্ধিরগঞ্জের মা জেনারেল হাসপাতা অ্যান্ড ল্যাবে নেওয়া হলে মৃত্যু ঘটে। নিহত পথচারী পলাশ (২৫) মাদানীনগর এলাকায় তার গ্রিল ওয়ার্কশপের দোকান ছিল। বাসের হেলপার জসিম উদ্দিন (৩০) হিরাঝিল আবাসিক এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়। সে মিজমিজি ধনুহাজী ঈদগাঁও এলাকায় থাকতো। জাহিদুল ইসলাম সৌরভ (১৭) এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। সে সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাইকাশারী বাঘমারা এলাকার এনামুলের ছেলে। পথচারী মাসুম (৩০) সে শিমরাইল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নারায়ণগঞ্জ ২০০ শয্যা হাসপাতালে মারা যায়। হান্নান (৩৫) সিদ্ধিরগঞ্জের আল আমিন সুয়েটার ফ্যাক্টরীর আয়রন বিভাগের ইনচার্জ ছিল।

সেও নারায়ণগঞ্জ ২০০ শয্যা হাসপাতালে মারা যায়। তুরাগ বাস চালক বাবু গাজী (৩৬) সে সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে সুগন্ধা হাসপাতালে মারা যায়। তার বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া এলাকায়। ডেমরার পুর্ব বকস নগর এলাকার রইছ মিয়ার ছেলে সাদেক (৩২) দোকানে দোকানে ফিল্টার পানি সরবরাহ করতো। রিকসা চালক হাবিবুল্লাহ (৩৪) চাঁদপুরের কচুঁয়া থানার জারচরা এলাকার আবুল মুন্সীর ছেলে। এছাড়া নিহত অপর জন হলেন ট্রাকের হেলপার মিজানুল হক।

বিজিবির ২জন ও পুলিশের ২সদস্য নিহত : সংঘর্ষ চলাকালে এক পর্যায়ে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের রাস্তায় ফেলে বেধড়ক পেটাতে থাকে লোকজন। এতে পুলিশ ও বিজিবির অন্তত ৫০ সদস্য গুরুতর আহত হয়। তাদেরকে দ্রুত শহরের খানপুর ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, ১০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকা নেওয়ার পথে ৩জনের মৃত্যু ঘটে। নিহত বিজিবি সদস্য হলেন শাহ আলম (৪০), পুলিশের নায়েক ফিরোজ (৩৫) ও কনস্টেবল জাকারিয়া (২৮)। পরে মারা যান সিপাহী লাভলু।

৫ঘণ্টায় শুধু গুলির আওয়াজ : সকাল ৬টা হতে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কাঁচপুর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত সংঘর্ষের সময়ে এ তিন কিলোমিটার এলাকায় শুধু শোনা গেছে গুলির মুহুর্মুহু শব্দ। বিরামহীনভাবে শব্দে এলাকায় দেখা দেয় তীব্র আতঙ্ক। পুলিশ জানান, তারা কয়েক হাজার শর্টগানের রাবার বুলেট, চাইনিজ রাইফেলের গুলি ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। এছাড়া প্রচুর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শোনা গেছে। সকাল সাড়ে ১১টায় পরিস্থিতি শান্ত হলেও টিয়ার সেলের গ্যাসের ঝাজ বিরাজ করছিল বিকেল পর্যন্ত। সকাল ৬টা হতে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৩কিলোমিটার এলাকায় লোকজন চলাফেরা করতে পারেনি কাদানে গ্যাসের কারণে।এদিকে সকাল ৬টা হতে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড হতে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার জুড়ে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে দুটি লেনের অন্তত ৩০টি গাড়িতে আগুন জলছিল। এর মধ্যে ছিল বিজিবি ও পুলিশের গাড়িও।

বিভিন্ন যানবাহনের গাড়িও ছিল ভাংচুর অবস্থায়। সড়কের ৪০-৪৫টি স্থানে টায়ারে জলছিল আগুন। সড়কের অনেক স্থানে বাশ, ইটপাটেকল ও রড ফেলে রাস্তায় অবরোধ সৃষ্টি করা হয়। সড়কের পাশে তখন মানুষের জটলা, হাতে ছিল বাশ আর লাঠিসোটা। অন্যদিকে সজোয়া যান সহ শত শত র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যদের ছিল রণপ্রস্তুতি। ছুড়ছে একের পর এক বৃষ্টির মত গুলি। মহাসড়কের দুই পাশের ভবন আর বিভিন্ন স্থানে থাকা লোকজন গুলির শব্দে ভীত, আতঙ্কিত।

Related posts