September 21, 2018

না’গঞ্জে ইয়াবা’র শক্তিশালী নেটওয়ার্ক

রফিকুল ইসলাম রফিক,নারায়ণগঞ্জঃ বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে কক্সবাজার ও কুমিল্লার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা। কৌশল বদলে কখনো যাত্রীবাহী বাস আবার কখনো নিজেরাই গাড়িতে করে বড় চালান পৌঁছে দিচ্ছে নারায়ণগঞ্জে। সহযোগীদের দিয়ে গড়ে তুলেছে ইয়াবা পাচার ও বিপননের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে কয়েকটি বড় চালান ধরা পড়লেও গ্রেফতারকৃতরা কেউ বহনকারী আবার কেউবা বিপননের দায়িত্বে রয়েছে। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে শীর্ষ পাচারকারীরা। মাদক বহনকারী ও ডিষ্টিবিউশনের দায়িত্বে থাকা বেশীরভাগই কক্সবাজার ও কুমিল্লার অধিবাসী। যারা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে সর্বনাশা ইয়াবার কারবার।

জানা গেছে, ১৫ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও জালকুড়ি এলাকা থেকে ৬৬ হাজার ৮শ ইয়াবাসহ ৩ পাচারকারীকে গ্রেফতার করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। যার মধ্যে বহনকারী ফোরকানউদ্দিন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকার বাসিন্দা। সে টেকনাফের বাসিন্দা শাহজাহান ও হারুনের কাছে ইয়াবার এই চালানটি পৌছে দিতে এসেছিল। শাহজাহান ও হারুন সিদ্ধিরগঞ্জর জালকুড়ি এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে ইয়াবা ডিষ্ট্রিবিউশনের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তারা মূলত কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে বিভিন্ন পন্থায় নারায়ণগঞ্জ ও এর আশে পাশে ইয়াবার চালান আনতো।

২০ ফেব্রুয়ারী সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে রিনালয় সিএনজি পাম্পের সামনে থেকে সাড়ে ১৪ হাজার পিছ ইয়াবা, ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৩২ টাকাসহ কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানার নিলাবাজার এলাকার ইসমাইল ও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর জোনায়েদ বাগদাদীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১১। জানা গেছে, ইসমাইল নিয়মিত ভাবে কক্সবাজার হতে ইয়াবা এনে এই এলাকায় ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল। মাসে সে প্রায়ই এরকম ৪-৫ বার বড় ধরনের ইয়াবার চালান নিয়ে এসে এখানে তার মাদক ব্যবসা অব্যাহত রেখেছিল।

সে মাদানীনগর এলাকার বাপ্পী ট্রেডার্সের মালিক শফিকুল ও গাজী কালু ট্রান্সপোর্টের মালিক পান্নার কাছে ইয়াবা সরবরাহ করতো। পরে ইসমাইলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী শফিকুলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর আগে ২০১৫ সালের ৬ এপ্রিল মাদানীনগর এলাকা থেকে শফিকুল ইসলাম ও সহযোগী দেলোয়ারকে ৫০ হাজার পিছ ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী শফিকুল ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার নবীনগর থানার ইব্রাহিমপুল গ্রামের শুক্কুর মিয়ার ছেলে। সে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে বড় বড় ইয়াবার এনে নারায়ণগঞ্জ ও রাজধানীসহ এর আশপাশের এলাকায় পাইকারী সরবারহ করে আসছে। ইয়াবা ব্যবসার বদৌলতে সে একজন মটর পার্টস বিক্রেতা থেকে কয়েক বছরের ব্যবধানে ২৭টি কাভার্ডভ্যানের মালিক বনে গেছে। শফিকুল ও পান্না মিজমিজি মৌচাক এলাকায় বিভিন্ন বাসা ভাড়া নিয়ে মাদকের আখড়া গড়ে তুলেছে বলেও অভিযোগে জানা গেছে।

২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী রাতে সোনারগাঁ উপজেলার নয়াবাড়ি এলাকায় ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে একটি কাভার্ডভ্যান থেকে ৫৮ হাজার ৭শ ৭৫ পিছ ইয়াবা, ইয়াবা বিক্রির সাড়ে ১২হাজার টাকা ও দুটি মোবাইল সহ কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম এলাকার ওলি আহমেদ ও সহযোগী আবদুল জলিলকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১১। আসামীরা জব্দকৃত কাভার্ডভ্যানটির ড্রাইভিং সীটের পিছনে ডান পাশে বিশেষ পদ্ধতিতে লুকিয়ে ইয়াবার এতবড় চালানটি এনেছিল। টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালানটি আসার পথে কুমিল্লায় ভাগাভাগি হয়ে একটি অংশ নারায়ণগঞ্জে আনা হচ্ছিল।

গত ১৮ জানুয়ারী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কামতাল এলাকায় বনলতা ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে ট্রাকে তল্লাশী করে ২০ হাজার পিছ ইয়াবা ও মাদক বিক্রির ৯৭ হাজার ৫শ’ টাকাসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১ এর একটি টিম। গ্রেফতারকৃত ৪ জন হলো কক্সবাজার সদর থানার এমদাদুল হকের ছেলে ট্রাক চালক হযরত আলী, মৃত ইসহাক মিয়ার ছেলে মাদক ব্যবসায়ী জলিল, একই জেলার উখিয়া থানার সোবহান মিয়ার ছেলে মোঃ আলী ও মৃত আবুল কাশেমের ছেলে শাহজাহান।

২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি টোলপ্লাজা এলাকায় একটি কাঠ বোঝাই ট্রাকে তল্লাশী চালিয়ে ৯৮ হাজার পিস পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে র‌্যাব-১১। গ্রেফতারকৃতরা হলো কক্সবাজার জেলার উখিয়া থানার উত্তর পুকুরিয়া এলাকার মকবুল আহম্মদের ছেলে ট্রাক চালক ইউসুফ ও একই থানার হরিনমারা এলাকার মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে হেলপার জাফর। তারা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে পরিবহনের সঙ্গে জড়িত। তারা প্রায়ই পরিবহনের ছত্রছায়ায় ইয়াবা স্থানান্তর করে আসছিল। র‌্যাব জানায়, কক্সবাজার জেলার উখিয়া থানার হারিশা এলাকার মাহাছুনের ছেলে কবির (৫০) মূলত ইয়াবা ব্যবসায়ী। একই জেলার ও একই থানার মরিচ্চা এলাকার আব্দুল জালালের ছেলে ফরিদুল আলম ওরফে ফরিদ কোম্পানী (৫০) আটককৃত ট্রাকের মালিক। ট্রাকের মালিকের যোগসাজসেই কবির নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় ইয়াবার বড় চালান সরবরাহ করে আসছিল।

এদের সঙ্গে আরও দু’ ব্যক্তি জড়িত রয়েছে। গ্রেফতার হওয়ার ১৫ দিন পূর্বে ইউসুফ ও জাফর আরো একটি চালান ঢাকায় পৌছে দেয় বলে জানায় র‌্যাব। ২১ সেপ্টেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অভিযান চালিয়ে সাড়ে ৫ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-২-এর সদস্যরা। গ্রেফতার করা হয় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বাসিন্দা শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী মনজুর আলম, সেলিম, মহিউদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, আব্দুল মান্নান ও জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় তাদের কাছ থেকে ইয়াবা ছাড়াও নগদ ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৮ টাকা, একটি প্রাইভেটকার, পাঁচটি পাসপোর্ট ও ৯টি মোবাইল ফোন সেট জব্দ করা হয়েছে।

২৮ আগষ্ট সিদ্ধিরগঞ্জের সাহেবপাড়া এলাকা থেকে ২ হাজার ৪৯০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ইয়াবা বিক্রির ৩৯ হাজার ৯৭০ টাকাসহ পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া থানার পশ্চিম হাজীপুর এলাকার মোঃ মহিউদ্দিনের ছেলে মাদক ব্যবসায়ী কাউসার আহম্মেদ পান্না, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানার রংগীখানা এলাকার শওকত আলীর ছেলে কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম জেলার কোতয়ালী থানার ইকবাল পাথরঘাটা এলাকার মোঃ বাবুল হোসেনের ছেলে আক্তার হোসেন ও ফতুল্লা থানার দেলপাড়া চেয়ারম্যান বাড়ীর মোঃ আউয়ালের ছেলে সেলিমকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার থেকে ইয়াবা এনে সিদ্ধিরগঞ্জের সাহেবপাড়া এলাকায় খুচরা ও পাইকারীভাবে বিক্রি করে আসছিল।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোখলেছুর রহমান বলেন, যারা ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত তারা যে একটা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করছে সেটা সুস্পষ্ট। তবে তারা সেটা খুব সহজে করতে পারছে না। তাদের চেষ্টা সবসময় সফল হচ্ছেনা। প্রায়ই তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে। আর আমরাও চেষ্টা করছি নারায়ণগঞ্জে প্রকাশ্যে যেন মাদক বিক্রি না হয়। এছাড়া ইয়াবা পাচারের নেটওয়ার্কের সদস্যদের গ্রেফতারেও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা প্রায়ই নানা কৌশলে ইয়াবা বিক্রি করছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/১৮ এপ্রিল ২০১৬/রিপন ডেরি

Related posts